রোহিঙ্গাদের আগমনে পরিবেশে ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে : ওয়ান প্লানেট সামিটে প্রধানমন্ত্রী

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিয়ানমার থেকে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা আগমনের ফলে বাংলাদেশের বন ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজনের ওপর মারাত্মক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা আসার ফলে বাংলাদেশ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। মানবিক কারণে আমরা কক্সবাজারে ১ হাজার ৭৮৩ হেক্টর বনভূমির উপর তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছি।গতকাল মঙ্গলবার ওয়ান প্লানেট সামিটে উচ্চপর্যায়ের সভায় এক বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গা সংকট আমাদের বন ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম, যদিও এই ঝুঁকির জন্য আমরা দায়ী নই। তিনি বলেন, আমরা সীমিত সম্পদ নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি প্রশমন ও অভিযোজন করে যাচ্ছি।

শেখ হাসিনা বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে প্রণীত টেকসই উন্নয়ন কৌশলের মূলস্রোতে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, একটি উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবিলায় জিডিপি’র ১ শতাংশ ব্যয় করে আসছে।

সকল অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশ কর্মকাণ্ডে ওয়াটার সাসটেইনেবিলিটি ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এ শীর্ষ সম্মেলনে একশ বিশ্ব নেতাসহ বেসরকারি সংগঠন, ফাউন্ডেশন এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রায় ২ হাজার প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে তাঁর অঙ্গীকারের কথা পুনরায় উল্লেখ করেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রনের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রকল্প গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য ও বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন রক্ষায় ৫০ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে একটি বিশাল প্রকল্প বর্তমানে চলমান রয়েছে।

তিনি বলেন, উপকূলীয় এলাকার জনগণকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভাঙন এবং লবণাক্ত পানি থেকে রক্ষায় সবুজ বেষ্টনী সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রায় ৬৭ হাজার হেক্টর জমি এসব এলাকায় বনায়নের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশে বনায়ন ২ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করবে। ফলে বিদ্যমান বনভূমি ২২ শতাংশ থেকে প্রায় ২৪ শতাংশে উন্নীত হবে।

তিনি বলেন, পার্টনারদের সমর্থনসহ আমাদের নিজস্ব সম্পদ দিয়ে এই টার্গেট পূরণে আমরা প্রচেষ্টা জোরদার করব। শেখ হাসিনা জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারপূরণ এবং ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের জন্য উন্নত দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, একমাত্র দায়িত্ব ভাগাভাগির মাধ্যমে আমরা বিশ্বকে নিরাপদ করতে পারি। আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার ও কর্মকাণ্ড শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।

রোহিঙ্গাদের আবাসের পাশাপাশি স্থানীয় কিছু সুবিধাভোগী সরকারি বন উজাড় করায় হারাতে বসেছে এসব এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। রোহিঙ্গাদের ঘনবসতির কারণে এসব এলাকায় হাতিসহ অন্যান্য পশুপাখির উপস্থিতি যেমন কমছে, অন্যদিকে জলাভূমিতে মানব বর্জ্য মিশে যাওয়ায় হারাতে বসেছে অনেক জীব বৈচিত্র্য।

উখিয়ার পাশেই বান্দরবানের ঘুমধুন। চারপাশে গাছ থাকলেও বনের ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় শত শত গাছের কেটে ফেলা অংশ। সরকারি জায়গা হলেও গাছ কাটার কোন অনুমতির দরকার হয়না বরং যে চিহ্নটুকু অবশিষ্ট আছে সেটুকু নিশ্চিহ্ন করার ব্যাস্ততা।

নইক্ষ্যংছড়ির ভেতরের অনেক পাহাড় বিশেষ করে যেসব পাহাড় দিয়ে হাতি পারাপারের রাস্তা ছিলো সে স্থানগুলো লিজ নিয়ে কাঁটাতারের বেড়ায় আটকে দেয়া হয়েছে। ফলে গত ত্রিশ বছরে বন্য হাতি চলাচলের রাস্তাও পরিবর্ত হয়েছে বার বার। এছাড়া গত তিন মাসে উখিয়া অংশে হাতি পারাপারের রাস্তায় রোহিঙ্গা বসতি হওয়ায় গত দুই মাসে এসব এলাকায় বন্য হাতি দেখা যায়নি বলে জানান স্থানীয়রা।

এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে আসরা মানববর্জ্য এসে মিশে যাচ্ছে জালাভুমিতে। উখিয়ার ষাট হেক্টর জলাভূমি আর সেখানকার জৈববৈচিত্র এখন হুমকির মুখে। এছাড়া পাহাড় কাটায় জলাভূমিগুলো স্বাভাবিক গভীরতাও হারাচ্ছে।

পরিবেশ ও পর্যটনকর্মী কলিম উল্লাহ বলেন, ‘কক্সবাজারের গভীর বনে জীব-যন্তু এবং যে প্রাণীগুলো ছিলো সেগুলো এখন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। প্রাণীগুলো হয়তো বার্মায় চলে যাচে নয়তো বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’

পরিবশেকর্মীদের মতে, প্রকৃতির এই ক্ষতির প্রভাব পড়বে পর্যটনের ক্ষেত্রেও।

কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের কর্মী দীপক শর্মা দীপু বলেন, ‘এখানে বন্য প্রাণী, পাখি এবং উদ্ভিদ ছিলো সেটা হারিয়ে যাচ্ছে সেগুলোকে জাগিয়ে তোলা আর সম্ভব হবে না।’

যুগ যুগ ধরে উখিয়া আর বান্দরবানের স্থানীয়রা তাদের জীবনাচারে প্রকৃতিকে আশীর্বাদ হিসেবে পেয়েছেন। সেই প্রকৃতি যখন হুমকির মুখে তখন তার প্রভাব পড়বে যাপিত জীবনেও।

 
 
 

0 মতামত

আপনিই প্রথম এখানে মতামত দিতে পারেন.

 
 

আপনার মতামত দিন