টেকনাফের কোটিপতি দিনমজুর ইয়াবা কারবারি এজাহার এখন পথের ফকির



কালের কন্ঠঃ

ইয়াবা কারবারের মাধ্যমে অল্প দিনেই কোটিপতি বনে যাওয়া দিনমজুর এজাহার মিয়াকে আবারো পথে বসতে হয়েছে। অবৈধ আয়ের সহায় সম্পদ হারিয়ে তিনি এখন পথের ফকির। কোন প্রতিপক্ষ ইয়াবা কারবারি নয়, দেশের প্রচলিত আইন এবার তার সহায় সম্পদ ক্রোক করে নিয়ে তার পরিবারকে পথে বসিয়ে দিয়েছে।

টেকনাফ সীমান্তের নাজিরপাড়ার দিনমজুর এজাহার মিয়া। করতেন দিনমজুরি। জায়গা-জমি কিছুই ছিল না। নৌকা ঘাটের দিন মজুরি করতে গিয়ে ইয়াবা কারবারের পথে নেমে পড়েন। সাথে নিজের দুই পুত্র মৌলভী নুরুল হক ভুট্টো ও নুর মোহাম্মদ মংগ্রিকেও কারবারে নামিয়ে দেন। পিতা এবং দুই পুত্র মিলে রমরমা ইয়াবা কারবারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে যান।

সারা জীবন কুঁড়ে ঘরে বসবাস করেছেন দিন মজুর এজাহার মিয়া। শখ ছিল একটি আলীশান বাড়ীর। পিতা-পুত্ররা মিলে নাজির পাড়ায় ভিটা কিনে গড়ে তোলেন একে একে দু’টি আলীশান বাড়ী। সন্ধ্যা নামলেই বাড়ী দু’টিতে জ্বলে ঝলমলে বৈদ্যুতিক বাতি। ইয়াবার কাড়ি কাড়ি টাকায় বেজায় সুখ এজাহার মিয়ার ঘরে। ২০১০ সাল থেকে ইয়াবার সাথে হুন্ডির কারবার করে ঘরবাড়ী ছাড়াও বিপুল পরিমাণের ভুসম্পদের মালিকও বনে যায় পরিবারটি।

আর ইত্যবসরে মাদকদ্রব্য ও মানি লন্ডারিং এর অভিযোগে পিতা ও দুই পুত্রের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা রুজু করা হয়। এসব মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ একের পর এক অভিযান চালাতে শুরু করে পরিবারের তালিকাভুক্ত কারবারিদের বিরুদ্ধে। গত দুই মাস আগে পরিবারের জেষ্ট্য সন্তান ইয়াবা কারবারি নুর মোহাম্মদ মংরি ইয়াবা সহ ধরা পড়ে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

সেই সাথে গত তিনদিন আগে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন অপর পলাতক কারবারি ভাই মৌলভী নুরুল হক ভুট্টো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত কারবারি মৌলভী নুরুল হক কক্সবাজারের ৫ জন সাংবাদিককে মারধরেরও একটি মামলার পলাতক আসামী। দুই পুত্রের এমন অবস্থায় কারবারি পিতা এজাহার মিয়াও পালিয়ে যান।

সর্বশেষ শনিবার টেকনাফ থানা পুলিশ আদালতের নির্দেশে টেকনাফের নাজির পাড়ার ইয়াবাকারকারি এজাহার মিয়ার দ্বিতল পাকা বাড়ীতে হানা দেয়। ইয়াবাবাজ পিতা-পুত্রের অবৈধভাবে অর্জিত প্রায় ৩৫ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ কক্সবাজার পুলিশ সুপারের পক্ষে টেকনাফ থানা পুলিশ জব্দ করেছে। 

এ প্রসঙ্গে টেকনাফের সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শফিক মিয়া বলেন-‘ ইয়াবার অবৈধ টাকায় অর্জিত সম্পদ যদি কারবারিরা ভোগ করতে না পারে তাহলে কারবার এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। তাই এমন পদক্ষেপটি একদম সময়োপযোগি।’ তিনি বলেন, মানিলন্ডারিং মামলা আরো অনেক আগে করা দরকার ছিল। সেই সাথে দ্রুততার সাথে কারবারিদের সহায়-সম্পদ জব্দ করা হলে তারা পিছুটান দেবে।

টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ জানান, ইয়াবাবাজী করে অর্জিত এ অবৈধ সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে জব্দ করা হয়। ওসি জানান, ক্রোক করা সম্পদের মধ্যে দু’টি আলিশান দালান ও ৮ টি পৃথক তফশীলের মূল্যবান জমি রয়েছে।

পুলিশের অভিযানের সময় বাড়ীতে ছিলেন এজাহার মিয়ার স্ত্রী আবেদা খাতুন ও পুত্রবধু লায়লা বেগম। পুলিশ তাদের ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বললে শ্বাশুড়ি আর পুত্রবধূ এসময় অনেক কান্নাকাটিও করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি ডেকচি ও প্লাষ্টিকের একটি ঝুড়ি হাতে করেই অঝোরে কেঁদে সেই পাকা দালান ছাড়তে হয়েছে কারবারি এজাহারের স্ত্রীকে। শ্বাশুড়ি ও পুত্রবধূ তৎক্ষণাৎ প্রতিবেশী একজনের ঘরে উঠেন।

এককালে যে দিনমজুর এজাহার মিয়া নিঃস্ব ছিলেন এখন আবারো আগের অবস্থায় ফিরে গেছেন তিনি। টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুুমার দাশ বলেন, ইয়াবা কারবারির সুরম্য দালান ও জমি আদালতের রায় অনুযায়ী পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসা হয়ে হয়েছে। সেই সাথে অস্থাবর সম্পদ সমুহ সিজারলিষ্ট করে থানার গোডাউনে নিয়ে আনা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, কক্সবাজারের স্পেশাল জজ এবং জেলা ও দায়রা জজ খোন্দকার হাসান মোঃ ফিরোজ পিতা, ২ পুত্র সহ তিনজন ইয়াবাবাজের মানিলন্ডারিং করে অবৈধভাবে অর্জিত ৫ কোটি ৭৩ লাখ ৯৬ হাজার ৮৬৭ টাকার সম্পদ ক্রোক করার জন্য গত ৫ মার্চ এই আদেশ দিয়েছিলেন। ইয়াবা কারবারি তিন পিতা পুত্রের অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ ক্রোকের মাধ্যমে ইয়াবাবাজদের অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ ক্রোক কাজ শুরু করা হল। টেকনাফের ওসি আরো জানান, টেকনাফ সীমান্তে এরকম আরো ৭০ টি ইয়াবা বাড়ী ক্রোক করা হবে। এজন্য আদালতে আবেদন করারও প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

এদিকে টেকনাফ উপজেলার ৬ টি ইউনিয়নে মাদক নির্মূল ও প্রতিরোধ কমিটির ব্যাপক কার্যক্রমও শুরু করা হয়েছে। গত শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে এ কার্যক্রম। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন জানিয়েছেন, প্রতিটি ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মাদক নির্মূল ও প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কমিটির কার্যক্রম গতিশীল করার জন্য প্রতিটি কমিটির জন্য একটি করে অফিসও স্থাপন করা হচ্ছে। পুলিশ সুপার শুক্রবার একদিনেই টেকনাফে এরকম ৩ টি অফিস উদ্ভোধন করেছেন

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ