ইয়াবা কারবারিদের সম্পদ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেয়ার প্রক্রিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক : ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়ে রাতারাতি ও অবৈধ পথে অঢেল সম্পদের মালিক বনে যাওয়া ব্যক্তিদের সবধরণের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ; মূলত: যাদের নাম গতবছর সরকারের তৈরী মাদক ব্যবসায়িদের সর্বশেষ তালিকায় রয়েছে। পাশাপাশি সরকারের তৈরী তালিকার বাইরে থাকা চিহ্নিত সব ইয়াবা কারবারিদের সম্পদেরও তথ্য-সংগ্রহের আওতায় আনা হবে এমনটি তথ্য পুলিশের। পুলিশ জানায়, তথ্য সংগ্রহের এ কাজে গত ১৬ ফেব্রুয়ারী সরকারের কাছে আত্মসমর্পণকারি ১০২ জন মাদক ব্যবসায়ি আওতামুক্ত থাকবে। তবে কারাগারে থাকা আত্মসমর্পণকারি এসব মাদক ব্যবসায়িদের সম্পদের তথ্য জানতে ইতিমধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কাজ শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, আত্মসমর্পণকারি ১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়িদের অর্জিত সম্পদের বিষয়ে গোপনীয়ভাবে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদকসহ রাষ্ট্রীয় ৪ টি সংস্থা। এছাড়া সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গোয়েন্দা বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মানি লন্ডারিং ইন্টেলিজেন্স বিভাগ। ইতিমধ্যে দুদকের একটি টিম কক্সবাজার কারাগারে থাকা বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের কাছে সম্পদের তথ্য-বিবরণী ফরমও তুলে দিয়েছেন। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, আত্মসমর্পণকারিরা ছাড়া তালিকাভূক্ত ও তালিকার বাইরে থাকা চিহ্নিত সকল ইয়াবা ব্যবসায়িদের অবৈধ পথে অর্জিত সবধরণের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে কাজ শুরু করেছে পুলিশ। এখন ইয়াবা ব্যবসায়িদের সম্পদের তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। তথ্য সংগ্রহের এ কাজ দ্রুত শেষ করারও প্রচেষ্টা রয়েছে পুলিশের। মাসুদ বলেন, “ ইয়াবার প্রবেশদ্বার খ্যাত টেকনাফ ছাড়াও জেলার তালিকাভূক্ত ও চিহ্নিত সব ইয়াবা ব্যবসায়িদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য সংগ্রহের পর তালিকা তৈরী করা হবে। এরপর সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও দপ্তরগুলোর কাছে তালিকাটি পাঠানো হবে। ” সংশ্লিষ্টরা তালিকাটি যাচাই-বাছাইয়ের পর ইয়াবা ব্যবসায়িদের অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জনের সত্যতা পেলে পুলিশকে যে ধরণের নির্দেশনা দেবে তা দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে এসপি। জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ ট্রাস্কফোর্স এর সদস্য এবং মাদক নিরাময় কেন্দ্র ‘নোঙ্গর’ এর প্রধান নির্বাহী মো. দিদারুল আলম রাশেদ বলেন, অবৈধ পথে ও দ্রুত অঢেল সম্পদের মালিক হওয়ার স্বাদ যারা একবার পেয়েছে; তারা সহজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। তারা চাইবে যে কোন পন্থায় অবৈধ পথটি আকঁড়ে থাকতে। তাই সতর্কতার সঙ্গে মাদক ব্যবসায়িদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রাষ্ট্রিয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে সরকারের এ ধরণের ব্যবস্থাটি থেকে মানুষ (ইয়াবা কারবারি) কি ধরণের শিক্ষা নিচ্ছে তা পর্যবেক্ষণের বিষয় মন্তব্য করেন দিদারুল আলম রাশেদ বলেন, ইয়াবা কারবারিদের স্থাবর-অস্থাবর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে সরকারের সদ্দিচ্ছার উপরই নির্ভর করবে। জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আয়াছুর রহমান বলেন, কক্সবাজারে বিশেষ করে টেকনাফে ইয়াবা কারবারি করে খুব দ্রুত অঢেল সম্পদ ও রাজপ্রাসাদের মত বাড়ীর মালিক হয়েছে অসংখ্য নজির রয়েছে। তাদের কারণে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে অস্থিরতা লেগেই আছে। “ তারা ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়ার কেউ ছিল রিক্সা চালক, দিনমজুর, গাড়ী হেলপার, জেলে, ঘাট শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ি এবং বিভিন্ন ধরণের সাধারণ পেশার মানুষ। কিন্তু ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে তারা গত ৫/১০ বছরে রাজপ্রাসাদের মত বাড়ীর পাশাপাশি অঢেল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক বনে গেছেন। ” এ আইনজীবী নেতা বলেন, তালিকাভূক্ত ও চিহ্নিত সকল ইয়াবা কারবারিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আনার জন্য জেলা পুলিশের তথ্য-সংগ্রহের যে প্রক্রিয়া চলছে এটি শুভ উদ্যোগ। এ ধরণের উদ্যোগ অনেক আগেই নেয়া জরুরী ছিল। সরকার ও প্রশাসন যদি এধরণের ব্যবস্থা নিত তাহলে ইয়াবা কারবারের এতো বিস্তৃতি হত না। “ অবৈধ পথে অর্জিত সম্পদ হারানোর ভয়ে জড়িতদের পাশাপাশি নতুন করে কেউ ইয়াবা কারবারে জড়াতে সাহস পেত না। এতে জড়িতরা যেমন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টায় থাকত, তেমনি নতুন করে জড়িয়ে পড়ার হারও হ্রাস পেত। ” জেলা পুলিশের এ তৎপরতা ইয়াবা ব্যবসা নির্মূলে অনেকটা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মন্তব্য করেন আইনজীবী আয়াছুর রহমান। সর্বনাশা মাদক ইয়াবার স্বর্গরাজ্য টেকনাফে ইয়াবা কারবারিদের প্রায় ১০০ টি রাজপ্রাসাদের মত বাড়ী রয়েছে বলে জানান টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। ওসি প্রদীপ বলেন, অল্প সময়ে ইয়াবা কারবার করে টেকনাফে বেশ কিছুসংখ্যক লোকজন স্থাবর-অস্থাবরসহ অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন। জেলা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তালিকাভূক্ত ও তালিকার বাইরে থাকা চিহ্নিত ইয়াবা কারবারিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য-সংগ্রহের কাজ চলছে। পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা পেলে সব ইয়াবা কারবারিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবস্থা নেয়া নেয়া হবে বলে জানান টেকনাফের ওসি। এদিকে তালিকাভূক্ত (আত্মসমর্পণকারিরা ছাড়া) ও চিহ্নিত যেসব ইয়াবা কারবারির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা রয়েছে এবং এসব মামলাগুলো এখনো নিষ্পত্তি হয়নি; তাদের সম্পদ অর্জনের বৈধতা জানতে চেয়ে আদালতের কাছে আবেদন জানানো হবে বলে জানিয়েছেন এসপি এ বি এম মাসুদ হোসেন। এসপি মাসুদ বলেন, আদালতের নির্দেশনা পেলে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা সংস্থাগুলোর কাছে ইয়াবা কারবারিদের অর্জিত সম্পদের বৈধতার ব্যাপারে সত্যতা নিরুপনের জন্য ব্যবস্থা নিতে আদালতের নির্দেশনার বিষয়টি অবহিত করা হবে।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ