সোনাদিয়ায়ই গভীর সমুদ্রবন্দর

 

তিন মন্ত্রীর সুস্পষ্ট ঘোষণায় স্বস্তি : বাস্তবায়ন চায় চট্টগ্রামবাসী : ব্যাপক বিনিয়োগে আগ্রহী চীন
শফিউল আলম : ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছে গভীর সমুদ্রবন্দর মেগাপ্রকল্পটি। অবশেষে প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই ও আগের পরিকল্পনা অনুসারে কক্সবাজারের মহেশখালীর উপদ্বীপ সোনাদিয়ায় স্থাপন করা হবে বহুল আলোচিত গভীর সমুদ্র বন্দর। আর নতুন করে কোনো যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিলে কিংবা এতে কারিগরি সুবিধা তুলনামূলক ভালো পাওয়া গেলে সেক্ষেত্রে সোনাদিয়ার অদূরে মহেশখালীর মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্র বন্দরটি হবে। তবে কোনো অবস্থাতেই দেশের তৃতীয় ও নতুন নির্মাণাধীন সমুদ্র বন্দর পটুয়াখালীর কলাপাড়ার পায়রায় ওই পরিকল্পনা নিয়ে আর বিবেচনা করা হবে না। পায়রা বন্দরের নৌ চলাচলের চ্যানেল গভীরতা, ¯্রােত-প্রকৃতি ইত্যাদি বিবেচনায় প্রাকৃতিকভাবে গভীর সমুদ্র বন্দরের জন্য উপযুক্ত নয়। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দরটি হবে চট্টগ্রাম বন্দরেরই বৃহৎ পরিপূরক। ভূ-প্রাকৃতিকভাবেই এটি আঞ্চলিক ‘হাব পোর্ট’ হিসেবে বিকশিত হয়ে গুরুত্ব লাভের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে আছে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এসব কথা জানা গেছে।
এদিকে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনের ব্যাপারে সরকারের চূড়ান্ত আগ্রহ ও সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গত ২৭ ও ২৮ এপ্রিল (বৃহস্পতি ও শুক্রবার) পৃথক দু’টি অনুষ্ঠানে দেয়া সর্বশেষ বক্তব্যে তিনজন মন্ত্রীর সুস্পষ্ট ঘোষণায় বৃহত্তর চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক মহলে ফের স্বস্তি ফিরে এসেছে। তারা এবার চান সরকারের ঘোষণার বাস্তবায়ন। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মিত হলে এ মেগাপ্রকল্পে কারিগরি সহায়তাসহ ব্যাপক বিনিয়োগের ব্যাপারে আগেই আগ্রহ ব্যক্ত করেছে চীন। তাছাড়া সমুদ্র বন্দর ব্যবহারেরও আশ্বাস দিয়েছে দেশটি।
চট্টগ্রামে গত ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় নগরীর পলোগ্রাউন্ডে বাণিজ্যমেলা সমাপনী অনুষ্ঠানে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়ামের সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, পটুয়াখালীর পায়রায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের চিন্তা-ভাবনা থেকে সরকার সরে এসেছে এমন তথ্য প্রকাশ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, এখন কক্সবাজারের সোনাদিয়াতেই গভীর সমুদ্র বন্দর হবে। একসময় চিন্তা ছিল পায়রা বন্দরে গভীর সমুদ্রবন্দর হবে। এখন দেখা গেছে, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে কোনো কিছু চলে না। তাই সেই চিন্তা এখন দূর হয়ে গেছে। এখন গভীর সমুদ্র বন্দর হবে সোনাদিয়ায়। মন্ত্রী মোশাররফ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সুবিধা অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। এখানে ড্রেজিং ছাড়াই ৯ মিটার ড্রাফট আছে। অথচ পায়রা বন্দরে ড্রেজিং করে যেতে হচ্ছে। পরদিন (২৮ এপ্রিল রাতে) চট্টগ্রাম বন্দরে আয়োজিত পোর্ট এক্সপো’র সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী হোক বা সোনাদিয়ায় হোক, গভীর সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম অঞ্চলেই হতে হবে। চট্টগ্রামে গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণার কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। চট্টগ্রাম বন্দরে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানও এ বিষয়ে পুনরায় আশ্বস্ত করে জানান, সোনাদিয়াতেই গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর মেগাপ্রকল্পের প্রাথমিক বাস্তবায়ন কাজ দুই বছর আগেই শুরু হয়। এর আগে প্যাসিফিক কনসাল্ট্যান্টস ইন্টারন্যাশনাল (জাপান) ২০০৮ সালে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের ব্যাপারে আর্থ-কারিগরি সমীক্ষা (টেকনো ইকনো স্টাডি) সম্পন্ন করে প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে সোনাদিয়াকেই সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থান হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু একটি অতি উৎসাহী মহলের চাপে হঠাৎ করে এ মেগাপ্রকল্পের জন্য নয়া বিবেচনায় সামনে চলে আসে পায়রা বন্দর। সোনাদিয়ার কাজও থমকে যায়। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ সরকারের ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত মেগাপ্রকল্প। ২০১৫ সালের জুনে চীনের অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দুই দেশের সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে সমঝোতা স্মারক সই হয়নি। এরপর থেকেই কার্যত এই প্রকল্প নিয়ে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। কক্সবাজার শহরের অদূরে মহেশখালী দ্বীপের সাথে লাগোয়া হচ্ছে সোনাদিয়া।
সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর মেগাপ্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীন অনেক আগে থেকেই আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার আগ্রহ দেখিয়ে সুনির্দিষ্ট আশ্বাসও দিয়ে আসছে। ইউনান প্রদেশসহ চীনের পশ্চিমাঞ্চলে পণ্যসামগ্রী শিপিং পরিবহন সুবিধা পেতে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের জন্য চীন গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু চীনা আগ্রহকে কাজে লাগানোর কোন উদ্যোগই এখন অবধি নেই। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতিতে গতিশীলতা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের বিশ্বায়নের জন্য সময়োপযোগী, অত্যাবশ্যক ও সম্ভাবনাময় এ প্রকল্পটি অনিশ্চিত অবস্থায় ঝুলে ছিল। তাছাড়া এরজন্য ভারতের কথিত ‘আগ্রহে’র দিকে তাকিয়ে শুধুই সময়ক্ষেপণ হয়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং যোগাযোগ ও বাণিজ্যে সময়ের প্রয়োজনে এক দশক পূর্বে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের সর্ববৃহৎ পরিপূরক হিসেবে কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনের লক্ষ্যে মেগা প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। এটি সরকারের অগ্রাধিকারমূলক মহাপ্রকল্পের বিবেচনায় রাখা হয়। এর জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের স্টিয়ারিং কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু ডীপ সী পোর্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার ও দাতাগোষ্ঠির অর্থায়নের দিকে অগ্রগতি ছিল না বলাই চলে। ৫টি ধাপে এই মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নে ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন বলে স্টিয়ারিং কমিটি ও বন্দর বিশেষজ্ঞরা প্রাক্কলন করেছিলেন। তখন তারা জোরালো অভিমত দেন, ব্যয় বা বিনিয়োগের তুলনায় বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক ও ভূকৌশলগত অবস্থানের কারণে গভীর সমুদ্রবন্দর হবে নিশ্চিত লাভজনক। এরজন্য প্রকৃতিই বাংলাদেশকে উদারভাবে সবকিছু দিয়েছে। যা এখন সুযোগ সময়মতো কাজে লাগানোর অপেক্ষা। বন্দর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চীনসহ বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার অর্থায়ন নিশ্চিত করতে শিগগিরই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ সরকারকে নিতে হবে।
সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মিত হলে প্রাথমিক অবস্থায় দেশি-বিদেশি আমদানি তথা বাংলাদেশসহ সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ সমুদ্রবন্দর ব্যবহারকারী দেশসমূহের প্রতিবছর এক কোটি টিইইউএস কন্টেইনারজাত ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্য হ্যান্ডলিং সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ের তুলনায় শিপিং খরচ কমবে প্রতি মেট্রিক টন ও কন্টেইনারে এক থেকে দেড় হাজার ডলার। এ গভীর সমুদ্র বন্দরের আঞ্চলিক চাহিদা বা উপযোগিতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। এর পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শুধুই নয়; অস্ট্রেলিয়া, হংকং, চীন, মালয়েলিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, থাইল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়া ও ইউরোপের অনেক অঞ্চল থেকে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল নামবে গভীর সমুদ্র বন্দরের কর্মকোলাহলকে কেন্দ্র করে। তবে গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনে ব্যত্যয় হলে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সুযোগ থেকে বাংলাদেশ ছিটকে পড়বে।
আর্থ-কারিগরি সমীক্ষায় (টেকনো ইকনো স্টাডি) বঙ্গোপসাগর কিনারের ৪টি স্থানের চেয়ে সোনাদিয়াই সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থান হিসেবে চূড়ান্ত হওয়ার পর নৌ পরিবহনমন্ত্রী, সচিব, এমপিসহ সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ মেগাপ্রকল্পস্থল সরেজমিন সফর করেন। বন ও পরিবেশ বিভাগ, পুলিশ-র‌্যাবসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার একাধিক দফায় অভিযানে সোনাদিয়ায় বেহাত হয়ে যাওয়া কয়েকশ’ একর ভূমি, সাগর মোহনার কিনারা বেদখলমুক্ত করে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং শিপিং বিভাগ (ডিজি শিপিং) কর্তৃক গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্পের জন্য মূল কমিটি গঠন এবং বন্দরের তহবিল থেকে প্রাথমিক অর্থায়ন প্রদানের প্রক্রিয়া আগেই সম্পন্ন করা হয়। এরপর অবশিষ্ট থাকে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ কাজ শুরু করা। তখনই মহলবিশেষের চিন্তা থেকে সামনে চলে আসে পায়রা। তবে এখন ফের সোনাদিয়ায় সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্বহাল হওয়ার পর আপাতত অনিশ্চয়তা কাটতে শুরু করেছে।

 
 
 

0 মতামত

আপনিই প্রথম এখানে মতামত দিতে পারেন.

 
 

আপনার মতামত দিন