নির্যাতনের ভয়বহতায় বেচে আছে শুধ নিঃশ্বাস

 

pic-m
তপ্ত খুনে রঞ্জিত বিশ্ব মানচিত্রে এক ভূ-খন্ডের নাম মায়ানমার। যার বুকে বইছে মজলুম মুসলমানদের রক্ত স্রোত। বর্বর বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের শিরচ্ছেদ করে উল্লাস করছে। গুলিতে নিহত রক্তাক্ত লাশের পাশে কাঁদছে নারী, শিশু এবং স্বজন। আগুনে পুড়ে অঙ্গার হওয়া লাশের পাশে বসে আহাজারি করছে তাদের স্বজন। রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর এমন অত্যাচার চলছে যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। নির্যাতনের ভয়াবহতা এতোই প্রবল যে, রাখাইন প্রদেশ ছেড়ে রোহিঙ্গারা যে যার মতো পালাতে শুরু করেছে পরিবার পরিজন নিয়ে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই তুমবুরুং সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছে বাংলাদেশে।
আজকে এমনই কয়েকজনের কথা বলবো যারা নির্যাতিত হয়ে বেঁচে এসেছে বাংলাদেশে। অত্যাচারের শিকার হয়েও প্রাণে বেঁচে আছে বাংলাদেশের মাটিতে।

মোহাম্মদ আমিন: পরিবার পরিজন নিয়ে মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশের গ্রাম ফোয়াখালীতে বাস করতেন তিনি। দুই সন্তানের জনক মোহাম্মদ আমিন নিজ চোখে দেখেছেন পরিবার পরিজনের মৃত্যু। নিজের পিতাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের শরীরে বহন করছেন মারাত্মক জখম অর্থাৎ ধারালো দা দিয়ে কোপানোর যন্ত্রণা। পিতাকে বাঁচাতে পারেননি তিনি। তবুও নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে পরিবারের দুইজনকে নিয়ে সব হারিয়ে কোন রকমে দুদিন আগে তুমরুং সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের উখিয়ায় কুতুপালং গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। শরীরে জখমের সাথে সাথে পরিজন হারানোর কষ্টে কোন রকমে বাংলাদেশের মাটিতে বেঁচে আছেন মোহাম্মদ আমিন।
নুর আলম: নূর আলম মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশের কিয়ারিংপ্রান নামক পাড়ায় বাস করতেন পরিবারের সাথে। বাবা-মার সাথে ভালোই কাটছিলো দিন। কে জানতো তার নিয়তিতে এমন দিন আসবে?
মিয়ানমারের বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের চালানো অভিযানে পায়ে গুলি খেয়ে প্রাণে বেঁচে গেলেও চিরতরে হারিয়েছেন চলার শক্তি। অসহায়ের মতো পড়ে আছেন মাটিতে। গুলিতে জখম হওয়ার পর বহু কষ্টে মায়ানমার থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশে। চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা নেই, তবুও বেঁচে আছেন এটাই বা কম কিসের? হয়ত স্বজনদের হারিয়ে দুর্বিষহ জীবনে বেঁচে থাকাটাই সান্ত¡না।

বাকি বিল্লাহ শিবলী: উনার গল্পনা একটু আলাদা। দশ বছর বয়সে বড়ভাই রহিমুল্লার হাত ধরে পরিবার সহ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন বাকি বিল্লাহ শিবলী। বাংলাদেশের বুকে উখিয়ার কুতুপালংএর আনরেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পরিবারের সাথে ভালোই কাটছিল দিন। কিন্তু বর্তমানে মায়ানমারের বৌদ্ধ সন্ত্রাসী এবং সরকারি বাহিনী কর্তৃক সংগঠিত প্রাণ সহিংসতার কবলে তার স্বজনরা। এতো কষ্ট কি আসলেই সহ্য করার মতো ছিল। তাই নিজ খালাতো বোন এবং কয়েকজন আত্মীয়-স্বজনের তুমবুরুং সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের খবর শুনে তাদের আনতে চলে যান সীমান্তে। স্বজন ফিরে পাওয়ার উত্তেজনায় ভুলক্রমে প্রবেশ করেন মায়ানমার সীমান্তে, সাথে সাথে ধরা পড়ে যান লুনপিনের হাতে। সবার উপর চালানো হয় আমানুষিক নির্যাতন এবং এক পর্যায়ে গুলি চালানো হয় কিন্তু বেঁচে থাকবেন বাকি বিল্লাহ শিবলী এটাই নিয়তি। ঐ গণলাশের আড়ালে বেঁচে গেলেন তিনি। বুলেট ছুঁতে পারেনি তার শরীর। কিন্তু লুনপিনের অত্যাচারের নমুনা হিসেবে তার উফড়ে ফেলা নখ নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। বাংলাদেশের আনরেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কুতুপালং এর হাসপাতালে চিকিৎসার পর কিছুটা ভাল আছেন তিনি। কিন্তু নির্যাতন নিজ চোখে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেছেন তিনি। ধরা পড়ার পর কখনো কল্পনা করেননি দুনিয়ার আলো দেখবেন আবার কিন্তু বেঁচে থাকাটাই যেন সৃষ্টিকর্তার লিখন।

মহিউদ্দীন: জ্বলজ্বল চোখের এ ছোট্ট শিশুটির নাম মহিউদ্দীন। খেলাধুলায় যার জীবন কাঠানোর দিন, যার জীবনা আকাশে অজস্র ঘুড়ি উড়ার কথা তার জীবনে হঠাৎ নেমে এলো অমানিশা। পরিবারের সবাইকে হারিয়ে মায়ানমারের বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের গুলিতে জখম নিয়ে কোন বেঁচে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে সে। চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত টাকা নাই। স্বজনেরা মরে গেছে। জীবনে তবুও স্বাভাবিকতার জন্য বেঁচে থাকার আশা। প্রাণটাই একমাত্র সম্বল মহিউদ্দীনের।

 
 
 

0 মতামত

আপনিই প্রথম এখানে মতামত দিতে পারেন.

 
 

আপনার মতামত দিন