প্রাণহানি ও বিনাভোটে জয়ের রেকর্ড

 

218280_1rrr

সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও বিনাভোটে জয়ের রেকর্ড গড়ার মধ্যদিয়ে ছয় ধাপে চার হাজার ৮৯টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন শেষ হলো। দলীয় প্রতীকে ইউপি চেয়ারম্যান পদে প্রথমবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন নজিরবিহীন সব খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরই শুরু হয় সংঘর্ষ ও প্রাণহানি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এর আগে আটবার ইউপি নির্বাচন হয়েছে। আর এ বছরের ছয় ধাপের নির্বাচনে গতকাল শনিবার পর্যন্ত ১১৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। বিনাভোটে নির্বাচিত হয়েছেন ২১১ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী। এছাড়া এবারের নির্বাচনে রাতে ব্যালট পেপারে সিলমারা, ভোটের দিন ব্যালট বাক্স ও ব্যালট ছিনতাইয়ের অসংখ্য ঘটনা ঘটে। প্রিজাইডিং অফিসার ও পুলিশের পোশাকে ব্যালটে সিলমারা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ভোটকেন্দ্রে স্থগিতের ঘটনাও অতীতের সকল নির্বাচনকে ছাড়িয়ে গেছে। সংখ্যালঘুদের উপরও নির্যাতন চালানোর ঘটনা ঘটেছে।

নির্বাচন কমি-শনের (ইসি) নির্লিপ্ততা, প্রশাসনের স্বাধীন-সক্রিয় অবস্থান না থাকা ও দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই অভিমত স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের। নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে রাজনৈতিক মহলেও। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) মতে, ইউপি নির্বাচন দুঃস্বপ্নের নির্বাচন। এই নির্বাচনে মৃত ব্যক্তিরাও ভোট দিয়েছেন! যা স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ।

তবে ছয়ধাপের নির্বাচন শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ গতকাল দাবি করেছেন- অতীতের যে কোনো বারের চেয়ে এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ভালো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, আগের চাইতে ভালো নির্বাচন করা গেছে। প্রথম পর্বে যেভাবে শুরু হয়েছিল তার চেয়ে ইমপ্রুভ হয়েছে। আজকের পর্ব শুধু নয়, সামগ্রিকভাবে আমি বলেছি যে ভালো নির্বাচন করা গেছে।’

গত ১১ ফেব্রুয়ারি তফসিল ঘোষণার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত ছয়ধাপের ইউপিতে কমপক্ষে ৯ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। সাড়ে তিনশর মতো ভোটকেন্দ্র স্থগিত করা হয়। বল প্রয়োগ ও কেন্দ্র দখলের এই ভোটে বেশিরভাগ ইউপিতে বিজয়ী হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা। অন্যদিকে সোয়া ৬শর মতো ইউপিতে সরকার দলের ভয়ভীতির কারণে প্রার্থী দিতে পারেনি বিএনপি।

ভোটে যে ১১৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, তাদের মধ্যে নির্বাচনপূর্ব সংঘর্ষে ৪৫ জন, ভোটের দিন সংঘর্ষে ৫১ জন এবং ভোটের পর সংঘর্ষে ১৯ জন মারা গেছেন। চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থক ৫৪ জন, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থক ১৭ জন, বিএনপির ছয় জন, জাতীয় পার্টি-জেপির একজন, জনসংহতি সমিতির একজন এবং চার জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী নিহত হয়েছেন। বাকিদের মধ্যে সদস্য প্রার্থীর কর্মী-সমর্থক ৩২ জন। নিহতদের মধ্যে কয়েকজন চেয়ারম্যান ও মেম্বার প্রার্থীও রয়েছেন।

ইউপি নির্বাচনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে একদিনে অনুষ্ঠিত চার হাজার ৩০১টি ইউপির ভোট ছিল সবচেয়ে সহিংসতাপূর্ণ। ওই ভোটে ৮০ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। ১০০ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী বিনাভোটে জয়ী হয়েছিলেন।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯২ সালে ৩ হাজার ৮৯৯টি ইউপিতে ভোট হয়। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও সবচেয়ে বেশি ইউপিতে জয় পেয়েছিল আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা। মাত্র ৪টি ইউপিতে চেয়ারম্যান, মেম্বার সবাই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। আর প্রাণহানি ঘটেছিল মাত্র তিন জনের।

১৯৯৭ সালে চার হাজার ৪০০টি ইউপিতে ভোট হয়। সে বার সহিংসতায় প্রাণহানি ঘটে ৩১ জনের। সহিংসতার জন্য ৪১৮টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছিল। আর বিনাভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন ৩৭ জন। এ ছাড়া ৫৯২ জন সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ড সদস্য এবং এক হাজার ৯৬ জন সাধারণ ওয়ার্ড সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

২০০৩ সালে চার হাজার ২২৩টি ইউপিতে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে ২৩ জনের প্রাণহানি ঘটে। একজন ম্যাজিস্ট্রেট ও একজন পুলিশ সদস্যসহ চারজন নির্বাচনী কর্মকর্তার মৃত্যু হয় এবং আহত হন ৫ জন নির্বাচনী কর্মকর্তা। ১০৩টি ইউপির ১৪০টি ভোটকেন্দ্রে ভোট স্থগিত করা হয়েছিল তখন। নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ৩৪ জন, সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ড সদস্য পদে ৪৫২ জন এবং সাধারণ ওয়ার্ড সদস্য পদে ৬৫১ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

২০১১ সালে সারাদেশে চার হাজার ৩৬৬টি ইউপিতে ভোট হয়। সেই সময়ে নির্বাচনে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে বলে জানিয়েছে ইসি সচিবালয়ের সংশ্লিষ্টরা। ওই নির্বাচনে দেড় শতাধিক কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়েছিল। ৯ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী বিনাভোটে জয়ী হন বলে ইসির সংশ্লিষ্টরা জানান।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সালে প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৭৩ সালে। ওই নির্বাচনে সব ভোটকেন্দ্রে পুলিশও নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। চৌকিদাররা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু তেমন সহিংসতা হয়নি সেই সময়ে। একই পরিস্থিতি ছিল ১৯৭৭ সালে। ১৯৮৩ সালে এসে নির্বাচনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর অর্পণ করা হয়। ৮৩ সালে সামরিক শাসনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বড় ধরনের সহিংসতার তথ্য পাওয়া যায়নি।

অতীতের সব নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনে সহিংসতায় প্রাণহানি ও বিনাভোটে জয়ের সব রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে। এই প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে সরকার দলীয় প্রার্থীরা বেপরোয়া হয়ে পড়েছে। তাদের সঙ্গে একই দলের বিদ্রোহীদের সংঘাত হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে এ পর্যন্ত যত সংঘাত হয়েছে তার অধিকাংশই হয়েছে নৌকা বনাম আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে।

উল্লেখ্য, এবার ছয় ধাপে চার হাজার ৮৯টি ইউপিতে ভোট সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে গত ২২ মার্চ ৭১৪টি, ৩১ মার্চ ৬৩৯টি, ২৩ এপ্রিল ৬১৫টি, ৭ মে ৭০৪টি, ২৮ মে ৭১৭টি এবং ৪ জুন ৭০০টি ইউপিতে ভোট হয়।(

 
 
 

0 মতামত

আপনিই প্রথম এখানে মতামত দিতে পারেন.

 
 

আপনার মতামত দিন