ঈদ সামনে রেখে বাজারে জাল নোটের ছড়াছড়ি

 

__1_~1

ঈদ সামনে রেখে বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে জাল নোট। বাণিজ্যিক লেনদেন ও এটিএম বুথে পাওয়া যাচ্ছে জাল টাকা। গত নয় মাসে দেড় কোটি টাকার বেশি জাল নোট শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শনাক্তের প্রক্রিয়ায় রয়েছে আরও প্রায় ৪০ লাখ টাকা। ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে জাল নোটের একটি বিরাট অংশ। সব মিলিয়ে দৃশ্যমান প্রায় ২ কোটি টাকার জাল নোটের কারণে চারদিকে আতংক বিরাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার জারি করে সব ব্যাংককে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছে। আইনশৃংখলা বাহিনীকে চিঠি দিয়ে সহায়তা চেয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ঈদ এলেই বেসামাল হয়ে ওঠে টাকা জালিয়াত চক্র। নানা উপায়ে বাজারে ছড়িয়ে দেয় জাল নোট। এবারও ঈদ সামনে রেখে সক্রিয় হয়ে উঠেছে চক্রটি। তাই জাল টাকা শনাক্তে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৫ সালের ৯ আগস্ট থেকে ২০১৬ সালের ৬ জুন পর্যন্ত ১ কোটি ৬১ লাখ ৩১ হাজার ২০০ টাকার জাল নোট ধরা পড়েছে। এ সময়ে মোট ১১১টি কেস জমা পড়ে। এর মধ্যে ১০০ টাকার নোট এক হাজার ১৩২টি, ৫০০ টাকার নোট ৩ হাজার ৫৫২টি ও ১০০০ টাকার নোট রয়েছে ১৪ হাজার ২৪২টি। সব মিলিয়ে ১০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকার মোট জাল নোট ধরা পড়েছে ১৮ হাজার ৯২৬টি। ধরা পড়া জাল টাকার মধ্যে রয়েছে ১০০ টাকার এক লাখ ১৩ হাজার ২০০ টাকা; ৫০০ টাকার ১৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা এবং ১০০০ টাকার ১ কোটি ৪২ লাখ ৪২ হাজার টাকা।

ব্যাংকারদের মতে, টাকা জালিয়াত চক্র ধরা পড়লেও সাক্ষীর অভাবে তারা উপযুক্ত শাস্তি পায় না। সে কারণে ছাড়া পাওয়ার পর একই ব্যক্তি আবার জাল নোট কারবারে জড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক একজন কারেন্সি অফিসার যুগান্তরকে বলেন, জাল নোট ধরা এবং মামলা করা পুলিশের দায়িত্ব। ব্যাংকের কাজ হল শুধু নোটটি জাল কি-না তা শনাক্ত করা। অপরাধীরা বের হয়ে যাওয়া কিংবা মামলা ঝুলে থাকা- এসবের দায় পুলিশের, ব্যাংকের নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে জাল নোট-সংক্রান্ত মামলা রয়েছে ৬ হাজার ২৫৭টি। আগের বছরের একই সময়ে মামলার সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৯৩৩। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৪ মাসে জাল নোট বিষয়ে মামলা হয়েছে ১০৪টি। আগের বছরের একই সময়ে মামলা ছিল ১৪৫টি। এসব মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি বিভাগ ও মতিঝিল অফিসের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মো. সাইফুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, জাল টাকার মামলা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। তারপর সাক্ষী-প্রমাণের অভাবে অথবা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধীরা বের হয়ে যায়। সাধারণত বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো জাল টাকা ধরে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকার জাল নোট নিয়ে আসে পুলিশ। ব্যাংক যাচাই-বাছাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ জালিয়াতদের বিরুদ্ধে মামলা করে। এ মামলা চলতে থাকে দীর্ঘদিন। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে শক্ত অবস্থানে যেতে হবে।

জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার বাজারে জাল টাকা ছড়িয়ে পড়া সম্পর্কে সতর্ক থাকতে একটি সার্কুলার সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া আসল নোট চেনার উপায় বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যে ভিডিও দেয়া হয়েছে তা সব বিভাগীয় শহরে প্রতি সপ্তাহে একদিন সন্ধ্যার পর কমপক্ষে এক ঘণ্টা করে গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমস্থলে বা রাস্তার মোড়ে রাখতে বলা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর শাখায় স্থাপিত টিভি মনিটরে ব্যাংকিং সময়ে ওই ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করতে হবে। এ ছাড়া গ্রাহকদের থেকে সতর্কতার সঙ্গে লেনদেন ও এটিএম মেশিনে টাকা ঢুকানোর আগে জাল নোট শনাক্তকারী মেশিনে পরীক্ষা করে নিতে বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সারা দেশে আসল নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসংবলিত এক লাখ পিস হ্যান্ডবিল বিতরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ১০০, ৫০০ ও ১০০০ হাজার টাকার নোট বেশি জাল হয়। সে কারণে হ্যান্ডবিলের পাশাপাশি এসব নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যবিষয়ক পোস্টার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ইউএনও অফিস, ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের অফিসের নোটিশ বোর্ডে টানানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। রমজান মাসজুড়ে প্রতি সপ্তাহে আসল নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসংবলিত বিজ্ঞাপন পত্রিকায় প্রকাশিত হবে। আর বিটিভিসহ সব টেলিভিশন চ্যানেলে আসল নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য বিষয়ে ভিডিওচিত্র প্রচার করা হবে।

এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন শপিং মলে সরবরাহ করা আড়াই শতাধিক জাল নোট শনাক্তকারী মেশিন সক্রিয় রাখার অনুরোধ করা হবে। এর বাইরে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দেয়া পাঁচ শতাধিক মেশিন কাজে লাগাতে বলা হয়েছে। এ দুই পক্ষের কেউ চাইলে নতুন করে আরও জাল নোট শনাক্তকারী মেশিন দেয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নোট জালিয়াত চক্রের তৎপরতা ঠেকাতে ব্যাংকগুলোকে সতর্কতা পাঠানোসহ প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

 
 
 

0 মতামত

আপনিই প্রথম এখানে মতামত দিতে পারেন.

 
 

আপনার মতামত দিন