টেকনাফে ইয়াবা ব্যবসায় লেনদেনে জড়িত ২৫০ মোবাইল নম্বর শনাক্ত

 


ইয়াবা ডন ইমন (৫০) ও সালাউদ্দিন প্রিন্স (২০। সম্পর্কে বাবা-ছেলে তারা। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের হাইমচরে। থাকেন রাজধানীর শেওড়াপাড়ায়। গুণধর এই বাবা-ছেলেই গোপনে দীর্ঘ দিন ধরে ইয়াবার রমরমা ব্যবসা করছিলেন। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত এজেন্টদের মাধ্যমে ২৫০টি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে টেকনাফে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে টাকা পাঠাতেন তারা। এর পর বিভিন্ন যানবাহনে ইয়াবা চলে আসত ঢাকায়। সেসব সংগ্রহ করে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে হস্তান্তর করতেন তারা দু’জন।

গত মঙ্গলবার রাজধানীর শেওড়াপাড়া থেকে বাঙলা কলেজের ছাত্র প্রিন্স ও ভিশন টেলিকমের কর্ণধার মো. স্বপনকে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। এর পর জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে, কীভাবে ইয়াবা কেনার অর্থ স্থানান্তর করা হয় নিয়মিত। চক্রটি একটি জালের মতো। টেকনাফে বসে শুধু মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীরা রাজধানীসহ সারা দেশে তাদের নেটওয়ার্ক বজায় রেখেছে। এ চক্রের অন্যতম প্রধান সদস্য প্রিন্সের বাবা আফজাল। গত ডিসেম্বরে প্রথম তাকে গ্রেফতার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মাদকের টাকা লেনদেনের গুরুতর এ অভিযোগের তদন্ত করছে সিআইডি ও বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, যেসব নম্বর থেকে নিয়মিত ইয়াবার অর্থ স্থানান্তর করা হতো, সে ধরনের ২৫০ নম্বর শনাক্ত করা হয়েছে। পুরো চক্রের আরও কয়েকজনকে খোঁজা হচ্ছে।

ইমন ও তার ছেলে প্রিন্স রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়া থেকে বিকাশের এজেন্ট ও ভিশন টেলিকমের স্বত্বাধিকারী স্বপনের মাধ্যমে টেকনাফে অর্থ পাঠাতেন। মঙ্গলবার গ্রেফতারের পরপরই স্বপনের হেফাজত থেকে ১০টি সচল মোবাইল ফোন সেট পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে ছিল ১৭টি সিমকার্ড। খোলা অবস্থায় পাওয়া যায় আরও ১৯টি সিম কার্ড, যেগুলোর প্রতিটি নম্বরই বিকাশ একাউন্ট করা। স্বপনের মাধ্যমে বাবা-ছেলের ইয়াবা কেনার অর্থ চলে যেত টেকনাফের ভুট্টোর কাছে। অধিকাংশ সময় তারা

০১৮৩৯২২৫০৭১ নম্বর ব্যবহার করতেন। স্বপনের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় ইয়াবা কেনা বাবদ ১০ লাখ ৩০ হাজার টাকা ওই নম্বরে গেছে। স্বপনের মাধ্যমে মাদকের টাকা পাচার করতেন এমন আরও তিনজন নারীকে শনাক্ত করা হয়েছে। সন্দেহাতীতভাবে তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার পর তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ইয়াবা কেনাবেচায় জড়িতদের মধ্যে রয়েছেন- নুরুল হক ভুট্টো, নূর মোহাম্মদ, জালাল উদ্দিন, বেলাল, আরিফ, আবদুর রহমান, নুরুল মোস্তফা, মোহাম্মদ তৈয়ব, রাশেদুল ইসলাম, এজাহার মিয়া, আবছার উদ্দিন, মুজিব উল্লাহ,হেলাল, মো. কামাল, হাসান, মোজাহার আলম, আবু তাহের, হামিদ,ম তারা সবাই টেকনাফের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। ৫-৬ বছর আগেও তাদের অধিকাংশ দিনমজুর হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বর্তমানে তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই বিলাসবহুল বসতবাড়ি ও গাড়ি রয়েছে।

সিআইডির একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, টেকনাফের আবদুর রহমানের মালিকানাধীন ‘স্টার ফার্মেসি’ প্রতিষ্ঠানের নামে একটি বিকাশ এজেন্ট হিসাব নম্বর (০১৮৫০৭৯৭৯৫০), একটি ডাচ্‌-বাংলার মোবাইল ব্যাংকিং রকেট এজেন্ট নম্বর (০১৬২১১০১৪২৪৫) রয়েছে। তবে তিনি তার ব্যক্তিগত বিকাশ একাউন্ট নম্বর ০১৭১৯৮৯৭৯৭৫, ০১৭৮৯০৬৫৯৫৫, ০১৮৬৭৩২৩০৭১ ও ছয়টি ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং রকেট থেকে ব্যক্তিগত একাউন্ট নম্বর ০১৮১৮০৯১৮০৩৬, ০১৬২৬১২২০২৮২, ০১৬২৬১৩৭৯১১৩, ০১৬২৬১৩৮১৫৮৬, ০১৬৮২৪২৭০৯৯৫, ০১৬৮৩১৬৬৬১০৭ নিবন্ধন করে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক বিক্রির টাকা লেনদেন করতেন। একইভাবে ‘মোবাইল গ্যালারি’ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নুরুল মোস্তফা, ‘হাসান অ্যান্ড ব্রাদার্স’-এর মোহাম্মদ হাসান এবং ‘মোজাহার স্টোর’-এর মোজাহার আলমও মোবাইল ব্যাংকিয়ের মাধ্যমে ইয়াবা কেনাবেচার টাকা লেনদেন করতেন। তারা যেসব নম্বর ব্যবহার করতেন সেগুলো হলো- ০১৮৪৩৪০০৩৮০, ০১৮৫০৭৯৭৮৯৮,০১৮৭১২৭৫০০০, ০১৭৪০৯৭৭১৩৯, ০১৮৫৭৭৩৪৩৩৩, ০১৬১৭১৪৫২২১, ০১৮৫৭৭৩৪৩৩৪, ০১৮৫২৪৯৪৯৬৫, ০১৮৪৩১৭৭২৭৭৩। এসব নম্বর টেকনাফে ব্যবহূত হয়েছে। এছাড়া আরও বিকাশ ও রকেট একাউন্টে নিয়মিত মাদক কেনাবেচার টাকা লেনদেন হতো। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- ঢাকার ০১৯৯৬৩৬৫৫৭০, ০১৭৬৫৪৯৩৯৮০, ০১৯১০৭৮৯৬২০, ০১৭৮৭৬৫৫৩৪৭, নরসিংদীর ০১৬১৬০২০০০০৮, ০১৬১১০২০০০০৩, ০১৭১১০১০০০০ এবং রূপগঞ্জের ০১৮৫১৪৯৩২৩৬, ০১৬৮৭৯০৭০০৫২ একাউন্ট নম্বর।

সিআইডির সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১৪ সালের আগে মাদক ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের মাধ্যমে অথবা নগদ অর্থ লেনদেন করতেন। এর পর তারা মোবাইল ব্যাংকিয়ের মাধ্যমে লেনদেন করে ইয়াবা কেনাবেচা শুরু করেন। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন তারা।

সিআইডির অতিরিক্ত পুর্লিশ সুপার মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ইয়াবার অর্থ লেনদেনে যেসব মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর পাওয়া গেছে, সেগুলোর মধ্যে ২০০টি এরই মধ্যে আদালতের অনুমতি নিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আরও ৫০টি নম্বর বন্ধ করার প্রক্রিয়া চলছে।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের সহকারী পুলিশ সুপার ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিন আল আজাদ বলেন, এরই মধ্যে যেসব নম্বর জব্দ করা হয়েছে সেগুলোর প্রতিটিতে গড়ে অন্তত ১০ হাজার টাকা রয়েছে। এ হিসাবে জব্দ নম্বরে ২৫ লাখ টাকা আছে। এ ছাড়া এ চক্রের কাছ থেকে নগদ ২১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা পাওয়া গেছে। পুরো চক্রটি ধরতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হয়েছে।

 
 
 

0 মতামত

আপনিই প্রথম এখানে মতামত দিতে পারেন.

 
 

আপনার মতামত দিন