ইয়াবা সিন্ডিকেটে ধাক্কা বন্দুকযুদ্ধে এমপি বদির ঘনিষ্ঠ ৩ জন নিহত, নিখোঁজ ২

 

দেশে পাচার হয়ে আসা ইয়াবার প্রধান রুট টেকনাফে এ মাদক সিন্ডিকেট প্রথমবারের মতো চরম বাধার মুখে পড়ল। গত চার দিনে টেকনাফসহ গোটা দেশের ইয়াবা গডফাদার তিনজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত আর দুজন অপহৃত হওয়ার পর মিয়ানমার সীমান্তবর্তী গোটা এলাকার মাদক ব্যবসায়ীরা গা ঢাকা দিয়েছে। এ ঘটনার পর মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা থাকলেও ‘হাঁফ ছেড়ে মুক্তি’র আনন্দ লক্ষ করা গেছে। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারির এক সপ্তাহের মধ্যে এসব ঘটনা ঘটল।
কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের দুজন শীর্ষস্থানীয় ইয়াবা পাচারকারী গতকাল রবিবার ভোরে র‌্যাব ও বিজিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। শনিবার সকালে অপহৃত হয় দুই তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী, যাদের সন্ধান এখনো মেলেনি। গত বৃহস্পতিবার রাতে নাফ নদীতে কোস্টগার্ডের সঙ্গে ইয়াবা পাচারকারীদের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তিনজন নিহত হয়। এর আগে গত ২১ মার্চ নুর মোহাম্মদ নামের তালিকাভুক্ত আরো এক ইয়াবা ব্যবসায়ী র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায়। এ নিয়ে গত এক মাসে টেকনাফ সীমান্তে নিহত হলো ছয় শীর্ষস্থানীয় ইয়াবা ব্যবসায়ী।
‘বন্দুকযুদ্ধ’ ও ‘অপহরণ’ ঘটনার পর গতকাল সীমান্ত শহর টেকনাফ সুনসান নীরব হয়ে যায়। এত দিন সংঘবদ্ধ ইয়াবা পাচারকারীদের দাপটে সাধারণ মানুষও অসহায় ছিল শহরটিতে। কিন্তু গতকাল সকাল থেকে সীমান্তের ইয়াবা পাচারকারীদের রাস্তাঘাটে বের হতে দেখা যায়নি। এই চিহ্নিত ইয়াবা পাচারকারীদের মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে। সর্বত্র আতঙ্ক বিরাজ করলেও স্বস্তি লক্ষ করা গেছে। দোকানপাট খোলা থাকলেও বেচাকেনা তেমন হয়নি। প্রতিদিন সীমান্ত এলাকায় ইয়াবার ছোটখাটো চালান আটক হতো। কিন্তু গতকাল এ রকম কোনো চালান আটক হয়নি। সীমান্ত এলাকায় নিয়োজিত বিজিবি-১৭ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল সাইফ এবং বিজিবি-৪২ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল জাহিদ কালের কণ্ঠকে গতকাল সন্ধ্যায় জানান, ইয়াবা সিন্ডিকেটের কোনো সদস্যই আর এলাকায় নেই।
পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি সূত্রগুলো জানায়, গতকাল ভোর ৪টার দিকে সীমান্ত এলাকার নাফ নদীর তীরের দমদমিয়া ন্যাচার পার্ক নামক এলাকায় বিজিবি ও র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলো- বাংলাদেশ স্বেচ্ছাসেবক লীগের টেকনাফ পৌরসভা কমিটির সভাপতি জাহেদ হোসেন জাকু (৪৩) ও টেকনাফের নাইটংপাড়ার বাসিন্দা ফরিদুল আলম (৪২)। তারা দুজনই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা পাচারকারী। নিহত জাকু ও শনিবার অপহৃত তালিকাভুক্ত ইয়াবা পাচারকারী নুর মোহাম্মদ ওরফে লাস্টট্রিপ ও সালমান ছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগের এমপি আবদুর রহমান বদির দেহরক্ষী।
টেকনাফ সীমান্তের বিজিবি-৪২ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ কালের কণ্ঠকে জানান, সীমান্ত এলাকায় ইয়াবা পাচার রোধে শনিবার রাতে র‌্যাব ও বিজিবি যৌথভাবে টহল শুরু করে। টহল দলটি টেকনাফ সড়কের দমদমিয়া ন্যাচার পার্ক এলাকায় একটি মাইক্রোবাস দেখে সেটিকে থামার সংকেত দেয়। গাড়িতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা পাচারকারী জাহেদ হোসেন জাকু ও ফরিদুল আলমকে দেখে তারা পিছু নিলে গাড়ি থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়। এ সময় র‌্যাব-বিজিবির সদস্যরাও পাল্টা গুলি ছুড়লে গাড়িটি ফেলে কিছু লোক পালিয়ে যায়। পরে মাইক্রোবাসের কাছে জাকু ও ফরিদুলের লাশ পাওয়া যায়। ঘটনাস্থল থেকে র‌্যাব ও বিজিবি দুই হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট, দুটি এলজি, একটি পাইপগান ও ১০ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করে।
এদিকে শনিবার টেকনাফের লামার বাজার নামক এলাকা থেকে অপহৃত হয়েছে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের বিতর্কিত এমপি আবদুর রহমান বদির ‘ডান হাত-বাম হাত’ হিসেবে পরিচিত টেকনাফ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক নুর মোহাম্মদ ওরফে লাস্টট্রিপ (২৭) ও তাঁর শ্যালক সালমান (২২)। তারা টেকনাফ পৌর এলাকার উত্তর আলিয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা। নুর মোহাম্মদ টেকনাফ সীমান্তের শীর্ষস্থানীয় ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অন্যতম এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা পাচারকারী হিসেবেও চিহ্নিত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই তালিকায় এমপি বদির পাঁচ ভাই মৌলভি মুজিবুর রহমান (টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর), আবদুস শুকুর, আবদুল আমিন, শফিকুর রহমান ও ফয়সাল আমিনের নামও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অপহৃত ইয়াবা পাচারকারীদ্বয় এমপি আবদুর রহমান বদির পরিবারের এ-সংক্রান্ত ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা করে থাকে। অপহৃতদের ব্যাপারে টেকনাফ থানার ওসি রণজিৎ কুমার বড়–য়া বলেন, ‘আমি শুনেছি, কে বা কারা শনিবার সকালে একটি মাইক্রোবাসে তুলে সালমান ও নুর মোহাম্মদকে অজ্ঞাতপরিচয় স্থানে নিয়ে গেছে।’ এ ব্যাপারে শনিবার রাতে অপহৃত যুবক সালমানের মা গুলবাহার থানায় একটি জিডি করেছেন। সালমানের মা সংবাদকর্মীদের বলেন, ‘আমার নিরপরাধ ছেলে ও মেয়ের জামাইকে কে বা কারা তুলে নিয়ে গেল আমি তা জানতে চাই।’ তবে র‌্যাব ও পুলিশের অভিযানে কাউকে তুলে নেওয়া হয়নি বলে জানানো হয়েছে।
টেকনাফ সীমান্তে এ পর্যন্ত তিনজন তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত এবং আরো দুজনের অপহৃত হওয়ার ঘটনায় টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্রসফায়ারে নিহত তিনজনসহ অপহৃত তালিকাভুক্ত ইয়াবা পাচারকারীরা সবাই স্থানীয় এমপি আবদুর রহমান বদির ঘনিষ্ঠজন। তাদের মধ্যে নিহত জাকু এবং শনিবার অপহৃত দুজন এমপি বদির বডিগার্ড হিসেবে পরিচিত।’
ওদিকে টানা পাঁচ দিন ধরে বন্ধ থাকার পর টেকনাফ স্থলবন্দরের স্বাভাবিক কাজকর্ম গতকাল সকাল থেকে শুরু হলেও লোকজনের উপস্থিতি অত্যন্ত কম ছিল। এ কারণে বন্দরের কাজকর্ম ব্যাহত হয়েছে। স্থানীয় শুল্ক কর্মকর্তা নুরে আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তালিকাভুক্ত ইয়াবা পাচারকারীদের গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযানের মুখে স্থলবন্দরেও লোকজনের উপস্থিতি কমে গেছে।’ প্রসঙ্গত গত ২২ এপ্রিল টেকনাফ সীমান্তে বিজিবি সদস্যরা তালিকাভুক্ত ইয়াবা পাচারকারী জিয়াবুল ও আয়াছ নামের দুই সহোদরকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে। এর প্রতিবাদে বন্দর ব্যবহারকারীরা টানা পাঁচ দিন ধরে ধর্মঘট চালিয়ে আসছিলেন। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মুক্তির দাবিতে গত পাঁচ দিনের ধর্মঘটে সরকার সোয়া কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে বলে জানিয়েছেন শুল্ক কর্মকর্তা নুরে আলম।
উল্লেখ্য গত ১৯ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এমপি টেকনাফ সীমান্তে সফরকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যদের উদ্দেশে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে কোনোভাবেই বাংলাদেশে মরণনেশা ইয়াবা আসতে দেওয়া হবে না। সরকার ইয়াবাসহ মাদক পাচার বন্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যেকোনোভাবে এই মাদক বন্ধ করতেই হবে। ইয়াবা অভিযানে কারো তদবিরও চলবে না।’ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এ সফরের পর থেকেই সীমান্তে ইয়াবা পাচারকারীদের দমনে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে। বিজিবির কক্সবাজারের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খন্দকার ফরিদ হাসান কালের কণ্ঠকে জানান, মিয়ানমার থেকে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে ইয়াবার চালান পাচার শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসার জন্য সীমান্তরক্ষীদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।