কক্সবাজারে চার মাস ধরে জন্মনিবন্ধন বন্ধ স্কুল ভর্তিসহ নানা কার্যক্রমে ভোগান্তি

 

জেলে আবুল কাশেম (৪২)। বাড়ি কক্সবাজারের রামু উপজেলার ধেছুয়াপালং ইউনিয়নের পেঁচার দ্বীপ গ্রামে। তাঁর ছেলে আবদুল কাদের এবার ভর্তি হবে ষষ্ঠ শ্রেণিতে। কিন্তু ছেলের ভর্তি নিয়ে আছেন দুশ্চিন্তায়। কারণ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) কার্যালয়ে গিয়েও জন্মনিবন্ধন সনদ পাচ্ছেন না। কবে পাবেন সেই নিশ্চয়তাও নেই।

শুধু কাশেম নন, কক্সবাজার জেলার সব ইউপি ও পৌরসভা কার্যালয়ে এসে প্রতিদিন এমন দুর্ভোগে পড়ছেন হাজারো বাসিন্দা। রোহিঙ্গা সংকটের কারণে চার মাস ধরে জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ। আগস্টে রোহিঙ্গা আসা শুরু হলে সেপ্টেম্বর মাস থেকে কেন্দ্রীয় সার্ভারে কক্সবাজার জেলার প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায় বলে জানান জনপ্রতিনিধিরা।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, গত ২৫ আগস্ট থেকে টেকনাফ-উখিয়ায় রোহিঙ্গা ঢল শুরু হয়। এ পর্যন্ত এসেছে ৬ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি পরিচয়ে জন্মসনদ তুলে নানা কাজে লাগাতে পারে — এই সন্দেহে স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন শাখার রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত সচিব) জ্যোতির্ময় বর্মন এক স্মারকমুল্যে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত জন্মসনদ প্রদান বন্ধ রাখতে নির্দেশনা জারি করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সেই নির্দেশনা জেলার আটটি উপজেলার ৭১টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভার মেয়র বরাবরে পাঠানো হয়।

কক্সবাজারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ লাখ ২৮ হাজার ২০৩ জন রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন শেষ হয়েছে। এ ছাড়া গত আগস্ট মাস থেকে চার মাসে নতুন করে রোহিঙ্গা এসেছে ৬ লাখ ৭২ হাজার ৬ জন। আগে থেকে আছে আরও সাড়ে তিন লাখ।

গত সোমবার বেলা ১১টায় রামুর ধেছুপালং ইউপি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, জন্মনিবন্ধন ও জাতীয়তা সনদের জন্য সেখানে জড়ো হয়েছেন কয়েক শ নারী-পুরুষ। বেলা দেড়টার দিকে খালি হাতে সবাই বাড়ি ফিরে গেলেন। কখন পাবেন তার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।

ধেছুয়াপালং ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল মাবুদ বলেন, সেপ্টেম্বর থেকে কেন্দ্রীয় সার্ভারে প্রবেশ করা যাচ্ছে না। এর ফলে ইউপি কার্যালয় থেকে জন্মসনদ দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। এতে স্থানীয় লোকজন বেকায়দায় পড়েছেন। বেশির ভাগ মানুষ আসছেন সন্তানের স্কুল ভর্তির জন্য জন্মসনদ তুলতে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহীদুল আজিম বলেন, নিয়ম অনুযায়ী স্কুলে ভর্তির সময় জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া বাধ্যতামূলক। এখন বিকল্প ব্যবস্থার চেষ্টা চলছে।

জনপ্রতিনিধিরা জানান, জন্মনিবন্ধন সনদ না পাওয়ায় রেজিস্ট্রি বন্ধ থাকায় অনেকে জমিজমা বেচাকেনা করতে পারছেন না। এ ছাড়া নতুন পাসপোর্ট পাওয়া, ভোটার হালনাগাদ, কাবিননামা নিবন্ধন, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে জন্মসনদ ছাড়া কাজ না হওয়ায় এসবও আটকে আছে।

টেকনাফ পৌরসভার পল্লানপাড়ার বাসিন্দা কৃষক ফজল করিম (৩৬) বলেন, তিনি ৫ গন্ডা জমি বিক্রির জন্য গ্রাহক ঠিক করেও বিক্রি করতে পারছেন না। কারণ তিনি ১৫ দিন ধরে পৌরসভা কার্যালয়ে এসেও জন্মনিবন্ধন সনদ পাচ্ছেন না।

টেকনাফ সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর থেকে জমি রেজিস্ট্রি অর্ধেকের বেশি কমে গেছে।

টেকনাফ পৌরসভার টেকপাড়ার গৃহবধূ আমেনা খাতুন বলেন, তাঁর স্বামী প্রবাসে থাকেন। তাঁর বড় ছেলের পাসপোর্ট হবে। কিন্তু জন্মসনদ ছাড়া আবেদন করা যাচ্ছে না। এ নিয়ে তিনি বিপাকে পড়েছেন।

টেকনাফ পৌরসভার মেয়র (ভারপ্রাপ্ত) আবদুল্লাহ মনির বলেন, চলতি মাসে জন্মনিবন্ধনের জন্য পৌরসভায় আবেদন জমা পড়েছে ৫০২টি।

রোহিঙ্গাদের কারণে জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া বন্ধ রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উখিয়া বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, নতুন-পুরোনো মিলে সাড়ে ১০ লাখ রোহিঙ্গা আছে উখিয়া-টেকনাফে। ইতিমধ্যে ৯ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এখনো প্রশাসন জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া শুরু করেনি।

এ ব্যাপারে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া বন্ধ রয়েছে। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এ সমস্যা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

 
 
 

0 মতামত

আপনিই প্রথম এখানে মতামত দিতে পারেন.

 
 

আপনার মতামত দিন