অপসাংবাদিকতা রুখতে নৈতিকতা না আইন, কোনটি জরুরি?

আমি দশজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাদের মধ্যে যারা কোনো সংবাদের কারণে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত ভাবেন, তারা বললেন, আইন। বাকিরা কিন্তু নৈতিকতাকেই তুলে ধরেছিলেন।

১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক আদালতে আলোচিত এক মামলার নিষ্পত্তি হয়। নিউইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে মামলাটি ঠুকে দেন আলবামা রাজ্যের মন্টগোমারির তিন কমিশনারের একজন সুলিভান। তার অভিযোগ, পত্রিকাটি তাদের পাতায় এমন একটি বিজ্ঞাপন ছাপিয়েছে, যাতে তার মানহানি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

পূর্ণ পাতার ঐ বিজ্ঞাপনটি মূলত ছিল দক্ষিণে নাগরিক অধিকার আন্দোলনকারীদের পক্ষে। সেখানে বলা হয়েছে যে, আন্দোলনকারীদের দমন-পীড়ন করা হয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ হন সুলিভান। তার বক্তব্য হলো যে, সেখানকার প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

মামলার খবরে বিস্ময় প্রকাশ করে নিউইয়র্ক টাইমস। তারা বলে যে, ঐ বিজ্ঞাপনের কোথাও সুলিভানের নাম পর্যন্ত নেই। তাহলে তিনি কেন নিজের ওপর নিচ্ছেন? এ বিষয়ে তারা কোনো সংশোধনী প্রকাশ করতেও অপারগতা জানায়।

নিউইয়র্কের আদালত দু’পক্ষের শুনানি শেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, যে বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ করা হয়েছে, তার পেছনে পরিষ্কার অভিসন্ধি ছিল পত্রিকাটির। এর কিছু অংশে মিথ্যাচার করা হয়েছে বলেও মনে করেছে আদালত। তাই মামলাকারীর পক্ষে রায় দেয়া হয়। রায়ে বাদীর পক্ষে ৫ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হয়।

এই রায়টি খুব আলোচিত হয়। রায়ের পক্ষে-বিপক্ষে এখনো যুক্তিতর্ক চলে। তবে আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, সেটি অনেক জায়গাতেই রেফারেন্স হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোনো গণমাধ্যম যদি কোনো মিথ্যা তথ্য পরিষ্কার কোনো অভিসন্ধি থেকে প্রকাশ করে, এবং এতে যদি কারও মানহানি হয়েছে বলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি মনে করেন, তাহলে তিনি মামলা করতে পারেন।

কারণ, বেশিরভাগ দেশে যেমন- সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বা বাকস্বাধীনতার পক্ষে আইন আছে, তেমনি একজন নাগরিকেরও নিজস্ব সম্মান ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বজায় রাখার অধিকার আছে।

এই রায় এবং পরবর্তীতে অনেক রায়েই যে বিষয়টি বারবার আলোচিত হয়েছে, তা হলো, সংবাদ প্রকাশের নৈতিকতা এবং রাষ্ট্র ও ব্যক্তির স্বাধীনতা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোপনীয়তা বজায় রাখতে রাষ্ট্র কর্তৃক আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা।

দু’টি বিষয়কে অনেক ক্ষেত্রেই ‘অজান্তে বা জেনে শুনে’ গুলিয়ে ফেলা হয়। ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের আইনি সুরক্ষার নামে সংবাদ মাধ্যম বা বাক স্বাধীনতার ওপর অবাধ হস্তক্ষেপের উদাহরণ বিশ্বজুড়ে আছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

শুরু থেকে আজ পর্যন্ত গণমাধ্যম জনগণের স্বার্থ সুরক্ষা, সুশাসন ও গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে ভুমিকা রেখেছে এবং এখনো রেখে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে এর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপকে বড় রকমের প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ বলেও মনে করা হয়। তবে একইসঙ্গে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীলতার পরিচয়ও দিতে হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সংবাদমাধ্যমকে ব্যাপকভাবে প্রপাগান্ডার মেশিন হিসেবে ব্যবহার করার পর ‘টাইম’ ও ‘লাইফ’ ম্যাগাজিনের প্রকাশক হেনরি লুস একটি গণতান্ত্রিক দেশে মিডিয়ার ভুমিকা কী হওয়া উচিত তা ঠিক করতে একটি কমিশন গঠন করার জন্য শিকাগো ইউনিভার্সিটির প্রেডিডেন্ট রবার্ট হাচিন্সকে অনুরোধ করেন।

প্রচণ্ড সমালোচনার মুখেও ১২জন বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে কমিশনটি গঠন করেন, যেখানে কোনো সাংবাদিক ছিলেন না। এই কমিশন পরিচিত ‘হাচিন্স কমিশন’ নামে। ১৯৪৭ সালে সেই কমিশন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, সমাজ গঠনে গণমাধ্যমের ভুমিকা অনস্বীকার্য৷ তাই সংবাদ মাধ্যমকেও ‘সামাজিক দায়িত্ব’ নিয়ে কাজ করতে হবে।

কমিশন তিনটি ভাগে তাদের সুপারিশ দেয়। প্রথমত, সরকারের কী দায়িত্ব হবে? কমিশন মনে করে যে, সমাজকেই দায়িত্ব নিতে হবে। গণমাধ্যমকে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে দিতে হবে। তবে কোনো গণমাধ্যম যদি তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সরকার বা আইন তাদের ব্যবস্থা নেবে, যদিও একে সর্বশেষ ধাপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, তারা বলছে, গণমাধ্যম যদি নিজেরাই নিজেদের দায়িত্ব নেয়, তাহলে সরকারকে যতটুকু ভুমিকা রাখার কথা বলা হয়েছে, সেই সুযোগ আরো কমে যায়। সেক্ষেত্রে নিজেদের সমালোচনা নিজেরাই করে এক ধরনের সুস্থ সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব নিতে হবে।

তৃতীয়ত, তারা জনগণকেও দায়িত্ব নেয়ার সুপারিশ করেছেন। তারা বলেন, জনগণ পত্রিকা কিনবেন। তাই তাদের হাতেই ক্ষমতা কাকে তারা গ্রহণ করবেন বা কাকে বর্জন করবেন। তাই তারাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

পরবর্তীতে অনেক তাত্ত্বিকই এই সুপারিশ গ্রহণ করেছেন। তারা বলেছেন, যদিও যুগ যুগ ধরে ‘কোড অব এথিক্স’ আছে গণমাধ্যমের, তারপরও কমিশনের সুপারিশগুলো খুবই প্রয়োজনীয়। তবে এর সমালোচকরা বলেছেন, যে সামাজিক দায়িত্বশীলতার কথা বলা হয়েছে, এর অর্থ এক ধরনের দায়বদ্ধতা, দায়বদ্ধতা যতটা জনগণের প্রতি তার চেয়েও বেশি রাষ্ট্রের প্রতি। আর রাষ্ট্রের প্রতি যে দায়বদ্ধতা, তা পালিত না হলে আইনের খড়গ নেমে আসবে।

এত দশক আগে যেসব বিতর্ক বা আলোচনার সমাধান খোঁজা হয়েছে, এখনো কি সেই সমাধান পাওয়া গেছে? যদি তাই হতো, এখনও সংবাদ মাধ্যম কী প্রকাশ করতে পারবে বা কী পারবে না, সেসব নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই। তাই আজও সাংবাদিকতার পাঠে মিডিয়া এথিক্স বা নৈতিকতা ও মিডিয়া ল’ বা আইন খুব গুরুত্বের সাথে রাখা হয়।

তবে তাই বলে যে, বিষয়গুলো এখনো একই তিমিরে রয়ে গেছে, তা নয়। অনেক বদলেছে। সংবাদ প্রচারের মাধ্যম প্রসারিত হয়েছে। সেই সঙ্গে আইন বদলেছে। সাংবাদিকতার প্র্যাকটিস বদলেছে। তাই অনেক সমস্যার ধরণও বদলেছে। তাই এই বিবাদ একটি চলমান প্রক্রিয়া।

কিন্তু বাংলাদেশের দিকে তাকালে বৈশ্বিক সাংবাদিকতার যে মান, সেখানে এখনো যেতে সময় লাগবে। একটি ছোট উদাহরণ দিই। খুব দূরে নয়, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইন। সেখানকার রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশ থেকে উন্নত নয়। তবে সেখানে বড় বড় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে একটি আলাদা বিভাগ চালু আছে। সেটি হলো, এথিক্স ডিপার্টমেন্ট।

প্রতিষ্ঠানটির খবর সংগ্রহ থেকে ছাপানো পর্যন্ত একটি এথিকাল গাইডলাইন আছে। সংবাদকর্মীদের জন্য আলাদা গাইডলাইন আছে। সেই গাইডলাইন কেউ ভঙ্গ করছেন কি না তা দেখার জন্য এই ডিপার্টমেন্ট, যার প্রধান সরাসরি প্রধান সম্পাদকের কাছে দায়বদ্ধ।

বাংলাদেশে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলেই এমন করতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে বিভাগ তো দূরের কথা, কোনো এথিকাল গাইডলাইনই নেই। হয়তো অচিরেই কেউ চিন্তা করবেন এমন কিছুর। সেই প্রত্যাশা থাকলো।

তবে কোনোভাবেই আইন দিয়ে সাংবাদিকতা বা বাকস্বাধীনতা রুখে দেয়া মেনে নেয়া যাবে না। কারণ, এখনকার বিশ্বে সংবাদ প্রকাশের ধরন অনেক পাল্টেছে। উইকিলিক্স থেকে পানামা পেপার্স– এগুলোই উদাহরণ। সাংবাদিকতার গণ্ডি আর দেশে সীমাবদ্ধ নেই। এখন কোলাবোরেশনের যুগ৷ সেই সুযোগ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত৷

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।