‘নারীর পেশা হিসেবে ফুটবল এখনও অস্পষ্ট’

চলছে ফুটবল উন্মাদনা। উন্মাদনার উল্টো পিঠে যেন নিভৃতে কাঁদে দেশের ফুটবল, বিশেষ করে নারী ফুটবল। ফিফা বিশ্বকাপ ও দেশের নারী ফুটবলের বিভিন্ন দিক নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন জাতীয় নারী ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় ও প্রথম নারী প্রশিক্ষক রেহানা পারভীন।

প্রশ্ন: দেশের নারী ফুটবলে আপনারা অগ্রগামী। খুব কাছ থেকে নারী ফুটবলকে জানেন। বর্তমানে নারী ফুটবলের অবস্থা কেমন দেখছেন?

রেহানা পারভীন: দেশের ফুটবলে ছেলেদের মান কী রকম তা মোটামুটি সবারই জানা। তবে ইদানিং মেয়েরা ভালো করছে, এটা আশাব্যঞ্জক। আমাদের হাত ধরে দেশে নারী ফুটবলের যাত্রা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে মাঠে নামতে হয়েছে আমাদের। তাই আজ যখন মেয়েদের সাফল্যের কথা শুনি তখন গর্বিত হই। তবে একটা দুঃখ থেকে যাচ্ছে। জাতীয় দল ভালো হচ্ছে না। অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়গুলোতে আমাদের ফল সেরা। কিন্তু জাতীয় দলের ফল হতাশাজনক।

প্রশ্ন: জাতীয় দল ভালো করছে না কেন?

রেহানা পারভীন: জাতীয় পর্যায়ে কোনো লিগ হচ্ছে না, জেলায় জেলায় লিগ হচ্ছে না। ফলে খেলোয়াড়দের ভালোভাবে অনুশীলন হচ্ছে না। লিগ ছাড়া জাতীয় দলের সাফল্য অসম্ভব।

প্রশ্ন: ময়মনসিংহের একটি গ্রামের মেয়েদের সাফল্যের কথা এখন সবার মুখে মুখে। গ্রাম থেকে যেভাবে মেয়েরা উঠে আসছে শহরের উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েরা সেভাবে ফুটবলে আসছে না কেন?

রেহানা পারভীন: ফুটবলের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের একটি মহৎ উদ্যোগ বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট। এ টুর্নামেন্টের ফলে গ্রামের স্কুলগুলো থেকে সম্ভাবনাময় মেয়েরা উঠে আসছে। তবে এ টুর্নামেন্টে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলো খুব কম অংশগ্রহণ করে। ফলে শহরের উচ্চবিত্ত সমাজ থেকে ফুটবলে মেয়েরা কম আসছে।

প্রশ্ন: নারীর পেশা হিসেবে ফুটবল এখন কতটুকু দৃশ্যমান?

রেহানা পারভীন: এখনও অস্পষ্ট। মেয়েরা আসছে, কিছুদিন খেলছে, তারপর হারিয়ে যাচ্ছে। ফেডারেশন উপযুক্ত ট্রেনিং দিয়ে তাদের ধরে রাখছে না। সবচেয়ে বড় সমস্যা- এখনও মেয়েদের বেতন-ভাতা ন্যূনতম। মেয়েদের জন্য কোনো ক্লাব লিগ নেই। একটা ছেলে ফুটবলার যেমন ক্লাবের হয়ে লিগ খেলে ৫০-৬০ লাখ টাকা আয় করছে, মেয়েদের ক্ষেত্রে সে সুযোগ শূন্য। তাই মেয়েদের ক্লাব লিগ চালু হওয়া জরুরি। এটি চালু হলে অনেক মেয়েই পেশা হিসেবে ফুটবলকে বেছে নেবে।

প্রশ্ন: দেশের পুরুষ ও নারী ফুটবলের উন্নয়নে বর্তমানে কোন পদক্ষেপগুলো জরুরি বলে মনে করেন?

রেহানা পারভীন: সবার আগে দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা। একটা টাইমফ্রেম ঠিক করে পরিকল্পনা অনুযায়ী আগানো দরকার। জাতীয় পর্যায়ে জরুরি ভিত্তিতে লিগ চালু করতে হবে। এছাড়া ভালো কোচ এবং ভালো সংগঠকও দরকার।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ থেকে মেয়েরা না ছেলেরা আগে ফিফা বিশ্বকাপে খেলতে পারবে বলে মনে করেন?

রেহানা পারভীন: ছেলে বা মেয়ে আলাদা করে বলাটা কঠিন। তবে আমরা আশাবাদী আমাদের ছেলে এবং মেয়ে দু’দলই একদিন ফিফা বিশ্বকাপে খেলবে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক বেশি কেন?

রেহানা পারভীন: যে দল ভালো খেলবে সে দলের সমর্থক পৃথিবীজুড়ে বেশি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ঐতিহ্যগতভাবে নান্দনিক ফুটবল খেলে। তাছাড়া ব্রাজিলের পেলের মতো নামকরা খেলোয়াড় ছিল, তাকে তো ফুটবলের জাদুকরই বলা হয়। সে কারণে ব্রাজিলের সমর্থক বেশি। আর্জেন্টিনার নামের সঙ্গে ম্যারাডোনার নাম সমানভাবে উচ্চারিত হয়। ম্যারাডোনার কারণে আর্জেন্টিনার সমর্থক বেশি।

প্রশ্ন: ফুটবলে এশিয়ার কোনো দেশ জনপ্রিয় নয় কেন?

রেহানা পারভীন: খেলাধুলাকে ভৌগোলিকভাবে সীমাবদ্ধ করে ফেলা ঠিক নয়। তবে এটা ঠিক ফুটবলে লাতিন ও ইউরোপের দেশগুলো ভালো এবং জনপ্রিয়। এশিয়ার কোনো দেশ এখন পর্যন্ত ফুটবলে নজরকাড়া নৈপুণ্য দেখাতে পারেনি। তাই হয়তো জনপ্রিয়তা পায়নি সেভাবে।

প্রশ্ন: ফুটবলের সঙ্গে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কোনো সম্পর্ক আছে কি-না?

রেহানা পারভীন: ফুটবল সর্বজনীন এবং বন্ধুত্বসুলভ খেলা। এখানে রাজনীতি জড়িত থাকলে বিশ্বের পরাশক্তির দেশগুলো এগিয়ে থাকতো। ফুটবল খেলাটা মাঠে হয়, মাঠে একজন খেলোয়াড় কেমন খেলছে সেটাই এখানে মুখ্য। রাজনীতি বা অর্থনীতি গৌণ।

প্রশ্ন: যদি ফুটবলের সাথে অর্থনীতির কোনো সম্পর্ক নাই থাকে তাহলে গরীব দেশগুলো ফুটবলে ভালো করতে পারছে না কেন?

রেহানা পারভীন: খেলায় কোনো ভেদাভেদ থাকে না। একজন খেলোয়াড় যখন জার্সি পরে মাঠে নামে তখন তার পরিচয় সে একজন খেলোয়াড়, সে গরীব না ধনী সেটা মুখ্য নয়। ফুটবলে মেধা আর অনুশীলন জরুরি। যারা মেধা খাটিয়ে অনুশীলন করছে সেসব দেশই ভালো করছে, সে সঙ্গে সরকারের সহযোগিতা ও ফুটবল উপযোগী কাঠামোও দরকার।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।