প্রকৃতির রূপে রাঙা টেকনাফ সেন্টমার্টিন : অবকাঠামো না থাকায় পায়নি পর্যটন শহরের মর্যাদা

-teknaf-pic- sanmatiom -71মুহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান : ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ও সম্ভাবনায় ভরপুর সাগর-নদী-পাহাড় ঘেরা সীমান্ত শহর টেকনাফ এবং দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন স্বাধীনতার পর ৪৩ বছরেও আধুনিক ও পরিকল্পিত পর্যটন শহর হিসেবে গড়ে ওঠেনি। অথচ পরিকল্পিত উপায়ে আধুনিক পর্যটন শহর হিসেবে গড়ে তোলা হলে তা শুধু দেশে নয়, গোটা দুনিয়া জুড়ে খ্যাতি পাবে। কারণ সাগর-নদী-পাহাড়-সমুদ্র সৈকত- প্রবালদ্বীপ ও অপার সম্ভাবনা আর প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সব কিছুর সমন্বয়ে এমন পর্যটন অঞ্চল বিশ্বে কমই আছে। তবে দেরিতে হলেও সরকার পরিকল্পিত পর্যটন নগরী হিসাবে গড়ে তুলতে সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার একর জমি নিয়ে মাস্টারপ্ল্যানের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। জানা গেছে, প্রস্তাবিত মাস্টারপ্ল্যান কিছুটা কাটছাঁট করে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে সরকার। এদিকে মাস্টারপ্ল্যানের কাজ শুরুর পর থেকেই দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা কক্সবাজারে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে ধীরে চলো নীতিগ্রহণ করেছিলেন। যতদিন পর্যন্ত মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদিত হবে না, ততদিন তারা ঝুঁকি নিতে চাননি। মাস্টারপ্ল্যানে কোথায় কী হবে, কী করা যাবে, আর কী করা যাবে না- এমন সব বাধ্যবাধকতার কারণেই মূলত এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। এখন মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে স্থানীয় প্রশাসন এবং দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তারা। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের শহর কক্সবাজার ও দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটন শিল্পের প্রসার শুরু হয় মূলত কয়েক যুগ আগে থেকেই। বিপুলসংখ্যক পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত কক্সবাজার, টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে দেখা দেয় আবাসন, বিনোদনসহ নানা সংকট। আর এই সুযোগে পর্যটকদের সুবিধা দিতে কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত গড়ে উঠেছে শত শত বহুতল ভবন। গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে কক্সবাজারের সাগরকে হোটেল-মোটেল জোন ঘোষণা করে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। সেখানে এখন গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক অট্টালিকা। হোটেল-মোটেল জোনের পূর্ব পাশে এখন শতাধিক গেস্ট হাউস বাণিজ্যিকভাবে হোটেল ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এর পরিধি বেড়ে কক্সবাজার শহর ছেড়ে বিস্তীর্ণ সৈকত হয়ে ঠেকেছে দেশের শেষ সীমানা সেন্টমার্টিন পর্যন্ত। পর্যটন শিল্পের অংশ হিসেবে গড়ে উঠেছে শত শত অট্টালিকা। রাজধানী ঢাকায় যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাঁচ তারকামানের হোটেল নেই, সেখানে কক্সবাজারেই গড়ে উঠেছে প্রায় এক ডজন পাঁচ তারকামানের হোটেল। নির্মিত হচ্ছে আরো বেশ কয়েকটি হোটেল। এছাড়া স্টুডিও টাইপ তিন তারকা ও পাঁচ তারকামানের অ্যাপার্টমেন্টও রয়েছে অর্ধশতাধিক। এসব নির্মাণে কক্সবাজারে বর্তমানে অর্ধশতাধিক ডেভেলপার কোম্পানি কাজ করছে বলে জানা গেছে। এসব প্রকল্পে দেশ-বিদেশের ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করেছেন হাজার হাজার কোটি টাকা। ফলে কক্সবাজার একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপ নিতে যাচ্ছে। কিন্তু সরকারিভাবে কোন ধরনের মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় পুরো কক্সবাজারই অপরিকল্পিত নগরায়নে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে কক্সবাজারবাসী ও বিনিয়োগকারীদের দাবি ছিল পুরো কক্সবাজারকে একটি মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আনা। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারের পক্ষে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর ও বেসরকারি সংস্থা শেলটেক কনসালট্যান্ট যৌথভাবে মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নেয়। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর কাজ করার পর ২০১১ সালের ১১ মে নগর উন্নয়ন অধিদফতর মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া প্রকাশ কর। ‘প্রিপারেশন অব ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান অব কক্সবাজার টাউন অ্যান্ড সি-বিচ আপ টু টেকনাফ’ নামক প্রকল্পের আওতায় এই খসড়া পরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) তৈরি করা হয়।
দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের সাগরের তলদেশে রয়েছে মনোমুগ্ধকর বিচিত্র প্রাণী ও হরেক রকম জীব। রয়েছে নানান আকারের পাথরের স্তুপ, দুর্লভ প্রবাল, পাথরের ফুল। সাগরের জলরাশি ও সৌন্দর্যে ভরা বিচিত্র জীব-প্রাণী যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের। সাগরের তলদেশে এসব বিচিত্র জীব অবাক হওয়ার মতো, দেখলে মনে হবে সাগরের তলদেশে রয়েছে ¯্রষ্টার সৃষ্টির রহস্যময় এক জগত। গবেষকদের মতে- সেন্টমার্টিনের উপরের অংশে যে সৌন্দর্য রয়েছে তার বহুগুণ মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য পড়ে রয়েছে সাগর তলদেশে। উপরে সাগরের সুনীল জলরাশি আর নারিকেল গাছের ছায়ায় ঢাকা বিস্তীর্ণ সাদা বালুকাবেলার চেয়েও সুন্দর এক জগত পড়ে আছে পানির নিচে। এখানে রয়েছে কোরালের পাশাপাশি ছোট ছোট জীব, যা সাগরের তলদেশে তৈরি করে বিচিত্র ধরনের বাসা। কোমর পানির নিচে ডুব দিলে দেখা মেলে বিচিত্র কোরাল ও নানা ধরনের মাছ ও শৈবালের। এছাড়া সাগরের গভীরে রয়েছে বিশাল বিশাল বিচিত্র পাথর ও প্রবালের স্তুপ। সেন্টমার্টিনের ছেড়াদ্বিয়া (স্থানীয় ভাষায়-চিরাদিয়া) ভ্রমণ করে এসব সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন যে কোন পর্যটক। সেন্টমার্টিন দ্বীপের ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব নুরুল আমিন জানান, দ্বীপের মানুষ সবসময় পর্যটকবান্ধব। পর্যটন মৌসুমে যাতে দেশী-বিদেশী পর্যটক শিক্ষার্থীরা নিরাপদে দ্বীপে ভ্রমণ করতে পারেন সেজন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সবপ্রস্তুতি নেয়া হয়। পর্যটক আগমনকে ঘিরে অপরূপ সাজে সাজানো হয় সমুদ্র সৈকত, জেটি ও দ্বীপের বিভিন্ন প্রাকৃতিক স্পটগুলো। তিনি আরো বলেন, “অপূর্ব সুন্দর স্থান সেন্টমার্টিন দ্বীপ, স্বচ্ছ নীল পানিতে ঘেরা এই দ্বীপের মানুষও অসম্ভব ভালো। চুরি ডাকাতির রেকর্ড নেই। সারারাত ঘুরতে পারা যায় নির্ভয়ে-নির্জনে। বিশেষত চাঁদনী রাতে দ্বীপের অপরূপ সৌন্দর্য কেবল উপভোগ, অবলোকন ও হৃদয়ঙ্গম করা যায় যা লিখে বা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।