রোহিঙ্গাদের নয়া অভিভাবক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা

 

মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের নয়া অভিভাবক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের অত্যাচার-নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা শুনে কাঁদলে এই মানবিক সরকার প্রধান। আশ্বাস দিলেন, সাধ্যমত সহযোগিতার।
মিয়ানমারে হত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন করে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সাধারণ নিরীহ মানুষের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কেন এই অত্যাচার? এরা তো মিয়ানমারেই লোক। লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে, সেখানে এখনও আতঙ্ক চলছে, অনেকে আপনজনের হদিস পাচ্ছেন না। নাফ নদীতে শিশুর লাশ, পুরুষ ও নারীদের লাশ! এটা সম্পূর্ণ মানবতাবিরোধী কাজ। এ ধরনের ঘটনা অমানবিক, মাববিধাকারের লঙ্ঘন।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, ‘স্বজন হারানোর বেদনা আমি বুঝি। ঘরবাড়ি হারিয়ে যেসব রোহিঙ্গা এখানে (বাংলাদেশে) এসেছেন, তাঁরা সাময়িক আশ্রয় পাবেন। তাঁদের মিয়ানমারে ফিরে যেতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত রোহিঙ্গাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা যাতে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন, সে ব্যাপারে চেষ্টা চলছে।’

মঙ্গলবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে সংক্ষিপ্ত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। গতকাল সকাল সোয়া ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। কক্সবাজার বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, উপদফতর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

তারপর সেখান থেকে সড়কপথে কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে যান তিনি। বেলা সাড়ে ১১টায় পৌঁছান উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে। কুতুপালং ক্যাম্পে পৌঁছে শেখ হাসিনা সেখানে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের নারী, পুরুষ, শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন। সফর সাথীদের সঙ্গে নিয়ে পরিদর্শন করেন সাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প। পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী সেখানকার বিভিন্ন ক্যাম্পে থাকা নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন।

প্রাণ ভয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদারবাহিনী আমাদের ঘর পুড়িয়েছে, সেসময় আমরা সব হারিয়েছি। এরপরও ভেঙ্গে পড়িনি। আপনারও ভেঙ্গে পড়বেন না, নিজের দেশে অবশ্যই ফিরতে পারবেন।

কক্সবাজারে উখিয়া শরণার্থী শিবির পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ শান্তি চায়, সৌহার্দ চায়, কিন্তু কোনো অন্যায় মেনে নেয়া হবে না। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব অব্যাহত রাখতে চাই। মানবিক দিক বিবেচনা করেই আমরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। তাদের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছি।” মানবিক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ মিয়ানমারের শরণার্থীদের আশ্রয় দিলেও এ দেশের ভূমি ব্যবহার করে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানো হলে তা বরদাশত করা হবে না বলেও হুঁশিয়ার করেছেন সরকার প্রধান।
আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত নিতে হবে মিয়ানমারকে। এ জন্য দেশটির ওপর চাপ দিতে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।

মিয়ানমার সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার সরকারকে বলবো, তারা যেন নিরীহ মানুষের ওপর কোনো ধরনের নির্যাতন না করে। নিরীহ মানুষের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। যারা প্রকৃত দোষী তাদের খুঁজে বের করুন। এ ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে যে সহযোগিতা দরকার, আমরা তা করবো। সন্ত্রাসী কার্যক্রম আমরা কখনোই মেনে নেবো না’।
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আর্তমানবতার প্রয়োজনে যতক্ষণ আপনাদের পাশে থাকা দরকার আমরা পাশে থাকব। এজন্য জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বর্ডারগার্ড সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, কোনো বেসকারি সংস্থা বা অন্য কোনও সংগঠন রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বা সাহায্য সহযোগিতা করতে চাইলে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটের সুযোগ নিয়ে কেউ যেন কোনও ধরনের বাণিজ্য করতে না পারে সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে বলেও জানান তিনি।

কুতুপালং ক্যাম্পে পৌঁছে শেখ হাসিনা সেখানে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের নারী, পুরুষ, শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় নারী ও শিশুদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠলে চোখ ভিজে ওঠে নয়া অভিভাবক শেখ হাসিনার। তার সঙ্গে থাকা ছোট বোন শেখ রেহানাকেও চোখ মুছতে দেখা যায়।
“এ ঘটনা দেখে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। মানুষ মানুষের মতো বাঁচবে। মিয়ানমারের মানুষের কেন এত কষ্ট!”
আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই আহত ও ঘরহীন। নির্ধারিত ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের দেখতে গিয়ে সেখানে অবস্থানরত শিশুদের পরম মমতায় জড়িয়ে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সময় নিয়ে মনযোগ দিয়ে তাদের কথা শোনেন। সেখানকার নারীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কান্নাজড়িত মুখ দেখার সঙ্গে সঙ্গে পা ছুঁয়ে তাকে সালাম করতে দেখা গেছে।

রোহিঙ্গাদের কষ্টের কথা শুনে আবেগে নারী-শিশুদের জড়িয়ে ধরেন শেখ হাসিনা। পরম মমতায় তাদের বুকে টেনে নেন। আশ্রয় নেওয়া অসহায় রোহিঙ্গা নাগরিকরা তাদের ভাষায় প্রধানমন্ত্রীকে দুঃখ-কষ্টের কথা বলেন। একজন দোভাষি পারস্পরিক কথাবার্তায় সহযোগিতা করেন। রোহিঙ্গাদের কষ্ট শুনে কাঁদলেন প্রধানমন্ত্রী।এ সময় আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।
আশ্রয় ও সহযোগিতা পেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান রোহিঙ্গারা।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আস্থার জায়গা এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারা মনে করেন, এই মানবিক প্রধানমন্ত্রীই পারেন তাদের ঘরে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে। যিনি আশ্রয় দিয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন, খাবার দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করেছেন, সেই শেখ হাসিনার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা আর আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে।
তাদের কষ্ট লাঘবে সহযোগিতা এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে মিয়ানমারে ফিরে যেতে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভূমিকা রাখবেন বলেও মনে করেন এই বিশাল রোহিঙ্গা গোষ্ঠি।

রোহিঙ্গারা বলেন, ‘বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আমরা জীবন বাঁচাতে পারছি। আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞ’। আমরা যেন মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে অধিকার নিয়ে মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারি, আমাদের ওপর যেন নির্যাতন বন্ধ হয়। আমরা চাই, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই অনুরোধ ও প্রত্যাশা করেন এই নয়া অভিভাবকের প্রতি।
কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেন, যারা আশ্রয়ের জন্য এসেছে, তাদের যেন কোনো কষ্ট না হয়।
শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের নামে কেউ যেন ‘নিজের ভাগ্য গড়ার খেলা’ খেলতে না পারে- সে ব্যাপারেও সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা ছাড়াও তার পুত্রবধূ আইওএম কর্মকর্তা পেপ্পি সিদ্দিক এ সময় কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন।
এসময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, পূর্ত মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, হুইপ ইকবালুর রহিম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক ও র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, মন্ত্রী পরিষদ সচিব শফিউল আলম, মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীসহ কক্সবাজারের সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি, সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, আবু রেজা মোহাম্মদ নিজামউদ্দিন নদভী, সকালে প্রধানমন্ত্রীর সাথে উখিয়ায় উপস্থিত ছিলেন।
কক্সবাজার সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফর সঙ্গীসহ বিকাল ৪টা ৫০ মিনিটে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কক্সবাজার ত্যাগ করেন।

 
 
 

0 মতামত

আপনিই প্রথম এখানে মতামত দিতে পারেন.

 
 

আপনার মতামত দিন