দেশের সবচেয়ে সৌভাগ্যবান পুরুষ

 

আফজাল বারী : ‘এমন যদি হতো/ইচ্ছে হলে আমি হতাম/প্রজাপতির মতো’ কবি প্রজাপতি হতে চাইলেও বিএনপির অনেক নেতাই এখন বলে থাকেন ‘এমন যদি হতো/ ইচ্ছে হলে আমি হতাম/ ফালু ভাইয়ের মতো’। সক্রিয় রাজনীতিতে দেখা না গেলেও তিনি বিএনপির রাজনীতির ‘তারকা’ বনে গেছেন। তার কথায় অনেক নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই তারকা নেতার পুরো নাম মোসাদ্দেক আলী ফালু। ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর আন্দোলন বন্ধ করা এবং পানির দাবিতে লংমার্চে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্ব দেয়ার আড়ালে রয়েছে ফালুর ক্যারিশমা। সব সময় হাসিখুশি মোসাদ্দেক আলী ফালু খুশির খবরে হাসেন, দুঃখের খবরেও হাসেন। ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন হলো- স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হাসির বিকল্প নেই। তেমনি বিএনপির অনেক নেতাই মনে করেন গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়া এবং শীর্ষ নেত্রীর সুদৃষ্টি পেতে ফালুর সুপারিশের বিকল্প নেই। ছাত্রদল থেকে শুরু করে সব অঙ্গ সংগঠনের প্রায় একই অবস্থা।
রাজনীতিকরা গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয় হন জনগণের সেবা করে, দুর্দিনে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে নিবেদিতপ্রাণ হওয়া এবং জনদাবি আদায়ে ক্ষমতাসীনদের জুলুম নির্যাতন সহ্য করে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে জনগণের হৃদয়ে জায়গা করে নেন রাজনীতিকরা। একই সঙ্গে দলেও গুরুত্বপূর্ণ-প্রভাবশালী ব্যক্তি হন ওই নেতারা একই কারণে। বাংলাদেশে অনেক রাজনীতিক রয়েছেন যারা বছরের পর বছর ধরে রাজনীতি করে দলের নেতাকর্মীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। তারা দলের নীতি-নির্ধারণী দায়িত্ব পালন করেন। বড় দলগুলোর নেতাকর্মীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠা নেতাদের অধিকাংশই অবশ্য আর্থিকভাবে দুর্বল। কিন্তু ব্যতিক্রম শুধু একজনই। দলকে সুসংগঠিত করতে কোনো ভূমিকা নেই, দেশ গঠনে কোনো ভূমিকা নেই; এমনকি জনগণের দাবি নিয়ে রাজপথে কীভাবে মিছিল করতে হয় সেটাও জানেন না। অথচ তিনি দেশের সিংহ ভাগ মানুষ সমর্থিত দল বিএনপির সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার কথায় দলের অনেক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। দলের নীতি নির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির চেয়েও তার ক্ষমতা বেশি। কেন্দ্রের প্রভাবশালী জাঁদরেল নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতারা পদ-পদবি আর সুপারিশের জন্য ছোটেন তার কাছে। সব সরকারের সময়েই তার ব্যবসার প্রসার ঘটায় কয়েক বছরে ধনাঢ্য ব্যক্তিতে পরিণত হওয়া এই নেতার (!) কথায় চলে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বিএনপি। এই সৌভাগ্যবান পুরুষ বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক আলী ফালু নাকি এক সময় শাহজাহানপুর কবরস্থানের তত্ত্বাবধান করতেন।
বিএনপির সাবেক এমপি মোসাদ্দেক আলী ফালু এক সময় বিএনপি চেয়াপারসনের বডিগার্ড ছিলেন। অতঃপর তিনি হন চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হন। এ সময় তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় ও মাঠ পর্যায়ের নেতাদের নজরে আসেন। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন হওয়ায় অনেকেই ফালুকে দিয়ে প্রয়োজনীয় ফাইলে সই করিয়ে নেন। এভাবে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠা মোসাদ্দেক আলী ফালু বিএনপিতে ‘তারকা’ নেতা হন। অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে যাওয়ার পর তার সঙ্গে চলে যান বিএনপির এমপি মেজর (অব.) আবদুল মান্নান ও মাহী বি চৌধুরী। তারা সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। মেজর (অব.) মান্নানের ছেড়ে দেয়া আসন তেজগাঁ এ উপনির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ফালু। এমপি হওয়ার পর তিনি আরো গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন। পরে তিনি একাধিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য মায়ের নামে এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করে জনসেবায় মন দেন। বিএনপির চেয়ারপারসনের অধিক আস্থাভাজন হওয়ায় বিদেশি দূতাবাসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ তার বেড়ে যায়। ঢাকায় কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে তিনি গড়ে তোলেন সুসম্পর্ক। সেটা কাজেও লাগান। ১/১১ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের তার প্রতিষ্ঠান থেকে ত্রাণের টিন উদ্ধার এবং তাকে কারাগারে নেয়া হলেও তিনি পর্দার আড়াল থেকে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিএনপির অনেকেই মনে করেন একটি বিদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তার এসাইনমেন্ট নিয়ে তিনি বেগম খালেদা জিয়াকে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণে রাজি করাতে অন্যান্যদের সঙ্গে কাজ করেন। জানা যায় বেগম খালেদা জিয়া সে সময় নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিপক্ষে ছিলেন। একটি বিদেশি দূতাবাস প্রথমে চারদলীয় জোটের শরিক জামায়াতকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে রাজি করাতে সক্ষম হয়। বিএনপির শাসনামালে প্রশাসনকে ব্যবহার করে রাতারাতি ব্যবসায় ফুলিয়ে ফাপিয়ে তোলেন তারকা নেতা ফালু। সেই ধারা অব্যাহত রাখতে বিগত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের সময়ও ব্যবসার প্রসার বৃদ্ধি করতে সক্ষম হন। বিএনপির চেয়ারপারসনের আস্থাভাজন এবং দলের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য হওয়ার পরও তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গেও ব্যবসায়িক সখ্যতা গড়ে তোলেন। বিদেশি একটি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তার ব্যবসার কলেবর বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তিনি শেয়ার ব্যবসা করেও আলোচিত হন। ২০১০ সালে শেয়ার বাজার হঠাৎ করে পড়ে গেলে দেশের ৩২ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পথে বসেন। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে দেশের মানুষ। শেয়ারবাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আন্দোলন করেন। এরশাদের মতো আনপ্রেডিক্টেবল নেতাও শেয়ারবাজার ব্যবসায়ীদের আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করে কর্মসূচি দেন। অথচ বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি ছিল অনেকটা নীরব। বিএনপির এই নীরবতা রহস্যজনক মনে করেন শেয়ার ব্যবসায়ীরা। পরে জনগণের চাপে ব্যাংকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির তদন্ত করা হয়। তদন্তের পর তিনি রিপোর্টও অর্থমন্ত্রীর কাছে জমা দেন। কিন্তু অর্থমন্ত্রী কেলেঙ্কারির হোতাদের নাম দেখে তা প্রকাশ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। জানা যায়, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির হোতাদের তালিকায় তারও নাম ছিল। দেশের মানুষ বুঝে যায় বিএনপি কোনো রহস্যের জন্য শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির হোতাদের বিচারের দাবিতে উচ্চবাচ্য করা থেকে বিরত থাকে। নবম জাতীয় সংসদে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির হোতাদের গ্রেফতারের দাবি ওঠে। সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির মোসাদ্দেক আলী ফালুকে গ্রেফতার করলে শেয়ার কেলেঙ্কারির সব রহস্য বের হয়ে আসবে। কিন্তু সেটাও হয়নি। আওয়ামী লীগের শাসনামলে টেলিভিশনের মালিকরা ‘টেলিভিশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ’ গঠন করে। সরকারের আস্থাভাজন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা টেলিভিশন মালিকদের সংগঠনের সভাপতি হতে না পারলেও মোসাদ্দেক আলী ফালুকে ওই সংগঠনের সভাপতি করা হয়। অথচ এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন কামাল আহমদ মজুমদার এমপি, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, গোলাম দস্তগীর গাজী, একে আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনখ্যাত ড, মাহফুজুর রহমান প্রমুখ। এদের কেউ সভাপতি না হতে পারলেও জাদুবলেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত মোসাদ্দেক আলী ফালু সংগঠনের সভাপতি হন।
বিএনপির নেতাদের ওপর দিয়ে সুনামি বয়ে যাচ্ছে। সরকারের জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপির নেতাদের ওপর চরম জুলুম-নির্যাতন করা হয়। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, বিদেশে অবস্থানরত ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থানীয় কমিটির ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, এম কে আনোয়ার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ শত শত নেতা বার বার গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করছেন। তাদের বিরুদ্ধে জুলুম-নির্যাতন চলছে। এমনকি একেকজন নেতার বিরুদ্ধে ২০/২২টা থেকে ১২০টি পর্যন্ত মামলা করা হয়। প্রায় প্রতিদিন বিএনপির সিনিয়র নেতাদের কেউ না কেউ আদালতে যাচ্ছেন। বর্তমানে বেশ কয়েকজন কারাগারে রয়েছে। অথচ একমাত্র সৌভাগ্যবান হলেন মোসাদ্দেক আলী ফালু। তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ থাকার পরও শুধু বিদেশি একটি দূতাবাসের এজেন্ডা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় নির্বিঘেœ দেশ-বিদেশে ঘুরছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি মাসের বেশির ভাগ সময় এখন বিদেশে থাকেন। দেশে থাকলে বিদেশি দূতাবাসগুলোতে তার অবাধ যাতায়াত। ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের আগে আন্দোলনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন আমি সব খবর রাখি। বেগম খালেদা জিয়া কখন কি করেন, তিনি কখন কি তরকারি দিয়ে ভাত খান সে খবর আমার কাছে আছে। বিএনপির অনেক নেতাই সে সময় কানাঘুষা করেন যে এই সূত্রধর হচ্ছেন মোসাদ্দেক আলী ফালু। তিনিই বিএনপির কর্মসূচি সম্পর্কে সরকারকে জানিয়ে দেন। নির্বাচনের পর হঠাৎ করে আন্দোলন বন্ধ করে দেয়া এবং তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে বিএনপির লংমার্চে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব না দেয়ার পিছনেও ওই মোসাদ্দেক আলী ফালুর ক্যারিশমা রয়েছে বলে জানা গেছে।

 
 
 

0 মতামত

আপনিই প্রথম এখানে মতামত দিতে পারেন.

 
 

আপনার মতামত দিন