টেকনাফের যাত্রা বিড়ম্বনা

যাত্রা বিড়ম্বনা
সাইফুল ইসলামঃ গেল সপ্তাহে একটি বিশেষ কাজে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে যেতে হয়। তাই যথারীতি দুপুর আড়াইটার মধ্যে খেয়ে দেয়ে গন্তব্যের উদ্দ্যেশে বাড়ি থেকে বের হলাম। প্রথমে রিকশা নিয়ে টেকনাফ নতুন বাস টার্মিনালের দিকে যাচ্ছিলাম। যদিও মেরিন ড্রাইভ দিয়ে প্রায় সময় যাওয়ার কারণে আরাকান রোড দিয়ে ইদানীং যাতায়ত কম হয়। পুরাতন বাস ষ্টেশন নতুন বাস টার্মিনালে স্থানান্তর করার কারণে বড় বাসের জট তেমন চোখে না পড়লেও রিকশা,টমটম,সিএনজির জট ছিল লক্ষনীয়ভাবে।

অবশেষে দুপুর দুইটা পঞ্চাশ মিনিটে নতুন বাস টার্মিনালে পৌছলাম। টিকেট কাউন্টার থেকে টিকেট কিনে বাসে উঠলাম। বাস যথারীতি ছাড়ল তিনটায়। বাসটি উঠনি পার হয়ে নীচে নামতে প্রথমে নজরে পড়ল র্যার এর চেক্ পোস্ট। একজন র্যার কর্মকর্তা বাসে উঠে তল্লাশি শুরু করল। মুখে দাড়ি, দেখতে মার্জিত ও ভদ্র। তিনি একে একে তল্লাশির আমার কাছে আসল। আমাকে তল্লাশি করতে চাইল। আমি বললাম অবশ্যই এবং এটি আপনার বলে তাকে বললাম। তিনি আর তল্লাশি না করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,আপনি কী করেন? প্রতি উত্তরে আমি বললাম,আমি একজন শিক্ষক।তখন তিনি আমাকে আবার বললেন, আগে কেন পরিচয় দেননি স্যার। আমি বললাম আগে পরিচয় দিলে আমার পেশার প্রতি সম্মান দেখিয়ে আপনি আমার তল্লাশি করতে চাইতেন না। তিনি আবার বললেন,কিছু খারাপ শ্রেণির মানুষের কারণে আপনাদের মতো সম্মানি মানুষকেও অসম্মানিত হতে হয়। তারপর তিনি ভালো থাকেন বলে বাস থেকে নেমে গেলেন।

আাবার যাত্রা শুরু। সেখান কিছুদূর যেতে না যেত দমদমিয়া চেকপোস্ট। সেখানে দেখি বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। বিজিবি জওয়ানরা একে একে যানবাহনগুলোর তল্লাশি চালাচ্ছে। আমাদের বাসটি তল্লাশির পর ছেড়ে দিল। এরপর এক কিলোমিটারের মধ্যে সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট। তারা বাসের যাত্রীদের এনআইডি কার্ড আছে কিনা দেখল তারপর ছেড়ে। অত্যন্ত সুন্দর ও মার্জিত ব্যবহার তাঁদের। তবে দায়িত্ব পালনে কিন্তু দূর্বার। বাংলাদেশের গর্বিত সেনাবাহিনীর অবস্থান দেখে নিজেদের অনেক মনে করলাম।এই চেকপোস্ট পার হয়ে জাদিমুড়া এলাকায় পৌছলে মানুষ ও যানবাহনের যট ছিল না বলার মতো। এমনিতে সাধারণ যানবাহনের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি এনজিও গাড়ির চলাচলের কারণে প্রধান সড়কটিতে প্রচন্ড রকম জট ছিল। তার উপর হাজার হাজার রোহিঙ্গার রাস্তা পারাপারের কারণে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছিল। এভাবে জাদিমুড়ার পর মুচনি,মুচনির পর লেদা,লেদার পর হ্নীলা যেতে আধ ঘন্টার জায়গায় একটা ঘন্টা লেগে গেল।
হ্নীলায় চালক দশ মিনিটের যাত্রাবিরতি বিশ মিনিট করল। এমনিতে বিড়ম্বনা তার উপর চালকের বিড়ম্বনা। এরপর আবার যাত্রা শুরু করলেন চালক। এবার হ্নীলা থেকে হোয়াইক্যং যেতে পথে পথে জটলা। হোয়াইক্যং পৌছতে লাগল পঞ্চাশ মিনিট। হোয়াইক্যং বিজিবি চেকপোস্টে গিয়ে দেখা যায় গাড়ি দীর্ঘ লাইন। সেখান থেকে উদ্ধার হতে সময় লাগে আধাঘন্টা। তারপর কোনমতে পালংখালী গাড়ি পৌছল। অতঃপর পালংখালী থেকে কুতুপালং পৌছতে কী যে জট আর প্রধান সড়কের বেহাল দশা বলার অপেক্ষা রাখেনা। প্রধান সড়ক দিয়ে এনজিও সংস্থার শত শত গাড়ি ও বাঁশ,গাছ ভর্তি ট্রাকের চলাচলের কারণে সৃষ্ট যানজট কক্সবাজার ও অন্যান্য জায়গায় যাতায়াতকারীদের করুন অবস্থা দেখার মনে হয় কেউ নেই। সবাই রোহিঙ্গা প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।

এবার কুতুপালং থেকে উখিয়ায় ঢোকার পথে সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট। সম্মানিত সেনাসদস্যরা যাত্রীদের এনআইডি কার্ড আছে কিনা দেখল তারপর ছেড়ে দিল। সেনা চেকপোস্ট থেকে উখিয়া ষ্টেশনে ঢোকতে আরেকটি বিশ-পঁচিশ মিনিটের জট। মনে হচ্ছিল দম বন্ধ হয়ে যাব। এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে তা মনে কল্পনা করি নাই। যাত্রাপথে অনেকবার নেমে যেতে চেয়েছি কিন্তু অন্য কোন উপায় না থাকায় নামা সম্ভব হয়নি। বাসে আমার পাশের যাত্রী বলল,স্যার রোহিঙ্গা প্রেম ও ইয়াবার কারণে আমাদের আজকে এই পরিনতি। তিনি আরো বললেন,আমাদের আরো ভুগতে হবে স্যার। আমি মাথা নাড়লাম। উখিয়া পার হয়ে কোটবাজার ঢোকার পথে ছোট ছোট অসংখ্য জট। আর কোটবাজারের প্রধান সড়কের যে অবস্হা যা চোখে না দেখলে বুঝা যাবেনা। কোটবাজার পার হয়ে মরিচ্যায় যৌথ চেকপোস্টে তল্লাশি। সেখানেও অনেকক্ষণ অবস্হান। অবশেষে মরিচ্যা চেকপোস্ট পার হয়ে যখন কক্সবাজারে পৌছলাম তখন রাত সাতটা পঞ্চাশ মিনিট। যে উদ্দেশ্যে আমার কক্সবাজার আসা তা শেষ পর্যন্ত বিফলে গেল। এভাবে আমার মত কত শত মানুষের উদ্দেশ্য বিফল হচ্ছে বলার মতো নয়। আর গর্ভবতী,প্রসূতি মা,বয়োবৃদ্ধ মানুষের কী যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় শুধু আল্লাহ জানে।

আজ যাদের কারণে আমাদের এই পরিণতি তাদের যতদ্রুত সম্ভব ভাসানচর ও অন্যান্য জায়গায় স্থানান্তর করার পাশাপাশি যেসব রোহিঙ্গা বান্ধব এনজিও রয়েছে তাদের ব্যবহৃত যানবাহান দ্বারা রাস্তাঘাটের যে পরিমান ক্ষতি হচ্ছে তা তাদের মাধ্যমে পুষিয়ে নিতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ নেয়া একান্ত জরুরি। আর ইয়াবার কারণে পথে পথে যে তল্লাশি বা হয়রানি হচ্ছে তা উত্তরণে মাদকের রিরুদ্ধে অভিযান চলমান রেখে দোষীদের চরম শাস্তি প্রদান করা হোক।
সাইফুল ইসলাম-লেখক ও শিক্ষক।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।