টেকনাফের সীমান্তের ৩০ পয়েন্ট দিয়ে ঢুকে মাদক


নুর হাকিম আনোয়ার,টেকনাফ
আজ ২৬ জুন। বিশ্বকে মাদকমুক্ত করার অঙ্গীকার নিয়ে ১৯৮৭ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে ২৬ জুনকে ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে এ দিবস প্রতিবছর পালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছরের মতো এবারো নানা আয়োজনে বিভিন্ন সংস্থা দিবসটি গুরুত্বসহকারে পালন করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে কোন ধরণের মাদক উৎপাদন করে না। তারপরও পাশ্ববতর্ী দেশ ভারত থেকে ফেন্সিডিল ও গাঁজা এবং বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ট্যাবলেট আসে।
সরকার মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় দেশে সর্বাধিক প্রচলিত ইয়াবা ব্যবসায়ীরা বেকায়দায় পড়েছে। প্রাণশক্তি কেড়ে নেয়া ভয়ংকর মাদক ইয়াবা ট্যাবলেট বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে ভয়ঙ্কর মরণ নেশা ইয়াবা পানির স্রোতের মতো মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসে। তা ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী টেকনাফে পুরনো ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অনেকেই আত্মসমর্পণ করায় নতুন চোরাকারবারি তৈরি করতে হচ্ছে তাদের মিয়ানমারের। মিয়ানমার মাদকের বাজার ধরে রাখার জন্য কৌশল হিসেবে ইয়াবার রং পরিবর্তন করছে। লাল রঙের পাশাপাশি সাদা, কমলা ও হলুদ রঙের ইয়াবা বাজারে মিলছে। তবে নতুন রঙের ইয়াবার চালান কম হলেও এগুলোর মূল্য একটু বেশি।
মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকার ৩৭টি ল্যাবে (কারখানা) থেকে এসব ইয়াবা তৈরির পর কখনো ভেলায় ভাসিয়ে, পাহাড়ের পথ ডিঙিয়ে, সাতাঁরিয়ে ও মাছ ধরার ট্রলারযোগে টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির ৩০ টি পয়েন্ট দিয়ে ঢুকে।
আবার তা কখনো গাড়িতে সংবাদপত্রের স্টিকার লাগিয়ে, কখনো বা ল্যাপটপ ও মোবাইলের বাক্স করে, দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি বা গ্যাস সিলিন্ডার, লবণের ট্রাক, পানের ট্রাকের ভেতর ঢুকিয়ে পাচার হচ্ছে লাখ লাখ পিস ইয়াবা। এ ছাড়াও অনেকে পেটের ভেতর করে পুরুষ ও নারী মাদক পাচারকারীরা ও বিশেষ পদ্ধতিতে পাচার করে। এসবের হাতেগোনা কিছু চালান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আটক করলেও বেশির ভাগই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। মরণ নেশা ইয়াবার বিস্তারে যুবসমাজ ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আর অবাধে ইয়াবার ব্যবসার প্রসার ঘটিয়ে কোটিপতি বনে যাচ্ছে চোরকারবারি ও ব্যবসায়ীরা। ইয়াবার এই পাচার ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বর্তমানে সরকারের মাদকবিরোধী অভিযানে ১০২ ব্যবসায়ী আত্মসর্মপণ করেছেন এবং প্রায় পুরো জেলায় শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন।
সূত্র জানায়, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা থেকেই চলতি মাসে উদ্ধার করা হয় প্রায় ১৮ লাখ পিস ইয়াবা। নদী, সাগর ও সড়কপথে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভের সী-বীচ, শাহপরীরদ্বীপ, নয়াপাড়া, সাবরাং, মৌলভীপাড়া, নাজিরপাড়া, জালিয়াপাড়া, নাইট্যংপাড়া, কেরুণতলী, বরইতলী, জালিয়ারদ্বীপ, আলীখালি, খারাংখালী, নয়াবাজার, ঝিমংখালী, উনছিপ্রাং, হোয়াইক্যং, বালুখালী, খারাংগ্যাঘোনা, লম্বাবিল, কাঞ্জরপাড়া, মৌলভীবাজার, হ্নীলা, লেদা, নয়াপাড়া, জাদীমুরা, দমদমিয়া, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম, তুমব্রু, উখিয়া উপজেলার থাইংখালীর রহমতের বিল ও পালংখালীর বটতলী পয়েন্ট দিয়ে দেশে ঢুকছে বাংলাদেশে। টেকনাফ থেকে নাফ নদী পার হলেই ওপারে মিয়ানমারের মংডু এলাকা। সেখান থেকেই বেশি আসে ইয়াবার চালান।
ইতিপূর্বে বানের স্রোতের মত ইয়াবার চালান আসলেও বর্তমানে টেকনাফে বিজিবি, পুলিশ, কোস্টগার্ড, র‍্যাবের কড়াকড়ির কারণে ইয়াবা আসা বহুগুণ কমেছে। আর উদ্ধার হচ্ছে না বড় বড় চালান। ইয়াবা পাচার করতে গিয়ে বন্দুকযুদ্ধে মরে যাচ্ছে অনেকেই।
সেচ্ছাসেবী সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) টেকনাফ উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এবিএম আবুল হোসেন রাজু বলেন- মাদকের করালগ্রাস দেশের প্রাণশক্তি যুবসমাজকে ধ্বংসের মাধ্যমে উন্নয়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই মাদকের অপব্যবহার ও পাচার প্রতিরোধ করা অত্যন্ত জরুরি। মাদকাসক্তদের সঠিক চিকিৎসা প্রদান ও পুনর্বাসন করা গেলে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হবে। মাদকাসক্তি দেশের শিক্ষাঙ্গন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। তাই মাদক ব্যবসায়ী, মাদক বহনকারী ও মাদকসেবী সবাইকে চলমান অভিযানে আইনের আওতায় আনতে হবে। ইয়াবার মতো মাদক মানুষকে ধ্বংস করছে, সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ককে নষ্ট করছে। মাদকের আগ্রাসন থেকে দেশ, সমাজ ও তারুণ্যকে রক্ষা করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরো বলেন- মাদক সমস্যা তথা মাদকদ্রব্যের অবাধ ব্যবহার ও অবৈধ পাচার একটি জটিল, বহুমাত্রিক ও আন্তর্জাতিক সমস্যা। মাদকদ্রব্যের ব্যবহার ও চোরাচালান সমস্যা দেশকাল, ধর্মবর্ণর্, সমাজ নির্বিশেষে আজ সারা বিশ্বকে গ্রাস করছে। ধনী-দরিদ্র, উন্নত উন্নয়নশীল কোন দেশই মাদক সন্ত্রাস থেকে মুক্ত নয়। মাদককে ঘিরে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, সংঘাত দ্বন্দ্ব, কলহ, দুর্ঘটনা, ধ্বংস ও মৃত্যুর যে খেলা চলছে তাকে নিবারণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মোজাম্মেল হক জানান, রোহিঙ্গারা অপরাধের দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং তারা মিয়ানমার থেকে আসার সময় ইয়াবা নিয়ে আসে। আর এখানে এসে এদের অধিকাংশ জঙ্গি গোষ্ঠীতে সম্পৃক্ত হচ্ছে। বাকিরা নানান অপরাধ করে বেড়ায়।
এ প্রসঙ্গে টেকনাফস্থ বিজিবি ২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোঃ ফয়সাল হাসান খাঁন জানান- ইয়াবা পাচাররোধে বিজিবির ৪টি চেকপোষ্ট, ১টি স্পেশাল ব্রাঞ্চ, ১২ বিওপির অধীনে ৩৩টি চৌকি রয়েছে। চলতি মাসে প্রায় ১৮ লাখ ইয়াবা আটক করতে সক্ষম হয়। মাদক পাচাররোধে সীমান্তজুড়ে বিজিবির টহল বাড়ানোসহ অব্যাহত রেখেছে।
বিজিবি এই কর্মকর্তা জানান, ইয়াবা আসে মিয়ানমার সীমান্ত থেকে। এসব ইয়াবার অধিকাংশ বাহককে আটক করা সম্ভব হয় না। কারণ তারা বিজিবি’র উপস্থিতি টের পেলেই নাফ নদীতে ঝাঁপ দেয়। পরে বাংলাদেশের সীমান্ত রেখা অতিক্রম করে চলে যায়।
টেকনাফ কোস্টগার্ড স্টেশন কমান্ডার জানান, কোস্টগার্ড নাফ নদীর মোহনা থেকে ২০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত টহল দেয়। নাফ নদী ও উপকূলের পুরো অংশ তারা কাভার করতে পারে না। অনেক অংশে বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন তারা।
টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ জানান, মাদকবিরোধী অভিযানের কারণে ১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী আত্মসর্মপণ করেছে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভূক্ত অনেক গডফাদার ইয়াবা ব্যবসায়ী বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। অনেক গডফাদারের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। পুলিশ নিয়মিত মাদক ব্যবসায়ীদের আটক করে যাচ্ছে। তবে অনেকেই পলাতক থাকায় আটক করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরো বলেন- ইয়াবার আগ্রাসন রোধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে আছে। কোনোভাবেই ইয়াবা পাচারকারী ও ব্যবসায়ীদের ছাড় দেয়া হবে না । তাদের আটক অভিযান অব্যহত হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ