‘আমরা যদি ভালো কিছু করতে চাই, সেটা অবশ্যই সম্ভব’

’সুশাসনে গড়ি সোনার বাংলা’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসনকে জনবান্ধব করার প্রত্যয়ে গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদান করেন উম্মে সালমা তানজিয়া। গত ৫ ডিসেম্বর ফরিদপুরে যোগদানের এক বছরের কিছু বেশি সময় পর তিনি নাগরিক সেবায় ‘দেশ সেরা’ জেলা প্রশাসক নির্বাচিত হয়েছেন।

‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’ পুরস্কার প্রদানের জন্য আইসিটি’র মাধ্যমে নাগরিক সেবায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়াকে ‘দেশ সেরা জেলা প্রশাসক’ (নাগরিক সেবা) নির্বাচন করা হয়। এর আগে ফরিদপুরে যোগদানের ঠিক এক বছরের মাথায় তিনি ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের ‘শ্রেষ্ঠ জেলা প্রশাসক-২০১৭’ হিসেবে স্বীকৃতি পান। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তাকে এই সম্মাননা দেয়া হয়েছিল।

উম্মে সালমা তানজিয়া রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তিনি ১৯৯৮ সালে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে সহকারী কমিশনার হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় যোগদান করেন। এরপর তিনি বিভিন্ন জেলায় সহকারী কমিশনার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উম্মে সালমা তানজিয়া সিরাজগঞ্জে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালের মার্চে তিনি উপসচিব হিসেবে পদোন্নতি পান। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক্সেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন তিনি। সর্বশেষ উম্মে সালমা তানজিয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদানের পর গত এক বছরে প্রশাসনকে জনবান্ধব করার লক্ষ্যে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেন উম্মে সালমা তানজিয়া। জেলা ই-সেবা কেন্দ্র, ইউডিসি, হেল্প ডেস্ক, জয়িতা অঙ্গন, ডিজিটাল হাজিরাসহ নানা ধরনের জনসেবামূলক কর্মসূচি চালু ও সেবার মান উন্নয়নসহ প্রশাসনকে গতিশীল করার উদ্যোগ নেন তিনি। ছাত্র-ছাত্রীদের আধুনিক ও নৈতিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকদের সমন্বয়ে নানামুখী কর্মসূচিও গ্রহণ করেন উম্মে সালমা তানজিয়া। তিনি জেলার ২৫০টিরও বেশি স্কুল-কলেজে এ পর্যন্ত মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম প্রতিষ্ঠা করেছেন।

নাগরিক সেবায় ‘দেশ সেরা জেলা প্রশাসক’ উম্মে সালমা তানজিয়ার সমকালকে দেয়া সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তার সাফল্যের নেপথ্যের কথকতা। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ফরিদপুরে সমকালের নিজস্ব প্রতিবেদক হাসানউজ্জামান।

সমকাল: নাগরিক সেবায় দেশ সেরা জেলা প্রশাসক হিসেবে আপনার প্রত্যয় জানতে চাই…

উম্মে সালমা তানজিয়া: এসডিজি বাস্তবায়নে সরকার ঘোষিত ভিশন-২০২১ ও ভিশন-২০৪১ সফল করার লক্ষ্যে গুণগত জনসেবা ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে আমরা বদ্ধপরিকর। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে সকল নাগরিককে ই-সেবার আওতায় আনার জন্য টিম ফরিদপুর নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে।

ফরিদপুর জেলার উন্নয়নের স্বার্থে সততা, স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতার সাথে কাজ করে যাব। ফরিদপুর জেলার ঐতিহ্যকে ধারণ করে বাংলাদেশের প্রথম সারির জেলায় রূপান্তরের চেষ্টা করব। ফরিদপুর জেলা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে নিয়ে একটি টিম হিসেবে এ কাজ করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে ই-নথি কার্যক্রমে ফরিদপুর জেলা সারা দেশের মধ্যে টানা কয়েক মাস প্রথম স্থানে রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে ফরিদপুর জেলা যেন অগ্রণী ভূমিকা রাখে, সে লক্ষ্যে আমার সার্বিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। মহান আল্লাহ আমাদের সুযোগ দিয়েছেন জনগণের সেবা করার, সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ফরিদপুরকে আরও অধিকতর সেবামূলক ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য জেলা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আধুনিক ফরিদপুরের রূপকার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন মহোদয়ের সার্বিক নির্দেশনা—আমাদের এ চলার পথকে সুগম ও মসৃণ করেছে।

সমকাল: এই অর্জনকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

উম্মে সালমা তানজিয়া: এটা আসলে আমার ব্যক্তিগত কোন অর্জন নয়। এ অর্জনটা হচ্ছে—জেলা প্রশাসকের, জেলা প্রশাসন ফরিদপুরের। প্রকৃতপক্ষে এ অর্জনটা হচ্ছে—টিম ফরিদপুরের। এর সঙ্গে শুধু প্রশাসনের লোকজনই জড়িত তা নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে নাগরিক সেবা, যা একটা বড় বিষয়। সামগ্রিক বিষয়ে জনগণের কাছে যে সেবাগুলো আমরা পৌঁছে দিচ্ছি সেই বিবেচনায় ৬৪টি জেলার মধ্যে আমরা প্রথম হয়েছি এবং জেলা প্রশাসকের নামটি সেখানে উঠে এসেছে। এজন্য আমি ধন্যবাদ দিতে চাই সবচেয়ে জুনিয়ার স্টাফটি থেকে শুরু করে এডিসি পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের সকলকে। তারা রাত-দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে জেলা প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে উজ্জল করেছেন। এ ছাড়াও আমার আরেকটি সম্প্রসারিত পরিবার রয়েছে—এই জেলার সকল সাংবাদিক, সকল মানুষ সেই পরিবারের অন্তর্গত। তারা সকলেই টিম ফরিদপুরের পাশে থেকেছেন। আমি আজ পর্যন্ত কাজ করতে গিয়ে কোথাও কোনো বাধার সম্মুখীন হইনি এবং আমি আজ পর্যন্ত সাহায্য চেয়ে পাইনি সেরকমটি কখনও ঘটেনি। আমি ফরিদপুরবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। প্রত্যাশা করছি—তারা টিম ফরিদপুরের পাশে এভাবেই থাকবেন আগামীতে, যাতে প্রতিবছর আমরা এমন কিছু অর্জন করতে পারি।

সমকাল: আজকের এই সাফল্যে পৌঁছাতে নারী হিসেবে আপনি কি কোনো চ্যালেঞ্জ অথবা অন্য কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন?

উম্মে সালমা তানজিয়া: না, একেবারেই না। নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে ফরিদপুরে আমি কোনো প্রতিকূলতার মুখোমুখি হইনি এখনও। তবে নাগরিক সেবায় জেলা প্রশাসক হিসেবে আমাকে যে পুরস্কারটি দেয়া হয়েছে, সেখানে নিশ্চয়ই অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রথম চ্যালেঞ্জটা ছিল যাদেরকে নিয়ে কাজ করব, তাদেরকে খুঁজে বের করা, তাদেরকে জানা ও বোঝা। আমি প্রথম চ্যালেঞ্জ এটাই নিয়েছিলাম যে আমি যাদেরকে দিয়ে কাজটি করাতে চাচ্ছি তাদের কতটুকু কমিটমেন্ট আছে। তারা প্রথমে ভয় পেত, কিন্তু তারা ঠিকই আমাদের ৫৯ নম্বর থেকে এক নম্বরে এনে দিয়েছে। এটা সম্ভব করা যায়, এই বিশ্বাসটা তাদের ছিল না। আমরা এক হলে যে অসম্ভবকে সম্ভব করতে করতে পারি, এটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সমকাল: এ ধরনের সাফল্যের জন্য কী প্রয়োজন বলে মনে করেন?

উম্মে সালমা তানজিয়া: প্রথম প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস ও কমিটমেন্ট। আপনি কেন এখানে, আপনি নাগরিক সেবা দেয়ার জন্য এখানে। আপনি যদি এখানে ব্যর্থ হন তবে ডিসি হিসেবে আপনি ব্যর্থ। সুতরাং প্রথম কথা হচ্ছে, আমার কাজটি কী সেটা আমাকে বুঝতে হবে। এটা করার জন্য যা যা করার দরকার তা আমাকে করতে হবে, সাপোর্ট আপনাকে নিয়ে আসতে হবে, এমনি এমনি সাপোর্ট আপনাকে কেউ দিবে না। আপনার সদিচ্ছা দিয়ে এটা আদায় করতে হবে। যেমন: ফরিদপুরের মিডিয়া আমাকে সবসময় সাপোর্ট দেয়। কারণ তারা দেখেছে, অত্যন্ত সততার সাথে আমরা কাজ করছি। যদি আমরা বিশ্বাস করি, আমরা যদি ভালো কিছু করতে চাই, তবে সেটা অবশ্যই সম্ভব। সেজন্য কারো হয়তো একটু বেশি সময় লাগবে, কারো হয়তো একটু কম, তবে সেটা সম্ভব—যদি আমি চাই।
সূত্র : সমকাল

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।