টেকনাফে আমন ধানের বাম্পার ফলন, কৃষকের ঘরে ঘরে চলছে নবান্ন উৎসব

Helal News Pic
নুরুল হোসাইন ভূট্টো[]
সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে চলতি বছর আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূল থাকা, কৃষি কর্মকর্তাদের সঠিক পরামর্শ ও কোনো প্রকার ঝড়-জলোচ্ছাস না হওয়ায় চারদিকে আমনের সোনালি ক্ষেত আর ক্ষেত। আমনের এমন ফলনে কৃষকের মুখে হাসি দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক জায়গায় সোনালি ধান কাটাও আরম্ভ হয়েছে। আর ধান ঘরে তুলার পরই ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসবে মেতে উঠেছে কৃষক পরিবার। সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কৃষক পাকা ধান কেটে আটি বেঁধে নিয়ে আসছেন। কেউ কেউ মাড়াইয়ের কাজ করছেন। আবার অনেকে কোলা দিয়ে ধান পরিস্কারের কাজ করছেন। এসময় কথা হয়, নাটমোড়া পাড়া এলাকার কৃষক সোনা আলীর সাথে তিনি বলেন, এ বছর সুন্দর বর্ষা ও যথাসময়ে জমিতে সার দিতে পারায় ধানের ফলন আগের তুলনায় অনেক বেশী হয়েছে। বাংলার কৃষক সমাজ প্রাচিনকাল থেকে নবান্ন উৎসব পালন করে আসছে। কালের বিবর্তনে অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও কৃষকরা নবান্ন উৎসব পালন করতে ভুলে যায়নি আজও।
উপজেলা কৃষি অফিস সুত্র জানায়, এ বছর উপজেলার হোয়াইক্যংয়ে ৫হাজার ৯শ ২০ হেক্টর, হ্নীলায় ১৪শ ৮০ হেক্টর, টেকনাফ সদরে ১হাজার ৫০ হেক্টর, সাবরাংয়ে ১হাজার ৪০ হেক্টর, বাহারছড়ায় ১২শ ৮০ হেক্টর ও সেন্টমার্টিনে ৯০ হেক্টর সহ ১০হাজার ৮শ ২০ হেক্টর জমি চাষাবাদের আওতায় এসেছে। যা গত বছরের চেয়ে ৭শ হেক্টর বেশী জমিতে চাষ হয়েছে। তবে চলতি আমন মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০হাজার ১শ ২০ হেক্টর। মৎস্যঘের ও লবণাক্ত জমি ধান চাষের আওতায় আসায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭শ হেক্টর বেশী জমি চাষাবাদে এসেছে বলে কৃষি অফিস সুত্র জানায়। এ বছর ক্ষেতে ব্রি ধান-৩৩, ৩২, বি আর-১১, ব্রি ধান-৪৯, বিনা-৭, বিনা-৮, বিনা-১০ ও স্থানীয় জাত লেমবু, বিন্নি, লাল পাইজাম, ও কালা পাইজাম চাষ হয়েছে। তবে ব্রি-৩৩ ও হাইব্রিড জাতের ধান চাষে বেশী করতে দেখা গেছে। এ বছর বিনা ধান-৭ ও বিরি ধান-৩৩ সর্বোচ্চ বেশী ফলন হয়েছে। প্রতি হেক্টরে বিনা ধান-৭, ৪.৯ টন ধানে ৩.৯ টন চাল ও বিরি ধান-৩৩ প্রতি হেক্টরে ৫.৫ টন ধানে ৩.৭ টন চাল পড়ছে বলে উপজেলা কৃষি অফিস জানায়। অন্যদিকে আমন মৌসুমের শেষের দিকে কৃষকরা কাটবে বি.আর-১১, বি.আর-১২ ও স্থানীয় বিনি ধান। এসব ধানের প্রজাতের ক্ষেত সুন্দর হয়েছে।
উপজেলায় এবারে আমন ধানের লক্ষ্যমাত্রা ২৬হাজার ৩শ ৬০ মেট্টিক টন। সাধারণত আষাঢ়-শ্রাবণে কৃষকরা জমিতে চারা রোপন করে কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে পাকা ধান কাটে। সে হিসেবে চলতি কার্তিক মাসে কৃষকরা ধান কাটা শুরু করেছে। অন্য মৌসুমের তুলনায় এবছর কার্তিক মাসের শুরুতেই ধান কাটার রীতিমত ধুম পড়েছে। স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানাযায়, আগের তুলনায় ধানের ফলন ভালই হয়েছে। এবারে তারা ধান ক্ষেতে অতিরিক্ত পার্সিং করায় কম খরচে ধানের ভাল ফলন ঘরে তুলতে পারবে। পাশাপাশি এ পদ্ধতি অনুসরণ করায় পোকা মাকড় দমনে কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন না হওয়ায় বাড়তি খরচ হয়নি। এতে করে কৃষকের যেমনি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টেকনিক্যাল সহযোগীতায় লবণ মাঠে ধান চাষের উজ্জ্বল সম্ভবনাকে কাজে লাগিয়ে শত শত হেক্টর লবণ মাঠের পতিত জমিতে চাষাবাদ করে কৃষকের ভাগ্য বদলানো সম্ভব বলে অভিজ্ঞ কৃষকরা মনে করছেন । চলতি বছরে লবণ মাঠে ধানের ফলন ভাল দেখে আগামী সিজনে শত শত হেক্টর লবণ মাঠে বর্ষা মৌসুমে আমনের চারা রোপন করে চাষীরা অতিরিক্ত ধান ঘরে তুলতে এখন থেকে অনেকে উৎসাহ বোধ করছেন। গ্রাম বাংলায় কৃষকেরা নবান্ন উৎসব পরিপূর্ণভাবে উদযাপনের জন্য মেয়ে-জামাইসহ আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে আমন্ত্রণ করার পাশা-পাশি ধুম-ধামে চলছে নতুন চালের পোলাও, ভাপা পিঠা, ও পায়েসসহ রকমারী নিত্য নতুন খাবার তৈরির আয়োজন। গ্রাম্যবধুর জামাইকে সঙ্গে নিয়ে বাপের বাড়িতে নবান্ন উৎসব করার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করে। বাংলার মুসলিম কৃষক সমাজ অগ্রহায়নের প্রথম শুক্রবার থেকে নবান্ন উৎসব শুরু করে। এদিকে সনাতন সম্প্রদায় (হিন্দু) সমাজের কৃষকেরা তাদের পঞ্জিকা অনুসারে ১লা অগ্রহায়ন থেকে নবান্ন উৎসব পালন করে থাকে। এই নিয়মের ধারাবাহিকতায় কৃষকদের ঘরে ঘরে চলছে এখন ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসবের আমেজ। ========

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।