টেকনাফে ইয়াবার টাকা হুন্ডি করে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হুন্ডি জলিল তার দুই ছেলে

10685521_1397723673805508_5531617777781796474_n
টেকনাফ টুডে থেকে সংগৃহিত []
টেকনাফের হুন্ডি স¤্রাট মিয়ানমার নাগরিক আব্দুল জলিল হুন্ডি ও ইয়াবা ব্যবসার মাধ্যমে শত কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার রহস্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। পৌর এলাকার লামার বাজার এলাকায় বসে প্রকাশ্যে মিয়ানমারের সাথে আবার ঢাক-টেকনাফের মধ্যে ইয়াবা ব্যবসার লেনদেনের সমস্ত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করে এবং ইয়াবা ব্যবসা করে বিপুল অর্থ বৈভবের মালিক হলেও রহস্যজনক কারনে এতোদিন অধরাই থেকে গিয়েছিল সে। কিন্তু গত মঙ্গলবার টেকনাফে পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধের পর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় অস্ত্র-ইয়াবা-প্রাইভেট কার ও ৩ সহযোগীসহ জলিলের ছেলে ইসমাঈল আটক হওয়ার পরে সর্বত্র তোলপাড় শুরু হয়েছে। বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে তার হুন্ডি ও ইয়াবা ব্যবসার অনেক গোপন তথ্য।
জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে কোন অদৃশ্য শক্তির বলে মিয়ানমার নাগরিক হুন্ডি জলিল এতোদিন ধরে প্রশাসনের প্রান কেন্দ্রে বসে এভাবে ইয়াবা, হুন্ডিসহ সব ধরনের অবৈধ কর্মকান্ড চালিয়ে আসছিল।10389180_1397723820472160_4599361943989122420_n

বাংলাদেশে আগমন ও হুন্ডি ব্যবসার নিয়ন্ত্রক ঃ জানা যায়, মিয়ানমার মংডু থানার মংনী পাড়ার বাসিন্দা মৃত সুলতান আহমদের পুত্র আব্দুল জলিল ৮০ দশকের শুরুতে সীমান্ত অতিক্রম করে টেকনাফের লামার বাজার এলাকায় মিয়ানমার নাগরিক বাইট্যা ছালেহর আশ্রয় নেয়। এই বাইট্যা ছালেহ ছিল মিয়ানমার বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপের নেতা সে টেকনাফে মিয়ানমারের সাথে হুন্ডি ব্যবসা পরিচালনা করতো। এই বাইট্যা ছালেহর আশ্রয়ে থেকে জলিল তার মেয়ে জাহেদাকে বিয়ে করে হুন্ডি ব্যবসায় দিক্ষা নেই। পরবর্তীতে এই সিন্ডিকেটের হুন্ডি ব্যবসার প্রসার ঘটাতে জামাতা আব্দুল জলিলকে সৌদিআরব প্রেরন করে তার শ্বাশুর। সৌদিআরবে প্রায় বছর পাঁেচক অবস্থান করে জলিল হুন্ডি ব্যবসার আন্তর্জাতিক চক্রের সাথে নিজেদের সম্পর্ক পাকাপোক্ত করে বাংলাদেশে ফেরত আসে এবং লামার বাজার এলাকায় বাইট্যা ছালেহর বাড়িতে বসে হুন্ডি ব্যবসা পরিচালনা করতে থাকে। এভাবে চলার পর দুই হাজার সালের দিকে শুরু হয় টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার চোরাচালান। ইত্যবসরে তার শ্বাশুর বাইট্যা ছালেহ মৃত্যুবরন করে। তার মৃত্যুর পর হুন্ডি ব্যবসার একর নিয়ন্ত্রণ চলে আসে জলিলের হাতে। এসময় সে লামার বাজার এলাকায় একটি পুরোনো কাপড়ের ব্যবসার আড়ালে নিরাপদে হুন্ডি ব্যবসা চালাতে থাকে। আর ঠিক তখনই বাড়তে থাকে ইয়াবা পাচার আর হুন্ডি ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে জলিলের। এভাবে টেকনাফ সীমান্তে চলা হাজার কোটি টাকার রমরমা ইয়াবা বানিজ্যের অর্থের লেনদেন চলতে থাকে জলিলের হুন্ডির মাধ্যমে। দীর্ঘ এক যুগ প্রশাসনের নাকের ডগায় অবস্থান করে নিরাপদে হাজার কোটি টাকার ইয়াবার টাকা হুন্ডি করে কামিয়ে নেয় সে শত কোটি টাকা। টেকনাফে প্রচলিত আছে টেকনাফের সব ব্যাংকে যত নগদ টাকা আছে জলিলের একজনের তার চেয়ে বেশি টাকা জমা আছে। তাই এইসময় সে ইয়াবা ব্যাংক হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।10576912_1397723847138824_4103230223827355805_n

হুন্ডি থেকে ইয়াবা স¤্রাট জলিলের ছেলে ইসমাঈল ঃ জলিল যখন হুন্ডির মাধ্যমে কোটি টাকা আয় করতে থাকে এসময় সে ব্যবসায় সম্পৃক্ত করে তার দুই ছেলে ইসমাঈল ও ইয়াছিনকে। তার দুই ছেলে হুন্ডির সাথে সাথে আরও বেশি অর্থের লোভে জড়িয়ে পড়ে ইয়াবা ব্যবসায়। একসময় শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীতে পরিনত হয় তার ছেলে ইসমাঈল। এই ইসমাঈল গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধের পর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় অস্ত্র-ইয়াবা-বিলাসবহুল কার ও ৩ সহযোগীসহ হোয়াইক্যং পুলিশের হাতে আটক হয়। সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের করা তালিকায় তার নাম রয়েছে।

জলিলের হুন্ডি ব্যবসার সহায়তায় বেসরকারী ব্যাংক গুলো ঃ জলিলের হুন্ডি ব্যবসায় দীর্ঘ দিন ধরে সহায়তা দিয়ে এসেছে টেকনাফের তিনটি প্রাইভেট ব্যাংক। এসব ব্যাংকের প্রত্যেকটিতে একাধিক একাউন্ট ব্যবহার করে প্রতিদিন হুন্ডির কোটি টাকা উত্তোলন করতো জলিল ও তার ছেলেরা। অথচ সামান্য পুরোনো কাপড়ের ব্যবসায়ীর কোটি টাকার লেনদেনের ব্যাপারে সরকারী বিধি নিষেধ থাকলেও এক্ষেত্রে ব্যাংক গুলোর কোন প্রশ্ন ছিলনা। এসব ব্যাংক গুলোতে ছিল তাদের ভিআইপি মর্যাদা। জানা গেছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক গুলো জেনে শুনেই তাদের নিজেদের স্বার্থে দেশের জন্য ক্ষতিকর হুন্ডি ও ইয়াবার অবৈধ লেনদেনে সহায়তা দিয়ে আসছিল।10245530_1397723907138818_6247317128170370735_n

ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হওয়া ঃ ২০০৭ সালে তৈরী করা জাতীয় পরিচয় পত্র ও ভোটার তালিকায় কৌশলে অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায় জলিল ও তার স্ত্রী জাহেদা। জানা যায়, একটি প্রভাবশালী মহলের সহযোগীতায় মোটা অংকের বিনিময়ে ভোটার তালিকাভূক্ত হয় তারা। জানা যায়, রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সদস্যরা এসময় ভোটার অন্তভূক্তির জন্য লাইনে দাড়ালে তাকে রোহিঙ্গা হিসাবে চিহ্নিত করে তাকে উত্তম মধ্যম দিয়ে লাইন থেকে বের করে দেয়। পরে গোপনে সে তালিকাভূক্ত হয়ে যায়। এব্যাপারে রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মোজাম্মেল হক জানান, স্বাধীনতার পর ৮০ দশকে মিয়ানমার থেকে টেকনাফে আসা জলিলকে অনেক চেষ্টা করেও ভোটার হওয়া থেকে বাদ দিতে পারিনি আমরা। এমনকি পরবর্তী সময়ে তার স্ত্রীসহ ৬৩ জনের নামে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেও কাজ হয়নি। বরাবরের মতো প্রভাবশালী মহলের সার্টিফিকেটে টিকে যায় তারা।

তার সম্পদের বিবরন ঃ টেকনাফ পৌর সভার লামার বাজার এলাকায় জলিলের মালিকানাধীন জমিতে মদিনা টাওয়ার নামে একটি অত্যাধুনিক বহুতল ভবনের নির্মাণ শেষের পথে। এছাড়া লামার বাজার এলাকায় আরো ২০টির মতো দোকানঘর রয়েছে তার। পৌর এলাকার শীলবুনিয়া পাড়া এলাকায় মসজিদের সামনে জমিসহ ভাড়াঘর। ডেইল পাড়া, হাবির পাড়া, মৌলভী পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকয় প্রচুর জমিজমা। চট্টগ্রামের সুগন্ধা ও ঢাকার বসুন্ধরাসহ বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় দামী ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া টেকনাফ মৌলভী পাড়ার অপর ইয়াবা গডফাদার একরাম ও আব্দুর রহমানের মালিকানাধীন মার্কেট দেড় কোটি টাকায় কিনে নেওয়ার কথাবার্তা চুড়ান্ত করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমান শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরবতা ঃ প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে হুন্ডি-ইয়াবার রমরমা কারবার চালিয়ে গেলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গুলো কখনো তার দিকে চোখ তুলেও তাকায়নি। বরং বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু সদস্যের তার পুরোনো কাপড়ের দোকানে নিত্য যাতায়াত ছিল চোখে পড়ার মতো। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে দীর্ঘ দিন ধরে জলিলের নিয়মিত মাসোহারা ভাগ পৌঁেছ যেত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু সদস্য থেকে রাজনৈতিক নেতা এমনকি একশ্রেনীর সংবাদকর্মীদের কাছেও। জলিল সবমহলকে ম্যানেজ করে নির্বিঘেœ কারবার চালিয়ে গেছেন বলে বিশ্বস্থ্য সূত্রে জানা গেছে।

ওসির বক্তব্য ঃ টেকনাফ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোক্তার হোসেন জানান, জলিলের অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করতো তার ছেলে ইসমাঈল। বেশ কিছুদিন সে গা ঢাকা দিয়ে ছিল। সম্প্রতি সে এলাকায় ফিরে আসলে পুলিশ তার উপর নজর রাখে। একপর্যায়ে সে ইয়াবা, অস্ত্রসহ তার ৩ সহযোগী নিয়ে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধের পর ধরা পড়ে।

জলিলের বক্তব্য ঃ হুন্ডি ও ইয়াবা ব্যবসায় সম্পৃক্ততা এবং কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের ব্যাপারে মুটোফোনে জলিলের কাছে জানতে চাইলে সে জানায়, সৌদিআরব অবস্থান করে সে অর্থোপার্জন করে সে টাকায় সম্পদ গড়েছেন। তবে কত টাকা প্রবাস থেকে এনেছেন তার কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।

ইয়াবার অর্থ পাচারে জড়িত হুন্ডি চক্রের আরো যারা ঃ জলিল-ইসমাঈল ছাড়াও ইয়াবা লেনদেনের শতকোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে যারা পাচার করছে তাদের মধ্যে রয়েছে, জালিয়া পাড়ার জাফর আলম প্রকাশ টিটি জাফর, এশিয়া এন্টারপ্রাইজের আব্দুল আমিন-নুরুল আমিন-নুর হাকিম, কুলাল পাড়ার শওকত আলী, বাজার পাড়ার বাট্টা আইয়ুব-ইউনুচ, কাদের-ভেক্ষু, হ্নীলার নির্মল ও চট্টগ্রামের নুর কামাল উল্লেখযোগ্য। এদের রয়েছে মিয়ানমার-বাংলাদেশ-সিংগাপুর-দুবাই-সৌদিআরব ভিত্তিক নেটওয়ার্ক।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।