স্বেচ্ছানির্বাসনের পর স্বেচ্ছামৃত্যু যেন না হয়

 

বিভুরঞ্জন সরকার

Khaleda-Zia-122

Bihu Ranjan Sarkerবিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাবেন না মর্মে একটি খবর ছাপা হয়েছে দৈনিক ইত্তেফাকে। খবরে বলা হয়েছে, এর আগে তিনি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেও যাননি। ৩ জানুয়ারি থেকে গুলশানে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবস্থান করছেন খালেদা জিয়া। দলের নেতাদের আশঙ্কা, শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কার্যালয় থেকে বেরুলেই তাঁকে আর সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

খবরটি ইত্তেফাকের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় এক কলাম হেডিংয়ে ছোট করে ছাপা হলেও খবরটির রাজনৈতিক তাৎপর্য ছোট নয়। বিএনপি দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল। দেশে তাদের বিপুল সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ী রয়েছেন। দলটির নেতারা দাবি করে থাকেন যে, তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। অনেক খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা বিএনপি করেন। খালেদা জিয়া তিন দশকের বেশি সময় ধরে এর নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তিনি নিজে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিলেও তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমান ছিলেন ‘মুক্তিযোদ্ধা’ এবং তিনিই বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জিয়াউর রহমান একাধিকবার লোক পাঠিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হেফাজত থেকে বেগম জিয়াকে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি পাকিস্তানিদের আতিথ্য ছেড়ে ফিরতে রাজি হননি।

তিনি নিজে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিলেও তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমান ছিলেন ‘মুক্তিযোদ্ধা’

মুক্তিযুদ্ধে সবাইকে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা পালন করতে হবে, তা অবশ্যই নয়। বিএনপির মতো একটি বড় দলের প্রধান নেত্রী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী না হলেও আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন– সেটা নিশ্চয়ই প্রত্যাশিত। স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে না গিয়ে তিনি কি সে প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবেন না? যেখানে এটি একটি জাতীয় রীতি বা রাষ্ট্রাচার হয়ে দাঁড়িয়েছে? রাজনৈতিক বৈরী সময়েও যার কোনো ব্যতিক্রম দেখা যায় না?

বেগম জিয়া তাঁর বাসায় না গিয়ে কেন গুলশান কার্যালয়ে ৩ জানুয়ারি থেকে অবস্থান করছেন, এটা কী ধরনের রাজনৈতিক কৌশল, সে সব কারও কাছেই খুব পরিষ্কার নয়। তাঁকে ঢাকায় সমাবেশ করতে না দেওয়ার প্রতিবাদে ৫ জানুয়ারি ওই কার্যালয়ে থেকেই তিনি ঘোষণা দিয়েছেন পরের দিন থেকে সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ পালনের। সে থেকে দেশে অবরোধ চলছে। তিনিও গুলশান কার্যালয় থেকে বের হচ্ছেন না। বলা হচ্ছে, ওই কার্যালয়ে বসেই তিনি তথাকথিত আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

অবরোধের ৭৮ তম দিন পর্যন্ত দেশে ১২৮ জন মানুষের মৃত্যু ছাড়া ‘আন্দোলন’ যে হচ্ছে সেটা কি অন্য কোনোভাবে বোঝার উপায় আছে? বেগম জিয়া যেমন গুলশান কার্যালয়ে বসে আছেন, তেমনি দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকরাও যার যার মতো ঘরে বসে আছেন। গ্রেপ্তার-আতঙ্কে যারা আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন তারাও তো কোনো না কোনো ঘরেই থাকছেন। মাঠে কেউ নেই। গোপন স্থান থেকে বিবৃতি দিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে টানা অবরোধের সঙ্গে সপ্তাহে ৫ দিন হরতাল পালনের ডাক দিচ্ছেন। এই ডাকে কেউ সাড়া দিচ্ছে কি দিচ্ছে না, তা নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বের মাথাব্যথা নেই।

গোড়া থেকেই আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াত নাশকতা চালাচ্ছে। রাতের অন্ধকারে বাস-ট্রাকসহ নানা ধরনের যানবাহনে চোরাগোপ্তা হামলা সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠছে। পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। ভয়ে, আতঙ্কে প্রথম কয়েক দিন রাজধানী ঢাকার বাইরে যান চলাচল কিছুটা বিঘ্নিত হলেও ধীরে ধীরে সারা দেশেই প্রায় স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসছে। খাওয়া-পরার গরজ আছে বলে খেটে খাওয়া ও কর্মজীবী ও চাকরিজীবীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হচ্ছে। বেগম জিয়া এবং তাঁর রাজনৈতিক অনুসারীদের খাওয়া-পড়ার সমস্যা নেই। তাই দলীয় কার্যালয়ে স্বেচ্ছাবন্দী থেকে দেশের মানুষের বিরুদ্ধে হরতাল-অবরোধ নামক নিপীড়ন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিতে তাঁর অসুবিধা হচ্ছে না– এমন কড়া মন্তব্য এখন অনেকের মুখেই শোনা যায়।

গোড়া থেকেই আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াত নাশকতা চালাচ্ছে

আড়াই মাসের বেশি সময় ধরে গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করে বেগম জিয়া বাড়তি কী রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করলেন যা তাঁর দলকে দেশের মানুষের কাছে অধিক জনপ্রিয় করে তুলতে সহায়ক হয়েছে? তিনি যদি বাসায় থেকে অবরোধ ও হরতাল আহ্বান করতেন তাহলে তাতে কী এমন গুণগত পরিবর্তন হত? তিনি অফিসে থাকায় মানুষ কি তাঁর প্রতি অধিক সহানুভূতিশীল হয়ে তাঁর ডাকে বেশি সাড়া দিয়েছে? মানুষ কি সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে? তিনি যদি দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে অবস্থান নিতেন, অনশন ধর্মঘট করতেন তাহলেও না হয় বিষয়টির অর্থ খুঁজে পাওয়া যেত। কর্মীদের ঘরে না ফেরার আহ্বান বেগম জিয়া এবং তারেক রহমান জানিয়েছিলেন। কিন্তু কর্মীরা তো ঘর থেকে বেরই হয়নি। তাহলে তাঁর বাসায় না ফেরার মাজেজা কী তা কেউ বুঝতে পারছে না।

অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণার পর একাধিক লেখায় বলেছি যে, এই আন্দোলনে বেগম জিয়ার জয়লাভের সম্ভাবনা নেই। আরও অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই এটা বলেছেন। কারণ আন্দোলনের নামে নিরপরাধ মানুষ মারার যে কর্মসূচি তিনি হাতে নিয়েছেন, সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন কোনো মানুষ তাঁর পক্ষে দাঁড়াতে পারে না। তাঁর বিরোধ সরকারের সঙ্গে। অথচ সরকারের কোনো মন্ত্রী, কর্মকর্তা অথবা সরকারি দলের কোনো শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী কর্মীদের আক্রোশ প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। তাদের যত ক্ষোভ সবই সাধারণ মানুষের ওপর। বাস-ট্রাকের ড্রাইভার-হেলপার, সাধারণ যাত্রী, ট্রাকের শ্রমিক এদের লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ কোনোভাবেই রাজনীতি হতে পারে না।

মানুষ হত্যা বর্বরতা। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে এটা মানা যায় না। ফলে এই কর্মসূচির সঙ্গে মানুষ নেই। আর জনবিচ্ছিন্ন কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি কোনোভাবেই সফল হতে পারে না। বিএনপিকে যারা ভোট দেন, তারাও নিশ্চয়ই সন্ত্রাস-নাশকতা সমর্থন করছেন না। সে জন্যই বেগম জিয়ার অবরোধ-হরতাল মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ ধরনের কর্মসূচির নিন্দা হচ্ছে ব্যাপকভাবে। অথচ তিনি নির্বিকার।

বেগম জিয়া ১৩ মার্চ অবরোধের ৬৭তম দিনে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে জাতির ৪৫ তম স্বাধীনতা দিবস পালন’ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতা দিবসেও জাতীয় স্মৃতিসৌধে না গিয়ে জাতির কাছে কোন বার্তা দিচ্ছেন তিনি? তাঁকে ছাড়াই কি জাতি ‘ঐক্যবদ্ধভাবে’ স্বাধীনতা দিবস পালন করবে? এর আগে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে যাননি তিনি। বাঙালি জাতির যা কিছু অহংকার ও গৌরবের, যা জাতিকে সামনে এগিয়ে চলার উৎসাহ-অনুপ্রেরণা জোগায়, সে দিনগুলো থেকে বেগম জিয়া নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখছেন কেন? এটা কি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ রাজনীতির ফল?

তাঁকে ছাড়াই কি জাতি ‘ঐক্যবদ্ধভাবে’ স্বাধীনতা দিবস পালন করবে

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন যে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে সংসদীয় রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছানির্বাসনে গিয়েছেন বেগম জিয়া। নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য ২০-দলীয় জোট দেশে চরম অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছিল। সহিংসতা চালিয়েও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ভণ্ডুল করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আন্দোলনও গুটিয়ে নিয়েছিলেন। এখন তিনি বলছেন, ৫ জানুয়ারির পর আন্দোলন থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। ভুল যে বেগম জিয়া করেছেন এটা তো ঠিক। এখন তাঁর এই ভুলের মাসুল দেশের সাধারণ মানুষকে কেন গুণতে হবে? ভুল শোধরানোর জন্য তিনি যে পথে হাঁটছেন, আন্দোলনের নামে যেভাবে জঙ্গিবাদী কার্যক্রম চালাতে দলীয় কর্মীদের প্ররোচিত করছেন, তা কি তাঁকে আরও একটি ভুলের দিকেই সজোরে ঠেলে দিচ্ছে না?

কেউ কেউ বলে থাকেন, বেগম জিয়া নাকি ফেরার পথ পাচ্ছেন না। ১৩ মার্চের সংবাদ সম্মেলনেও তিনি ‘যৌক্তিক পরিণতি’তে না পৌঁছানো পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং ‘কষ্ট স্বীকার করে হলেও বৃহত্তর স্বার্থে’ এই কর্মসূচিতে সক্রিয় হওয়ার জন্য নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কার্যত তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে, তাঁর দলের নেতা-কর্মীরা সক্রিয় নয় এবং তারা কষ্ট স্বীকার করতেও রাজি নয়। অন্যদিকে ‘যৌক্তিক পরিণতি’ বলতে তিনি কী বুঝিয়েছেন সেটাও অনেকের কাছে স্পষ্ট হয়নি। তাঁর কাছে কোনটা যৌক্তিক পরিণতি? সরকারের পতন, সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে নির্বাচন নাকি বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া অথবা একটি সংলাপের আয়োজন?

সরকারের পতন ঘটানো যে এখন বেগম জিয়ার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়, এটা নিশ্চয়ই তিনি বুঝতে পারছেন। সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে নির্বাচনের সম্ভাবনাও কম। কারণ আমাদের দেশ রাজনৈতিকভাবে এতটাই বিভক্ত যে এখন সকলের কাছে ‘গ্রহণযোগ্য’ লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন। অন্যদিকে, বিএনপি সহিংসতা না ছাড়লে, অবরোধ-হরতাল প্রত্যাহার না করলে তাদের সঙ্গে সংলাপ বা আলোচনা যে সম্ভব নয়, এটাও সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি যে ফাঁদে আটকা পড়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসার একটা মোক্ষম উপায় তাদের সামনে এসেছে। সহিংসতা থেকে নিয়মতান্ত্রিক ধারায় সরে আসার একটি ‘একসজিট পয়েন্ট’ হচ্ছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ। আন্দোলনের অংশ হিসেবেই সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বিএনপি যদি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাহলে একটি সম্মানজনক পরিণতির দিকে যেতে পারবে দলটি।

যদি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাহলে একটি সম্মানজনক পরিণতির দিকে যেতে পারবে দলটি

বিএনপির যারা সমর্থক, শুভাকাঙ্ক্ষী ও দরদি তারা বিষয়টি বুঝতে পারছেন এবং সে জন্য তারা চাইছেন বিএনপি নির্বাচন করুক। কিন্তু লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই; নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা ইত্যাদি অজুহাত তুলে এবং নিরাপদে লন্ডনে বসবাসকারী তারেক রহমানের প্ররোচনায় বিএনপি যদি সিটি করপেরেশন নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণ না করে, তাহলে দলটি যে পরিণতির দিকে যাবে তা নেতা-কর্মী-সমর্থকদের হতাশ করবে।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নিয়ে সংসদীয় রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছানির্বাচনে গিয়েছিল বিএনপি। আসন্ন তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ না নিলে দলটি রাজনৈতিকভাবে স্বেচ্ছামৃত্যুর দিকে ধাবিত হবে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।

বিভুরঞ্জন সরকার: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 
 
 

0 মতামত

আপনিই প্রথম এখানে মতামত দিতে পারেন.

 
 

আপনার মতামত দিন