অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্র ‘তিন সুবিধা দিতে’

 

Rohinga-640x400

মিয়ানমারের অনিবন্ধিত নাগরিকদের শনাক্তে চলমান শুমারিতে ব্যাপক সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
‘লাখো’ অনিবন্ধিতকে তথ্যভাণ্ডারের আওতায় আনতে সম্ভাব্য অর্ধ লাখ খানার মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ‘অনিবন্ধিত মিয়ানমার থেকে আগত নাগরিক শুমারি’ প্রকল্পের পরিচালক আলমগীর হোসেন।

শুমারির উদ্দেশ্য মিয়ানমারের এসব নাগরিককে জোর করে ফেরত পাঠানো নয় জানিয়ে শুক্রবার রাতে তিনি বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শুমারির সময় চার দিন বাড়ানো হয়েছে। একটি পরিচিতি কার্ডের মাধ্যমে তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত তিনটি সুবিধা দেওয়া হবে।

পটুয়াখালী, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার প্রায় ৫০ হাজার খানাভিত্তিক এ শুমারি গত ২ জুন শুরু হয়ে ১০ জুন শেষ হওয়ার কথা ছিল।

প্রকল্প পরিচালক শুক্রবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২-১০ জুন ১১ দিনের জন্য সময় নির্ধারিত ছিল। শেষ হওয়ার কথা ছিল শুক্রবার। প্রবল বর্ষণ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শুমারি ১৪ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। যারা এখনও নিবন্ধিত হননি, তাদের সুবিধার্থে এ সময় বাড়ানো হয়েছে।”

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এ কর্মকর্তা জানান, তিনটি জেলায় মিয়ানমারের অনিবন্ধিত নাগরিকদের চূড়ান্ত শুমারি শেষ হয়েছে। বাকি তিনটিতে প্রায় ২০ শতাংশ কাজ বাকি আছে।

“শুমারিতে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে; না বুঝে সহযোগিতা করেনি এমন ঘটনা খুবই কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বপ্রণোদিত হয়ে অনিবন্ধিতরা তথ্য দিয়েছে,” বলেন তিনি।

পরিসংখ্যান সচিব কক্সবাজারে অবস্থান করে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে কাজের অগ্রগতি জেনেছেন। শনিবার মাঠ পর্যায়ের কাজও পরিদর্শন করবেন সচিব।

ছয় জেলায় শুমারি কাজে ৩৪০০ জন তথ্য সংগ্রহকারীসহ, সুপারভাইজার, জোনাল কর্মকর্তা মিলে ৩৯৯০ জন নিয়োজিত রয়েছেন। শুমারিতে প্রায় ৫০ হাজার খানাকে টার্গেট ধরা হয়েছে। নির্ধারিত ফরম পূরণ, ছবি ধারণ ও প্রয়োজনীয় দলিল সংগ্রহ করা হচ্ছে শুমারিতে।

প্রকল্প পরিচালক আলমগীর বলেন, শুক্রবার পর্যন্ত পটুয়াখালী, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে শতভাগ কাজ শেষ হয়েছে। আর চট্টগ্রামে ৯০ শতাংশ এবং বান্দরবান ও কক্সবাজারে ৬০ শতাংশ কাজ হয়েছে।সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এখানে মিয়ানমারের ২-৫ লাখ অনিবন্ধিত নাগরিক রয়েছে বলা হয়ে থাকে। এ সংখ্যাটা নামিয়ে আনার জন্য অর্থাৎ প্রকৃত সংখ্যা জানার জন্যই শুমারি করা হচ্ছে। অনুমাননির্ভর কোনো তথ্য এ মুহূর্তে দেওয়া সঠিক হবে না।”

শুমারি সংগ্রহ করা তথ্য ‘মেশিনে ক্যাপচার’ করে এবং গণনা ও যাচাই-বাছাই শেষে ডিসেম্বর নাগাদ এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক।

শুমারির ধাপ: প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম, ফিল্ড টেস্ট, জোনাল অপারেশন, পাইলট শুমারি, চূড়ান্ত শুমারি, গণনা পরবর্তী যাচাই এবং ফল প্রকাশ।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের কুতুপালং ও নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরে নিবন্ধিত ৩০ হাজারসহ দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে বাংলাদেশে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিবন্ধিত ৩০ হাজার এর বাইরে আরও প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, তালিকা করে রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা জানার পরই তাদের বিষয়ে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।

‘পরিচিতি কার্ড থাকবে, বের করে দেওয়া হবে না’

‘অনিবন্ধিত মিয়ানমার থেকে আগত নাগরিক শুমারি’র সময় সংশ্লিষ্টদের সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হচ্ছে, যাতে প্রণোদনা পেয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে তথ্য দিচ্ছে ‘রোহিঙ্গারা’।

প্রকল্প পরিচালক জানান, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পরিচিতি কার্ড দেওয়া হবে। এ কার্ডের মাধ্যমে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত তিনটি সুবিধা পাবেন তারা।

এর ব্যাখ্যা তুলে ধরে আলমগীর বলেন, “স্বাস্থ্য সেবা- কার্ডধারীরা সরকারি কমিউনিটি হাসপাতালে সেবা নিতে পারবে; তাদের ছেলে-মেয়েরা নন ফরমাল এডুকেশন পাবে এবং অহেতুক হয়রানি করা হবে না।”

তিনি জানান, অনিবন্ধিতরা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থায় রয়েছেন, তাদের সরকার সুবিধা দেবে। এর ফলে ‘সুবিধাভোগী গোষ্ঠী’ তাদের ‘খারাপ কাজে’ ব্যবহার করতে পারবে না।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, “এ শুমারি তাদের জোর করে ফেরত পাঠানোর জন্য নয়। এমন কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। সঠিক সংখ্যা জেনে মানবিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে চাই আমরা।”

মিয়ানমারের অনিবন্ধিত নাগরিকদের সমস্যা সমাধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কৌশলপত্র ২০১৩ মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়।

কৌশলপত্র বাস্তবায়ন সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটি শুমারি পরিচালনার জন্য বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে। অনিবন্ধিত নাগরিকদের তথ্যভাণ্ডার প্রণয়নের দায়িত্বও পায় পরিসংখ্যান ব্যুরো।

অর্ধশত তথ্যের খোঁজে

শুমারিতে দুই পৃষ্টার বিশেষ ফরম ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে খানা মডিউল, খানায় অন্তর্ভুক্ত সদস্যের ও মিয়ানমারের নাগরিকদের ব্যক্তি মডিউল, মিয়ানমারের খানার মূল ঠিকানা- এ পাঁচটি ভাগ রয়েছে।

৪৬টি প্রশ্নের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের। এর মধ্যে রয়েছে- ঠিকানা, খানার প্রকার, খানার বর্তমান বাসস্থানের অবস্থান, বসবাসের প্রধান ঘরের প্রকার, ঘরের মালিক, খাবার পানির প্রধান উৎস, পায়খানার সুবিধা, পায়খানা ব্যবহারের ধরন, খানায় আলোর প্রধান উৎস, খানার রান্নার জ্বালানির প্রধান উৎস, বাংলাদেশে আসার পর খাদ্য বা কোনো ধরনের সাহায্য/অনুদান পেয়েছেন কি না, প্রাপ্ত সাহায্যের উৎস, খানার কোনো সদস্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দেশে-বিদেশে কখনও অর্থ লেনদেন করেছেন কি না, মিয়ানমারে খানার মালিকানাধীন কোনো ভিটে-জমি রয়েছে কি না, খানার সদস্যের ক্যাটাগরি, খানার সদসস্যের পুরো নাম (ডাকনামসহ) ও পিতার নাম, খানা প্রধানের সঙ্গে সম্পর্ক, পিতা-মাতা বাংলাদেশি কি না, বয়স, লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা, স্বামী-স্ত্রী বর্তমানে কোন দেশে বসবাস করেন, স্বামী-স্ত্রীর জাতীয়তা, ধর্ম, মিয়ানমারের কোন জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, প্রতিবন্ধকতার ধরন, মিয়ানমারের কোন ভাষা জানেন, সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা, মিয়ানমারে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করেছেন কি না, প্রধান কাজ, খানার অন্তর্ভুক্ত মিয়ানমারের নাগরিক সদস্যের লাইন নম্বর, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে সর্বশেষ চলে আসার সাল, বাংলাদেশে আসার/জন্মের পর প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে কখনও মায়নমার গেছেন কি না, ফেরত গিয়ে থাকলে/প্রস্থান করা হয়েছিল কি না, কোন কোন সময়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন, বাংলাদেশে আসার কারণ কী, কার সাহায্যে বাংলাদেশে এসেছেন, বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধন করা হয়েছে কি না, বাংলাদেশে ভোটার হয়েছেন কি না বা এনআইডি পেয়েছেন কি না, বাংলাদেশে নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন কি না, মিয়ানমারে ভোট দিয়েছেন কি না, খানার সদস্যের মোবাইল নম্বর, বাংলাদেশের পাসপোর্ট পেয়েছেন কি না, মিয়ানমারের কী কাগজপত্র রয়েছে?, মিয়ানমারে খানার মূল ঠিকানা, রায়াকা (কাউন্সিল) সদস্যের নাম, পরিবারের কোনো সদস্য বাংলাদেশের অন্য কোনো স্থানে বা অন্য কোনো দেশে অবস্থান করছেন কি না?

শুমারির উদ্দেশ্য

পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকর্তারা জানান, শুমারির উদ্দেশ্য বাংলাদেশে অবস্থানরত মিয়ানমারের অনিবন্ধিত নাগরিকদের তথ্যভাণ্ডার প্রণয়ন, ছবি ও দলিল সংগ্রহ, বর্তমান অবস্থান ও মিয়ানমারে মূল বাসস্থানের ঠিকানা, কারণ এবং পরিসংখ্যান প্রণয়ন।

সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে মিয়ানমারের নাগরিকরা (যারা মূলত রোহিঙ্গা নামে পরিচিত) অনবরত এদেশে প্রবেশ করছে। তাদের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও আনুমানিক ২ থেকে ৩ লাখ অবৈধ মিয়ানমার নাগরিক কক্সবাজার, বান্দরবান, চট্টগ্রামসহ আশপাশের জেলায় বসবাস করছেন বলে ধারণা করা হয়।

সীমান্তে কড়াকড়ি সত্ত্বেও গড়ে প্রতিদিন মিয়ানমারের ৮-১০ জন নাগরিক বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে বলেও ধারণা করা হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মিয়ানমারের এসব নাগরিক অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর।

 
 
 

0 মতামত

আপনিই প্রথম এখানে মতামত দিতে পারেন.

 
 

আপনার মতামত দিন