আত্মসমর্পণকারী ১০২ ইয়াবা ব্যবসায়ীর অঢেল সম্পত্তির খোঁজে গোয়েন্দারা

সমকাল :
আত্মসমর্পণের পর কারাগারে রয়েছেন কক্সবাজারের ১০২ ইয়াবা কারবারি; কিন্তু তারা বাইরে রেখে গেছেন সম্পদের পাহাড়। এরই মধ্যে তার সত্যতা পেয়েছেন গোয়েন্দারা। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এই অবৈধ গোপন সম্পদের খোঁজে মাঠে নেমেছে বিভিন্ন সংস্থা। প্রথম দফায় আত্মসমর্পণকারী এসব ইয়াবা কারবারির সম্পদ অনুসন্ধানে পুলিশের পক্ষ থেকে চারটি গোয়েন্দা সংস্থাকে চিঠি দিয়ে সহায়তা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শুরু হয়েছে মাদক ব্যবসায়ীদের দ্বিতীয় দফায় আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া। চলতি মাসের শেষের দিকে বা আগামী মাসের শুরুতে এ আত্মসমর্পণ পর্বের আনুষ্ঠানিকতা হতে পারে।
এরই মধ্যে পুলিশের বিশেষ শাখা অনুসন্ধান চালিয়ে গ্রেফতার ইয়াবা কারবারিদের গোপন সম্পদ-সংক্রান্ত তথ্য পেয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের পক্ষ থেকে সহায়তার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাইন্যান্স ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও সিআইডির ইকোনমিক ক্রাইম ইউনিটে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও করেছে পুলিশ।

আত্মসমর্পণের শর্ত অনুযায়ী কারাগারে থাকা এসব মাদক ব্যবসায়ীকে আইনি সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে নতুন করে কয়েকজন শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণের জন্য পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারে ১০২ ইয়াবা ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণ করে। তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। শর্ত অনুযায়ী তাদের সম্পদের অনুসন্ধান করা হয়েছে। সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে এসব মাদক ব্যবসায়ীর নামে ও বেনামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের খোঁজ নিয়ে সত্যতা মিলেছে। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তরেও জানানো হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন সমকালকে জানান, তারা মাদক ব্যবসায়ীদের গোপন সম্পদের অনুসন্ধান চালাতে দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিআইডির সংশ্নিষ্ট শাখায় চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানিয়েছেন। এরই মধ্যে মাদক ব্যবসায়ী, তাদের পরিবার ও স্বজনদের সম্পদের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, আত্মসমর্পণের সময় ১০২ মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দুটি করে মামলা হয়েছিল। শর্ত অনুযায়ী এসব মামলায় তাদের আইনি সহায়তা দেওয়া হবে। এ জন্য এসপি কার্যালয় থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, আত্মসমর্পণ করা মাদক ব্যবসায়ীরা এ ব্যবসা করে প্রচুর ধনসম্পদের মালিক হয়েছে। তাই স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি যাচাই করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

সূত্র জানায়, ফেব্রুয়ারিতে আত্মসমর্পণ করা মাদক ব্যবসায়ীদের নামে-বেনামে অঢেল সম্পত্তি রয়েছে। কারও নিজের নামে বা পরিবারের নামে মার্কেট রয়েছে। কারও কক্সবাজার, টেকনাফ এমনকি ঢাকায়ও বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি রয়েছে। কারও জমি এবং ব্যাংকে নামে-বেনামে বড় অঙ্কের টাকা রয়েছে। এ জন্য মাদক ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি তাদের আত্মীয়-স্বজনের সম্পদেরও তথ্য যাচাই করতে গোয়েন্দারা মাঠে নামছেন। নিজেদের পেশা, আয়ের উৎস এবং জীবনমানের সঙ্গে এসব সম্পদের সঙ্গতি না থাকলে আইন অনুযায়ী বাজেয়াপ্ত করা হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, আত্মসমর্পণ করা মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা থাকলে তা নিজেদেরই মোকাবেলা করতে হবে। শুধু আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় দায়ের মামলার ক্ষেত্রে সরকার আইনি সহায়তা দেবে। এ জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সিদ্ধান্ত চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

কক্সবাজার পুলিশ জানায়, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আত্মসমর্পণকারী মাদক ব্যবসায়ীরা কারামুক্ত হলে প্রত্যেক এলাকায় তাদের সমন্বয়ে মাদকবিরোধী কমিটি করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। টেকনাফের পাঁচটি ইউনিয়ন ছাড়াও উপজেলা মিলে মোট ছয়টি মাদকবিরোধী কমিটি হবে। এসব কমিটিতে ২০ জন করে সদস্য থাকবেন।

দ্বিতীয় দফায় আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া :প্রথম দফায় আত্মসমর্পণের পর দ্বিতীয় দফার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এ পর্যায়ে কতজন ইয়াবা ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণ করবে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণের জন্য পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। অনেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করছে। পুলিশও তালিকা ধরে বিভিন্ন মাধ্যমে আত্মগোপনে থাকা ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণের জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছে।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, দ্বিতীয় দফায় আত্মসমর্পণ করবে- এ পর্যন্ত এমন পাঁচ থেকে ছয় মাদক ব্যবসায়ীকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রেজওয়ান ও নুরুল হক ভুট্টো নামে দুই মাদক ব্যবসায়ীর নাম জানা গেছে। প্রথম দফায় ভুট্টোর ভাই একরাম হোসেন আত্মসমর্পণ করেছিল। টেকনাফের ইয়াবাপল্লী হিসেবে চিহ্নিত নাজিরাপাড়া এলাকার বাসিন্দা ভুট্টোর পরিবারও অঢেল সম্পত্তির মালিক। স্থানীয় মৌলভীপাড়া এলাকায় তাদের নিজস্ব মার্কেট থাকার পাশাপাশি শহরে দুটি বিলাসবহুল বাড়িও রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার বলেন, তারা মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে আসছেন। কেউ যদি আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে, তাদের স্বাগত জানানো হবে। এ জন্য পুলিশের দরজা খোলা রয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ

৫ thoughts on “আত্মসমর্পণকারী ১০২ ইয়াবা ব্যবসায়ীর অঢেল সম্পত্তির খোঁজে গোয়েন্দারা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।