টেকনাফে হাতুড়ে ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় মা’র গর্ভে সন্তানের মৃত্যু


টেকনাফে এক পল্লী চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় মায়ের গর্ভেই সন্তানের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপে।
জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার বিকালে শাহপরীর দ্বীপ মাঝের পাড়া গ্রামের রহিম উল্লাহ’র ছয় মাসের অন্তঃস্বত্বা স্ত্রী রাবেয়া বেগমের শারিরীক অসুস্থতা বোধ করলে স্থানীয় তিন রাস্তার মাথা বাজারের পল্লী চিকিৎসক শংকর শর্মার শরণাপন্ন হন। উক্ত চিকিৎসক তাকে তড়িৎ চিকিৎসা দিয়ে বিদায় করেন।
অন্তঃস্বত্বা রাবেয়া বেগমের পিতা মোহাম্মদ হোছন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার গর্ভবতী মেয়ে হঠাৎ অসুস্থতা বোধ করলে তাকে পল্লী চিকিৎসক শংকর শর্মার কাছে নিয়ে যায় এবং চিকিৎসককে রোগীর ছ’মাসের গর্ভবতী হওয়ার বিষয়টিও অবগত করি। পল্লী চিকিৎসক রোগী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বার বিষয়টি জানার পরও তাকে একটি ইনজেকশন ও দুটি স্যালাইন পুশ্ করেন। তবে তিনি আমাদের কোন প্রেসক্রিপশন দেননি, স্যালাইন এবং ইনজেকশনের প্যাকেটগুলো আমাদের হাতে আছে। উক্ত চিকিৎসকের চিকিৎসা শেষ হওয়া মাত্র রোগীর শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি ঘটে এবং গর্ভে বাচ্চা মাত্রাতিরিক্ত হারে নড়ছড়া শুরু করলে মায়ের অবস্থাও খারাপের দিকে যায়। বিষয়টি পল্লী চিকিৎসক শংকর শর্মাকে জানালে তিনি আমাদের ডাকে আর সাড়া দেননি। পরবর্তীতে আমরা রোগী নিয়ে টেকনাফ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে দীর্ঘক্ষণ চিকিৎসা শেষে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা গর্ভে সন্তানের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং মায়ের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ধাত্রীর মাধ্যমে মৃত বাচ্চাটি বের করা হয়।’
এদিকে রোগীর কাছে পল্লী চিকিৎসক কোন প্রেসক্রিপশন না দিলেও ধারণা করা হচ্ছে, তিনি হয় গর্ভবস্থায় সেবন বা প্রয়োগ নিষিদ্ধ কোন ওষুধ রোগীকে দিয়েছেন যার কারণে গর্ভে ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় সন্তানের মৃত্যু ঘটেছে। তবে রোগীর স্বজনরা জানিয়েছেন, ইনজেকশন ও স্যালাইনের মোড়ক তাদের বাড়িতে রয়েছে। তারা তাদের হাতে থাকা প্রমাণগুলো সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের কাছে দাখিল করবেন।
বিষয়টি অভিযুক্ত পল্লী চিকিৎসক শংকর শর্মার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কোন বক্তব্য না দিয়ে এড়িয়ে যান এবং এব্যাপারে তিনি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। এর আগেও শাহপরীর দ্বীপে হাতুড়ে ডাক্তারদের হাতে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর একাধিক ঘটনা ঘটেছিল বলে জানা যায়।
এব্যাপারে টেকনাফ হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার এনামুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘ আজকে (শুক্রবার) শাহপরীর দ্বীপ থেকে একজন গর্ভবর্তী মহিলা এসেছিল। আমরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে পাই ততক্ষণে মায়ের গর্ভে বাচ্চার মৃত্যু হয়েছে। পরে মাকে বাঁচানো সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যহত রেখে চিকিৎসা প্রদান করা হয়।’
শাহপরীর দ্বীপে পল্লী চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় গর্ভে সন্তানের মৃত্যু হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি আজকের দেশবিদেশকে জানান, ‘রোগী গ্রামে কোন ধরনের চিকিৎসা নিয়েছেন বা প্রেসক্রিপশন আমাদের দেখায়নি। তবে আমরা এতটুকু নিশ্চিত যে, তারা আমাদের কাছে যতক্ষণে পৌছেছেন ততক্ষণে মায়ের গর্ভে বাচ্চা মারা গেছে। তবে পল্লী চিকিৎসক যদি সত্যি ভুল চিকিৎসা করে থাকেন এবং ভুক্তভোগীরা যদি এর প্রতিকার চান তবে তিনি কতৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে পারেন।’
তিনি আরো বলেন, টেকনাফের বিভিন্ন গ্রামে কতিপয় অনভিজ্ঞ পল্লী চিকিৎসক হরহামেশা রোগীদের ভুল চিকিৎসা দিয়ে থাকেন যা পরবর্তী রোগীর স্বাস্থ্যের অবস্থার মারাত্মক অবনতিসহ মৃত্যু হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে পল্লী চিকিৎসকদের নিজেদের সীমা অতিক্রম করা মোটেও উচিত নয়।
এদিকে প্রত্যন্ত জনপদ শাহপরীর দ্বীপে পল্লী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়। অনেকে প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা স্বত্বেও এই গ্রামে বছরের পর বছর ডাক্তারি পেশা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিরক্ষর কোন রোগী তাদের শরণাপন্ন হলে প্রয়োজন অতিরিক্ত ওষুধ দিয়ে রোগীর কাছ থেকে বেশি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সামান্য স্বর্দিজ্বরেও এখানকার পল্লী চিকিৎসকরা বিনা প্রয়োজনে রোগীকে এ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ সেবন সহ ইনজেকশন চালিয়ে দেন। পল্লী চিকিৎসকের বেশির ভাগই নিজেরা ফার্মেসীর মালিক হওয়ায় নিজেদের ফার্মেসীতে রাখা সরকার অনুমোদনহীন ও মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ নিরক্ষর রোগীদের কাছে বিক্রি করেন। এক কথায় শাহপরীর দ্বীপের কতিপয় পল্লী চিকিৎসকের চিকিৎসা বাণিজ্য ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে এবং নিজেরা লাগামহীন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা জানান, এ অবস্থার অবসান হওয়া দরকার।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।