বুটের তলায় গণতন্ত্র : সাগরে ভাসছে মানবতা

 

untitled-1_81431 মাহমুদা ডলি
 ‘আমার ভোট’, কে বলল আমার! এ কথা বলার মত গণতান্ত্রিক অধিকার কী আমাদের  আছে? গত বছরের ৫ জানুয়ারির একতরফা, বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর ২৮ এপ্রিল ৩ সিটির নির্বাচন বাস্তব প্রহসন। রাজ কোষের কোটি কোটি টাকা ফুটকড়াই করে গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে বিরোধী নিধনযজ্ঞ আয়োজন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। তার ওপর সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা যেসব বেদ বাক্য ছুড়ছেন। তাদের সহযোগী দলকানা আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীকে যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছেন, তাতে এখন দায়িত্ব-কর্তব্যহীন নাগরিক হয়েই যেন থাকাটা শ্রেয়।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন বাদ দিলাম। বিএনপি যে নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচনের আশায় সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। সেই নির্বাচনে ভোটের দিন বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে যা দেখা গেল- তাতে আমার বাড়ি, আমার ঘর বলতে পারি। কিন্তু ভোটটি আমার এ কথা বলার উপায় দেখলাম না। ভোট দিতে ঢুকে প্রবীণ লোকটি বের হওয়ার আগে ধন্যবাদ জানিয়ে দিল স্বেচ্ছাসেবক লীগকে। কারণ, তারা ওই প্রবীণ লোকটির ভোটটি আগেই দিয়ে দিয়েছেন। বলল, ধন্যবাদ জানিয়ে আসলাম তাদের, কারণ তারা তো আগেই আমার ভোটটি দিয়ে দিয়েছে। এ কথা আমার নয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের একটা ক্ষুদ্র অংশ তুলে ধরলাম। নির্বাচন নিয়ে এ ধরণের প্রহসন বিষাক্ত তীরের ফলার চেয়েও ভয়ংকর। তাত্ত্বিক কথা নয় এসব।সরকারের আজ্ঞাবহ, অক্ষম নির্বাচন কমিশনার যতই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন জনগণের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করুন না কেন, অসন্তোষের চোরা রাতে থেকেই যাচ্ছে।

যেভাবে নির্বাচন কমিশনসহ আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী বিশেষ সুযোগ সুবিধা নিয়ে দেশের জনগণের মাথার ওপর দিয়ে অনেক উঁচুতে উঠেছেন। কিন্তু অবশেষে পতনটা হয়েছে অনেক উঁচু থেকে। একেবারে মাটিতে আছড়ে পড়ার মতোই! খুবই করুণ!

এ  সরকারের আমলে খেয়োখেয়িটা খুব বেশি। একই সঙ্গে বিচলিত হয়ে যেটা দেখা যাচ্ছে স্বার্থপর এসব লোকগুলো আবার উল্টো দাম্ভিকতা দেখাচ্ছে। আওয়ামী লীগ এবং তাদের স্বপক্ষের সুবিধাবাদী দলকানা লোকগুলোর দাম্ভিকতা বাংলা প্রবচনের মতো- ‘চুরি তো চুরি, আবার সিনাজুরি’।

কে শোনে কার কথা! নির্বাচনের দিন পুলিশের যে ক্ষমতা দেখালো। মির্জা আব্বাসের বাড়ির পাশের ভোট কেন্দ্র। সেই কেন্দ্রেই আব্বাসের পোলিং এজেন্টরা ব্যালট পেপার পায়নি। এক ঘণ্টা সাংবাদিকদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী, ‘পুলিশের সহযোগিতায় আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনগুলো এক ঘণ্টায় ৫৭ কেন্দ্র দখল করেছে’। এছাড়া ভোটের দিন সকাল ৮টার মধ্যে ৪৮ কেন্দ্রে শতভাগ ভোট সম্পন্ন দেখানো হয়েছে। কি কেরামতি দেখিয়েছে পুলিশ!  আফরোজা আব্বাসকে ফকিরাপুল এলাকার কেন্দ্র থেকে পুলিশের সামনে আওয়ামী লীগের নেতারা ধাক্কা দিয়ে বের  করে  দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নিয়ে পুলিশ বাহিনী একটা হাস্যকর জায়গায় চলে গেছে। অপরদিকে পুলিশকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে গিয়ে সুকৌশলে পুলিশের মেরুদ-টিকেই গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তার বড় প্রমাণ মানবপাচার, একটার পর একটা ডাকাতির ঘটনা, একটার পর একটা ট্রিপল মার্ডার, জোড়া খুন, রাহাজানি, মাদক ব্যবসায়ীদের বেপরোয়া আচরণ ও দেশ জুড়ে চরম অস্থিরতা।

অপরদিকে পুলিশ-প্রশাসনের বিবেক ঘুমাচ্ছে। সীমাহীন রাজনৈতিক আনুগত্য লাভের আশায় পুলিশ বাহিনী, র‌্যাবের সর্বোচ্চ স্তরে চলছে চাটুকারিতা। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যখন পুলিশ গুলি ছুড়ছে, তখন অবৈধ সরকারের আচরণে আমলাতন্ত্র, পুলিশ প্রশাসন সর্বস্তরে বিষ ছড়িয়ে পড়েছে। গণতন্ত্র আজ পুলিশের বুটের তলায় বলেই সাগরে ভাসছে মানবতা।

থাইল্যান্ডে, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কাছাকাছি উপকূল ও সাগরে এখনো নৌকায় ভাসছে পাচার হওয়া বহু মানুষ। ইন্দোনেশিয়ার আচেহ সমুদ্র উপকূলের কাছ থেকে গত শনিবার আরও ২০০ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়। ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী তাদের উদ্ধার করে। এর আগে শুক্রবার ভোরে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ উপকূলে ডোবার মুখে এক নৌকা থেকে ৭৯৪ বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিককে উদ্ধার করেন স্থানীয় জেলেরা। প্রাথমিকভাবে বন্দর-নগরী লাংসায় অভিবাসীদের আশ্রয় দেয়া হয়। এদের অনেকেই ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও রোগাক্রান্ত হয়ে কাতর অবস্থায় ছিল। এর আগে থাইল্যান্ডের মালয়েশিয়া সীমান্তবর্তী জঙ্গলে অবৈধ অভিবাসীদের গণকবর পাওয়া যায়। বাংলাদেশের টেকনাফ উপকূল দিয়ে তারা পাচার হয়েছিল বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রচার করেছিল। মানবপাচারকারীদের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী অভিযান চালাতে ব্যর্থ হয়েছে। থাইল্যান্ডে গণকবর পাওয়ায় স্থানীয় মেয়রকে প্রত্যাহারসহ ২’শ পুলিশ

সদস্যর  বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে দেশটির সরকার। অথচ যে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে গেল হাজার হাজার মানুষ সে দেশের (মানবপাচারের সঙ্গে যারা জড়িত)  আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকার। গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমাতে যে দেশের সরকারদলীয় সন্ত্রাসীরা পুলিশের পোশাক আর অস্ত্র হাতে নিয়ে পুলিশের পাশাপাশি বিরোধী দল দমনে অংশ নেয়। সে দেশের আবার পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া কথা ভাবা যায়কি? প্রশ্নে দেখা দিয়েছে বাংলাদেশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কি করে বজায় থাকবে? বিএনপি বলেছে দেশে প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান নেই বলেই আজ এ অবস্থা।

ইদানিং একের পর এক ব্লগার খুন হচ্ছে আর তা রাজনৈতিক সমীকরণে ব্যস্ত থাকছেন গোয়েন্দা সংস্থাসহ বেশ কিছু কর্মকর্তারা।  আজকাল তো আওয়ামী লীগের পোষ্য ইমরান এইচ সরকারই প্রকাশ্যে বলছেন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এসব হত্যাকা- ঘটছে। যাবতীয় ট্রেনিং ভুলে, পুলিশি শিক্ষা, পেশাদারী নীতি ভুলে যেভাবে বিরোধী দলগুলোকে শায়েস্তা করতে জঙ্গি কার্ড খেলছে এসব কর্মকর্তারা, তাতে বিন্দুমাত্র লজ্জিতও নন তারা। রীতিমত নিজেদের কৃতকর্মের সাফাই গাইতে গিয়ে যেসব হুঙ্কার ছাড়েন তা ওয়ান ইলেভেনকেও ছাড়িয়ে গেছে।  বিশেষ করে আজকে  পুলিশি রাষ্ট্রের জন্য দেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাজনীতি বলতে কিছুই নেই।

(প্রকাশিত মতামত একান্তই লেখকের নিজস্ব)

 
 
 

0 মতামত

আপনিই প্রথম এখানে মতামত দিতে পারেন.

 
 

আপনার মতামত দিন