ইয়াবা কারবারিদের নিরাপদ আস্তানা রোহিঙ্গা ক্যাম্প!

আইনশৃংখলা বাহিনীর জোরালো অভিযানের মুখে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে নিরাপদ আস্তানা হিসাবে বেছে নিয়েছে ইয়াবা কারবারিরা। দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে রোহিঙ্গাদের ইয়াবা বহনে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পার হয়ে ক্যাম্পে এনে মজুদ করা, আবার সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করতে এসব রোহিঙ্গাদের টার্গেট করা হচ্ছে। সম্প্রতি, ইয়াবা বহনের সময় কয়েকটি ইয়াবার চালান আটক, ইয়াবা বিরোধ নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হত্যাকাণ্ড এবং আইনশৃংখলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে রোহিঙ্গা নিহত হওয়ার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ। এ কারণে খুব শিগগিরই সম্ভাব্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বড় ধরণের অভিযানের কথা ভাবছে পুলিশ।

আইনশৃংখলা বাহিনীর একাধিক সূত্র মতে, গত এক মাসে ইয়াবা কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকায় পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১১ জন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইয়াবা বিরোধ নিয়ে ৫ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। এছাড়াও প্রতিনিয়ত ইয়াবার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে। ইয়াবা বহন করে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আসার পথে ২১জন ও ক্যাম্পের আশপাশের এলাকা থেকে ৩৬ জনকে আটক করেছে আইন শৃংখলা বাহিনী। সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ কক্সবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ১৩ রোহিঙ্গাকে আটক করে। তাদের প্রত্যেকের পেট থেকে ৪৩ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। মিয়ানমার থেকে এসব রোহিঙ্গারা বিশেষ কৌশলে ইয়াবা খেয়ে পেটে বহন করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আসছিল। গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলছে। রোহিঙ্গাদের আসার পর থেকে চলতি মাসের ৬ এপ্রিল পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নানা অপরাধে উখিয়া, টেকনাফ, রামু ও কক্সবাজার সদর থানায় ৩১০টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৬৪৬ জন রোহিঙ্গাকে।

জানতে চাইলে কক্সবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারি পরিচালক সোমেন মন্ডল বলেন,‘সম্প্রতি বেশ কিছু ইয়াবার চালান ক্যাম্পের আশপাশের এলাকা থেকে উদ্ধার করেছি। ইয়াবা বহনকারীদের বেশিরভাগ রোহিঙ্গা তরুণ-তরুণী। ৩০ মার্চ ১৩ রোহিঙ্গাকে আটক করেছি তাদের প্রত্যেকের পেটে ইয়াবা ছিল। তারা মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আসছিল। আটকের পর তাদের পায়ুপথ থেকে একে একে ৪৩ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ কারণে ধারণা করা যায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে ইয়াবা কারবারিরা নিরাপদ স্থান হিসাবে বেছে নিয়েছে। আমাদের ইচ্ছা থাকলেও ক্যাম্পে অভিযানে যেতে পারি না। কারণ, বিশাল এই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অভিযান চালানো কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্য ছাড়া ক্যাম্প অভিযানে গেলে রোহিঙ্গাদের রোষাণলে পড়ার ভয় রয়েছে। আবার আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ক্যাম্পের যাওয়ার আগে খবর ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ইয়াবা বিরোধী অভিযান বিফলে যাচ্ছে।’

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন বলেন,‘রোহিঙ্গা ক্যাম্প ইয়াবা কারবারিদের নিরাপদ আস্তানা বলা যাবে না। তবে কিছু দুষ্ঠুচক্র রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নানা অপরাধের পাশাপাশি ইয়াবার কারবার বেছে নিয়েছে। সম্প্রতি ইয়াবা কারবারিরা রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান আনছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে আনা ইয়াবা দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছে। এসব কিছু বিবেচনা করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খুব শিগগিরই আমরা বড় ধরণে অভিযানের পরিকল্পনা করছি।’

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার পর থেকে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের সব রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই মাদকের ছড়াছড়ি। হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবা, গাঁজা ও যৌন উত্তেজক বিভিন্ন টনিক। ইয়াবা সেবন ও পাচার কর্মে জড়িয়ে পড়েছে কিশোর-কিশোরি এবং রোহিঙ্গা তরুণ-তরুণীরা। ইয়াবার বড় বড় চালান নিয়ে ধরাও পড়ছে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। তাদের সঙ্গে প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে স্থানীয় উঠতি বয়সী তরুণরা। ইয়াবা সেবীদের দৌরাত্মে ক্যাম্পের সাধারণ আশ্রিতরা এখন বীতশ্রদ্ধ। ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকাগুলোতে বেড়েছে চুরি-ডাকাতির ঘটনা। মাদক সেবনের টাকা জোগাড় করতে রোহিঙ্গা তরুণরা মরিয়া হয়ে চুরি-ডাকাতির মতো ঘৃণ্য অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। ক্যাম্পগুলোতে নিয়মিত র‌্যাব ও পুলিশের অভিযান চললেও বিশাল এই রোহিঙ্গা গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণে বিপাকে পড়েছে বাহিনীর সদস্যরা।

সূত্র জানায়, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে একটি ইয়াবা চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্তত সহস্রাধিক রোহিঙ্গা। তাদের সঙ্গে মিয়ানমারের রাখাইন সম্প্রদায়ের যোগাযোগ রয়েছে। মিয়ানমার থেকে রাতের আঁধারে ইয়াবা ও মাদকের চালান সীমান্তের কাঁটাতারের পার্শ্বে বয়ে নিয়ে আসে সিন্ডিকেটের সদস্যরা। পরে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা সীমান্ত থেকে মাদকের চালান নিয়ে আসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। এভাবে প্রতিনিয়ত কোটি টাকার ইয়াবা ঢুকছে উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। পরে ইয়াবার চালান সুযোগ বুঝে চিহ্নিত সিন্ডিকেট সদস্যরা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করে দিচ্ছে। তবে সিন্ডিকেটের গডফাদাররা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।