ক্যাম্পের ত্রাস ডাকাত দল


রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে সক্রিয় ৪-৫টি সংঘবদ্ধ ডাকাত দল। ডাকাতি ছাড়াও তারা অপহরণ, ছিনতাই, মাদক কারবারে জড়িত। এসব দলের মূলহোতা রোহিঙ্গা ডাকাত আবদুল হাকিম। বর্তমানে সে মিয়ানমারের মংডুতে অবস্থান করছে। সেখান থেকে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে হাকিম। প্রায়ই সে গোপনে কক্সবাজারের ক্যাম্পে হাজির হয়। ডাকাত দলের সদস্যরা কক্সবাজারের ক্যাম্প-সংলগ্ন পাহাড়ে তাদের গোপন আস্তানা তৈরির চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে কয়েকটি আস্তানা তৈরিও হয়ে গেছে। শুধু ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গা নন, কক্সবাজারে বসবাসকারী বাঙালিদের কাছেও এসব ডাকাত গ্রুপ আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে হূীলা ইউনিয়নের জাদিমোড়া এলাকায় স্থানীয় ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি ওমর ফারুককে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশ-র‌্যাবের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, রোহিঙ্গা ডাকাত দলের সদস্যরা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। তাদের মধ্যে মোহাম্মদ শাহ ও মোহাম্মদ শুক্কুর নামে দু’জন গতকাল পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। তবে ফারুক হত্যার ঘটনায় এটা স্পষ্ট, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে ডাকাত দলের সদস্যরা এখন বেপরোয়া। তাদের হাতে রয়েছে দেশি-বিদেশি অস্ত্র।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ওপর নজর রাখেন এমন একাধিক দায়িত্বশীল পদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে জানান, কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে ডাকাত দলের যারা সক্রিয় রয়েছে তারা হলো- জাকির ডাকাত, সলিম, কামাল, খায়রুল আমিন, মাহমুদুল হাসান, হামিদ, নেছার, সাইফুল ওরফে ডিবি সাইফুল, রাজ্জাক, বুল ওরফে বুইল্লা, রফিক, মাহনুর ওরফে ছোট নুর। তারা একাধিক দলে ভাগ হয়ে নানা অপরাধ করছে। তাদের মূল নেতা হিসেবে রয়েছে আবদুল হাকিম। তার একজন স্ত্রী ও ভাই এরই মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। এ ছাড়া নিজেদের মধ্যে কোন্দলে ক্যাম্প এলাকায় এক ডাকাত খুন হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানান, জাদিমোড়া ২৭ নম্বর ক্যাম্প অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বেশ কয়েক দফা ওই ক্যাম্পে অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার মুখে পড়েছে র‌্যাব। অভিযানের সময় র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি করে ডাকাত দলের সদস্যরা। সন্ধ্যার পর ক্যাম্প এলাকায় ঢুকতেও ভয় পান অনেকে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে সক্রিয় ডাকাত দলের সদস্যরা সাধারণ রোহিঙ্গাদের জিম্মি করে প্রায়ই লুটপাট চালায়। এ ছাড়া ডাকাত দলের কোনো কোনো সদস্য পুলিশ পরিচয়ে সাধারণ রোহিঙ্গাদের বাসায় ঢুকে মালপত্র লুট করে বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্যাম্পের ভেতর বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হামলা চালানো হয়।

রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৭ সালে অস্ত্র মামলা হয় ১২টি, ২০১৮ সালে ১৩টি ও ২০১৯ সালের জুলাই পর্যন্ত ১১টি। ২০১৭ সালে মাদক মামলার সংখ্যা ছিল ২২টি, ২০১৮ সালে ৯৫ ও ২০১৯ সালে ৯১টি। ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার মামলা ২০১৭ সালে ২টি, ২০১৮ সালে ১৬টি ও ২০১৯ সালে ১৩টি। অপহরণ মামলা ২০১৭ সালে একটিও ছিল না। ২০১৮ সালে ৯টি ও ২০১৯ সালে ১০টি। ডাকাতি ও ডাকাতির প্রস্তুতি মামলা ২০১৭ সালে ২টি, ২০১৮ সালে ৭টি, ২০১৯ সালে একটিও নেই। হত্যা মামলা ২০১৭ সালে ৮টি, ২০১৮ সালে ১৫টি ও ২০১৯ সালের জুলাই পর্যন্ত ২০টি। মানব পাচার মামলা ২০১৭ সালে একটিও ছিল না। ২০১৮ সালে ২টি ও ২০১৯ সালে ২২টি।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতে দীন মোহাম্মদ নামে এক পুরনো রোহিঙ্গা ডাকাতের মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। ক্যাম্পে এ ব্যাপারে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে দীন মোহাম্মদের বাসা থেকে সেলিম নামে আরেক ডাকাত তার ১২-১৩ জন সঙ্গী নিয়ে বের হয়ে আসছিল। ওই সময় যুবলীগ নেতা ওমর ফারুক তার কয়েকজন বন্ধু নিয়ে ক্যাম্প এলাকার পাশেই অবস্থান করছিলেন। ওই এলাকায় ওমর ফারুক একটি এনজিওর ঘর নির্মাণের দায়িত্ব পান। সেটা দেখভাল করতে বৃহস্পতিবার রাতে তিনি সেখানে যান। রোহিঙ্গা ডাকাতরা জাদিমোড়া এলাকা পার হওয়ার সময় ফারুক অন্ধকারে তাদের পরিচয় জানতে চান। এর একপর্যায়ে ডাকাতরা ফারুককে ধরে ক্যাম্প এলাকায় নিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

মিয়ানমারের রাশিদং থানার বড়ছড়া গ্রামের জানি আলীর ছেলে আবদুল হাকিম। প্রায় তিন বছর আগে পুলিশের সোর্স মুন্ডি সেলিম হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম আলোচনায় আসে এই ডাকাত সর্দার। এরপর টেকনাফ সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডে হাকিমের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। ৯ বছর আগে মিয়ানমার পুলিশ তার এক ভাইকে সেখানে হত্যা করে। এর পর সে সেখান থেকে শাহপরীর দ্বীপে পালিয়ে এসে বাজারপাড়ার আবদুল জলিলের বাড়িতে বসবাস শুরু করে। ওই সময় হাকিম গরু চুরি ও ডাকাতি করত। এসব অপরাধে জড়িয়ে গণপিটুনির শিকার হয়। এরপর সে টেকনাফ চলে আসে। সেখানেই গড়ে তোলে ডাকাত বাহিনী।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, ক্যাম্প ও আশপাশ এলাকায় কাউকে কোনো ধরনের অপরাধে জড়াতে দেওয়া হবে না। হাকিমসহ কয়েকজন ডাকাতকে খোঁজা হচ্ছে। র‌্যাব-১৫-এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ সমকালকে বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে ডাকাত গ্রুপসহ অন্যান্য যেসব অপরাধ চক্র সক্রিয় রয়েছে, তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। কয়েকজনকে বিভিন্ন সময় গ্রেফতারও করা হয়েছে। অন্যরা শিগগিরই ধরা পড়বে। এদিকে, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তার অন্যতম হলো- ক্যাম্পের নির্দিষ্ট এলাকায় ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসানো, ক্যাম্পের ভেতরে লাইটের ব্যবস্থা রাখা, ক্যাম্পের ভেতরে গাড়ি নিয়ে টহল দেওয়ার মতো অবকাঠামো তৈরি এবং যেসব রোহিঙ্গা অপরাধে জড়িয়ে পালিয়ে আছে তাদের রেশন বন্ধ করা।

সুত্র-সমকাল

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ