রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলতে মিয়ানমারের আবেদন প্রত্যাখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের

 

myanmar_us_rohinga
মিয়ানমারে অবরুদ্ধ সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমরা বিশ্বব্যাপী রোহিঙ্গা মুসলিম হিসেবেই স্বীকৃত ও আখ্যায়িত হয়ে আসলেও নিজ দেশের সরকারের কাছে তাদের কোনো স্বীকৃতি নেই, অন্তত রোহিঙ্গা মুসলিম হিসেবে তো নয়ই। দক্ষিণপূর্ব এশীয় এই জাতিটিকে কী হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে, সে বিষয়ে মঙ্গলবার এক বৈঠকে কোনোভাবেই একমত হতে পারেনি মিয়ানমার ও যুক্তরাষ্ট্র।

বার্তা সংস্থা এপি এক খবরে জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের ভেতরে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের অধিকাংশই ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। মিয়ানমারের প্রায় ১০ লাখের কমবেশি রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলার পেছনে তাদের যুক্তি হলো- এদের অধিকাংশই অবৈধ অভিবাসী হিসেবে মিয়ানমারে রয়েছেন এবং তারা কোনো আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য নন। অথচ অধিকাংশ রোহিঙ্গা পরিবার নিয়ে মিয়ানমারে বসবাস করে আসছেন কয়েক প্রজন্ম ধরে।

এ প্রসঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্কট মার্শাল বলেছেন, বিভিন্ন সম্প্রদায় নিজেদের যে নামে পরিচিত করতে চায়, তাদের সে নামেই আখ্যায়িত করে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বাভাবিক চর্চা হলো এটা স্বীকার করে নেওয়া যে যে কোনো সম্প্রদায়ের নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ও অধিকার রয়েছে। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই এরকম ক্ষেত্রে তারা যেভাবে নিজেদের পরিচয় দেয়, আমরাও সেভাবেই তাদের আখ্যায়িত করি। এটা কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। এটা একটা সাধারণ চর্চা মাত্র।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কার্যত দেশপ্রধান অং সান সুচি ব্যক্তিগতভাবে রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার না করার অনুরোধ জানিয়েছেন কি না, এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলেও তার উত্তর দেননি মার্শাল।

মিয়ানমারে দীর্ঘদিনের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস লড়াইয়ের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা ও নোবেল শান্তি পুরষ্কার অর্জন করেছেন সুচি। কিন্তু গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গার পক্ষে কথা বলতে ব্যর্থ হওয়ায় তার প্রতি হতাশা বাড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ সত্ত্বেও এ বছর সুচি’র দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা মিয়ানমারের বিগত সেনা সমর্থিত সরকার রোহিঙ্গাদের সমস্যা নিরসনে কিছুই করেনি।

মঙ্গলবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আয় আয় সো স্বীকার করেছেন যে, মন্ত্রণালয়টি থেকে মার্শালকে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করার জন্য বলা হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের রাজনীতি বিভাগের উপ-মহাপরিচালক এই কর্মকর্তা বলেছেন, ‘মার্শাল এই সংখ্যালঘুদের নিজের পছন্দমতো যে কোনো নামেই ডাকতে পারেন। কিন্তু তাদের ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে আখ্যায়িত করলে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আগুন আরো উস্কে উঠতে পারে। যখন মার্শাল নেপিডোতে (মিয়ানমারের রাজধানী) এসেছিলেন, তখন তাকে আমরা ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার না করতে বলেছিলাম। কারণ এতে রাখাইনে যে সমস্যা চলছে, তা নিরসনের কোনো পথ নেই। বরং সমস্যার সমাধানের বদলে এতে পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করতে পারে। এতে রাখাইনে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করা আরো কঠিন হয়ে পড়বে।’

মিয়ানমারের রোহিঙ্গাসহ সমস্ত মুসলিমের বিরুদ্ধে ভুল ধারণা আরো উস্কে দিচ্ছে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অগ্রণী ভূমিকা থাকা একটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, যা দিন দিন দেশটির রাজনীতিতেও গেড়ে বসছে। গত মাসে মিয়ানমারের মার্কিন দূতাবাসের বাইরে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ডাকে কয়েকশ’ বিক্ষোভকারী ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়েছে।

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গাদের আদিবাসী হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয় না মিয়ানমার সরকার। বরং তাদের নাগরিকত্ব ও অন্যান্য মৌলিক অধিকারের ন্যূনতমও সরবরাহ করে না রাষ্ট্রটি। ভূমির অধিকার ও পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার নিয়ে অঞ্চলটিতে সহিংসতা লেগেই আছে। সেখানে বসবাসরত প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা সরকারের দমননীতির অংশ হিসেবে ভয়াবহ নির্যাতিত ও নিপীড়িত। অঞ্চলটিতে বৌদ্ধ ও মুসলিম সহিংসতা বড় আকার ধারণ করার পর ধীরে ধীরে তা দেশটির অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। লক্ষাধিক রোহিঙ্গা দাঙ্গার শিকার হয়ে বাড়িঘর ছেড়ে শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এনকে/এ

 
 
 

0 মতামত

আপনিই প্রথম এখানে মতামত দিতে পারেন.

 
 

আপনার মতামত দিন