ইয়াবা গডফাদাররা আত্মগোপনে

 

কক্সবাজারের টেকনাফে বহুল আলোচিত এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের দেখা মিলছে না। টেকনাফে ইয়াবা বিরোধী বিশেষ অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৬ শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী নিহত হওয়ার পর এসব গডফাদাররা আত্মগোপনে চলে গেছে।

একই সঙ্গে টেকনাফসহ এর আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলাচলকারি নানা রঙের আধুনিক মোটরসাইকেল গুলোও উধাও হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মিয়ানমারের সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে টেকনাফে ইয়াবা পাচারের ঘটনাটি দীর্ঘদিনের। গত এক যুগ ধরে এ ইয়াবা পাচারের ঘটনাটি দেশব্যাপী নানা আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু হলেও কার্যত গডফাদার ধরতে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

সম্প্রতি ইয়াবার বিস্তার রোধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে প্রশাসন। প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে ইয়াবা পাচারকারিরা বেকায়দায় পড়লে চিহ্নিত ইয়াবা গডফাদাররা ব্যবসা পরিচালনার জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠে। আর এর কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপর হামলা চালানো হয়।

এতে গত এক মাসে টেকনাফে ইয়াবা বিরোধী বিশেষ অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৬ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে ৮ জন আহত হয়েছে।

এর মধ্যে ১৮ মার্চ পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আহত হন একজন। ২০ মার্চ র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদ। ১০ এপ্রিল, ১৬ এপ্রিল ও ১৯ এপ্রিল আহত হয়েছে একজন করে, ২৫ এপ্রিল কোস্টগার্ডের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে ৩ জন, গুলিবিদ্ধ হয়েছে একজন। ২৭ এপ্রিল বিজিবি ও র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী জাকু ও ফরিদ নিহত হয়। সবশেষ সোমবার কক্সবাজার শহরে গুলিবিদ্ধ হয়েছে আরো এক ইয়াবা ব্যবসায়ী।

আর এতে পাল্টে গেছে টেকনাফের চির চেনা দৃশ্য। নানা সূত্র জানিয়েছে, টেকনাফের শীর্ষ গডফাদারদের কাউকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যে অনেকেই চট্টগ্রাম, ঢাকায় কৌশলে অবস্থান করলেও মিয়ানমারসহ অন্য রাষ্ট্রে পালিয়েছে অনেকেই।

সূত্র বলছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক তালিকায় শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা কৌশলে ধরা ছোয়ার বাইরে থাকতে আত্মগোপনে চলে গেলেও অস্ত্র মজুদ করে ইয়াবা পাচারের জন্য ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে।

এর মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে শীর্ষ ইয়াবা ডিলার হিসেবে শনাক্ত শাহপরীরদ্বীপের মোহাম্মদ ইসমাইল, টেকনাফ পৌরসভার পুরাতন পল্লান পাড়ার সব্বির আহমদ, শাহপরীরদ্বীপের আতাউর করিম, জালিয়াপাড়ার শফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ ফায়সাল, পুরাতন পল্লান পাড়ার ইসমাইল হোসেন, কুলাল পাড়ার জাবেদ, ডেইল পাড়ার নুরুল আমিন, জালিয়া পাড়ার নেজাম উদ্দিন, নিহত জাহিদ হোসেন জাকুর পুত্র রাফচান, অলিয়াবাদের রেজাউল করিম ভোলা, জালিয়াপাড়ার মোহাম্মদ শাহ, চৌধুরী পাড়ার জহিরুল ইসলাম বাবু, শাহপরীরদ্বীপের মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চৌধুরী পাড়ার আবদুল আমিন, নাইট্যং পাড়ার আবু বক্কর, চৌধুরী পাড়ার মুজিবুর রহমান, আব্দুস শুক্কুর, সাবরাং এর নুর হোসেন, লেঙ্গুর বিলের মোস্তাক আহমদ, দিদার হোসেন, আহমদ হোসেন, আলম লেডু, একরাম, আযুব প্রকাশ বাট্টা আয়ুব, মৌলভী বোরহান, হাসান, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, মোহাম্মদ শাহ, সাইফুল, মৌলভী জাফর আহমদসহ শীর্ষ ৬৯ ইয়াবা ব্যবসায়ীর দেখা মিলছে না।

সূত্র বলছে, এদের অনেকেই ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার শহরে অবস্থান করলেও মিয়ানমারে পালিয়ে গেছে ২০ জনের বেশি। এছাড়া একজন শীর্ষ প্রভাবশালী ইয়াবা গডফাদার মালয়েশিয়া, অপর একজন দুবাই পালিয়ে যাওয়ার তথ্য প্রশাসনের কাছে রয়েছে।

গডফাদাররা আত্মগোপনে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টেকনাফের দীর্ঘদিন ব্যবহৃত আধুনিক মোটরসাইকেল দেখা মিলছে না। টেকনাফ থেকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সোমবার সকাল থেকে টেকনাফের কোথাও এসব মোটরসাইকেল দেখা যায়নি।

প্রশাসনের সূত্র বলছে, বাংলাদেশে ইয়াবার চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। শুধুমাত্র এ দেশে চোরাই পথে পাচারের জন্য মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় স্থাপিত হয়েছে ৩৭টি কারখানা। মিয়ানমারের ৮ সংগঠনে নিয়ন্ত্রণে এ ৩৭টি কারখানা পরিচালিত হয়। মিয়ানমার ভিত্তিক ১০ জন ডিলার ওই সব কারখানায় তৈরি করা প্রতিদিন গড়ে ৩০ লাখের বেশি ইয়াবা পৌঁছে দিচ্ছে টেকনাফে। আর এর জন্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে থাকার নিদের্শ রয়েছে।

এমনকি সম্প্রতি কক্সবাজার সফরে এসে ইয়াবার সঙ্গে কোনো প্রকার আপোষ না করার নিদের্শ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। ফলে ইয়াবা রোধে প্রশাসনের কঠোর অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছে কক্সবাজার জেলার সাধারণ মানুষ।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।