প্রত্যাবাসন নিয়ে আবারও মিথ্যাচার করছে মিয়ানমার?

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৭ লাখেরও বেশি মানুষ। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। পরে গত ৬ জুন নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে এখন পর্যন্ত প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেওয়ার সুনিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ বলছে, এখন পর্যন্ত কোনও রোহিঙ্গাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরিয়ে নেয়নি মিয়ানমার। বৃহস্পতিবার (১১ অক্টোবর) মিয়ানমারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের দাফতরিক ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়, বুধবার একটি পরিবার রাখাইনে ফিরেছে। রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয় আড়াল করে পাঁচ সদস্যের ওই পরিবারকে ‘বাস্তুচ্যুত’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। গ্লোবাল নিউ লাইটস অব মিয়ানমার সূত্রে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পাঁচ সদস্যের একটি বাস্তুচ্যুত পরিবার ১০ অক্টোবর রাখাইনের মংতো জেলার তং পিয়ো লেতওয়ে অভ্যর্থনা কেন্দ্রে ফিরেছে।
প্রত্যাবাসন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, রাখাইনে ফিরতে চাওয়া রোহিঙ্গাদের যাচাইবাছাই শেষে তাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা। দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নাগরিকত্বের আবেদন করতে রোহিঙ্গাদেরকে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) সরবরাহ করার কথা রয়েছে। গ্লোবাল নিউ লাইটস অব মিয়ানমার-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি থেকে ফিরে আসাদের মধ্যে যারা ভেরিফাইড তাদেরকে গ্রহণে প্রস্তুত রয়েছে মিয়ানমার। প্রশাসন বিভাগের উপ-পরিচালক উ সোয়ে তুন এবং অভিবাসন ও জনসংখ্যাবিষয়ক বিভাগের উপ-পরিচালক উ থান্ত জিন ৪৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ ইতনু ও তার পরিবারের সদস্যদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। কর্তৃপক্ষ তাদের জন্য ই-আইডি নিবন্ধন প্রক্রিয়াও পরিচালনা করেছে। এদের মধ্যে যারা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে চায় তাদের জন্য ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) এর জন্য আবেদনপত্র ইস্যু করেছে অভিবাসন ও জনসংখ্যাবিষয়ক বিভাগ।
বাংলাদেশ ওই রোহিঙ্গা পরিবারের ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে অবগত নয়। কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেছেন, একটি রোহিঙ্গা পরিবার ফেরত গেছে বলে শোনা গেছে, তবে তাদের পৌঁছানোর ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানা যায়নি। তিনি আরও বলেন, ‘কেউ চাইলে ফিরে যেতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।’
বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী দিনে ১৫০ রোহিঙ্গাকে গ্রহণ করার কথা ছিল মিয়ানমারের। এজন্য ট্রানজিট ক্যাম্পও বানিয়েছে মিয়ানমার। তবে গত জুনে এএফপির এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেশিরভাগ সময়ই খালি পড়ে থাকে ক্যাম্পগুলো। মিয়ানমারের অভিবাসন কর্মকর্তারা কাগজপত্র নিয়ে এই ট্রানজিট ক্যাম্পে অপেক্ষা করেন। প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করেন সাংবাদিকরা। কেবল রোহিঙ্গাদের দেখা মেলে না সেখানে। মিয়ানমারের অভিবাসন বিষয়ক কর্মকর্তা উইন খাইং সে সময় বলেছিলেন, ‘জানুয়ারি থেকেই আমরা তাদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত।’ তবে এএফপি তাদের অনুসন্ধানে জানিয়েছিল, রোহিঙ্গারাও নিরাপত্তার অভাবে মিয়ানমারে ফিরতে রাজি হচ্ছেন না। মিয়ানমারও নিরাপত্তা নিশ্চিতের শক্তিশালী কোনও আশ্বাস দিতে পারছে না।
কেবল অভিবাসন কর্মকর্তা নয়, স্বয়ং মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চিও শুরু থেকেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বিলম্ব নিয়ে বাংলাদেশের ওপর দোষ চাপিয়ে আসছেন। ১ আগস্ট সিঙ্গাপুরে এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকেই প্রত্যাবাসনকারীদের ফিরিয়ে দিতে হবে। আমরা কেবল সীমান্তে তাদের স্বাগত জানাতে পারি।’ সেপ্টেম্বরে ভিয়েতনামে তিনি দাবি করেন,‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ২৩ জানুয়ারি শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে সে সময় বাংলাদেশ জানায়, তারা এখনও প্রস্তুত নয়। ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর আমরা সমঝোতা স্বাক্ষর করেছিলাম। চুক্তিতে যেহেতু দুই দেশ সম্পর্কিত, তাই কখন প্রত্যাবর্তন শুরু হবে সে বিষয়ে আমরা একা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।’ তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন আর মানবাধিকার সংগঠনের অনুসন্ধানে ‘প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া’র কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে মিয়ানমারের অনিচ্ছার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। ধরা পড়েছে এ নিয়ে তাদের মিথ্যাচার।
এপ্রিলে মিয়ানমার দাবি করে ৫ সদস্যের একটি রোহিঙ্গা পরিবারকে রাখাইনে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরে তা ভুয়া বলে প্রমাণিত হলে সমালোচিত হয়। জানা যায়, ওই পরিবার বাফার জোন বলে পরিচিত মিয়ানমারের অংশ থেকেই ফিরে এসেছিল। এরপরও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ওই পরিবারের সীমান্তের কাছে দাঁড়ানো বড় কয়েকটি ছবি দিয়ে একটি বিলবোর্ড টানিয়েছে। তাতে লেখা রয়েছে, ছবিতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। সবশেষ বুধবারের (১০ অক্টোবর) ‘ফিরে যাওয়া’ রোহিঙ্গা পরিবারটিকে নিয়ে ক্যাম্প নেতা আব্দুর রহিম এএফপিকে বলেছেন, কক্সবাজারের বালুখালি শিবিরে থাকতো পরিবারটি। তারা মংডুর কাছে তাদের বাড়িতে ফিরেছে।’ গ্লোবাল নিউ লাইটস-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় তাদেরকে খাবার ও রান্না-সরঞ্জাসসহ বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করেছে। তং পিয়ো লেতওয়ে অভ্যর্থনা কেন্দ্রের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ ফিরে আসা ব্যক্তিদেরকে হ্লা ফো খাউং ক্যাম্পে হস্তান্তর করবে।
মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের দাবি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশে অবৈধভাবে পালিয়ে যাওয়া বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, নৌকায় করে বাংলাদেশ পালিয়ে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনায় পড়ে যারা মিয়ানমারের অংশে আটক হয় তাদের ট্রানজিট ক্যাম্পের মাধ্যমে স্বজনদের কাছে পাঠানো হয়েছে। জুনে সাংবাদিকদের সামনে ৯জন রোহিঙ্গা হাজির করা হয়। দাবি করা হয়, অবৈধভাবে মিয়ানমারে ফিরে আসার চেষ্টা করায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। মুক্তির পর তাদের ট্রানজিট ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের এই দাবি ভুয়া বলে প্রতীয়মান হয়। এই ৯ রোহিঙ্গার কয়েকজন জানান তারা কখনোই বাংলাদেশ যাননি এবং মিয়ানমারের কারাগার থেকে ক্যাম্পে তাদের প্রত্যাবাসন হয়েছে।
চলতি বছর আগস্ট মাসে এইচআরডব্লিউ তাদের প্রতিবেদনে ৬ রোহিঙ্গার প্রসঙ্গ তুলে এনেছে যারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর আবারও মিয়ানমারে ঢুকেছিল। রাখাইনে থেকে যাওয়ার কোনও পরিকল্পনা ছিল না তাদের। টাকা উপার্জন করে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসার কথা চিন্তা করেছিল তারা। ওই ৬ রোহিঙ্গা এইচআরডব্লিউ-এর কাছে অভিযোগ করেছে, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর তাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়।
জানুয়ারিতে অ্যামনেস্টির সবশেষ গবেষণায় রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বহু গ্রাম জ্বালিয়ে ও বুলডোজারে গুড়িয়ে দেওয়ার আলামত উঠে এসেছিল। ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী অর্ধশতাধিক গ্রাম বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে বলে দাবি করে মার্কিন মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস। বলা হচ্ছিল, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক বাহিনীর নিধনযজ্ঞ আড়াল করতেই গ্রামগুলোতে বুলডোজার চালানো হচ্ছে। মার্চের শুরুতে নতুন করে অ্যামনেস্টির দেওয়া বিবৃতি থেকে অন্তত ৩টি সামরিক ঘাঁটি ও রাস্তাঘাট নির্মাণ চলমান থাকার কথা জানা যায়। একইমাসে এএফপির প্রতিবেদনে উঠে আসে রাখাইন বৌদ্ধদের জন্য ‘আদর্শ বৌদ্ধ গ্রাম’ নির্মাণের কথা। মিয়ামার কর্তৃপক্ষের এই ভূমিকাকে এএফপি প্রত্যাবাসন-প্রস্তুতির ‘ভেঁপু বাজানো’ আখ্যা দেয়। সবশেষ মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরকারী জাতিসংঘের সংস্থাগুলো গত সেপ্টেম্বরে প্রায় ১২টি গ্রামে জরিপ চালিয়েছে। পরে এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, ‘অনেক এলাকায় অনাস্থা, প্রতিবেশী কমিউনিটির মধ্যে আতঙ্ক ও অনিরাপত্তাজনিত ভয় বিরাজ করছে।’
উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশের জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকার করে না মিয়ানমার। তাদের ‘বাঙালি মুসলমান’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশের বাসিন্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় নেপিদো। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর দেশটির বাসিন্দা হিসেবে রোহিঙ্গাদের যে সবুজ ও গোলাপি পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছিল, তা গুরুত্বহীন হয়ে যায় ৮২ সালের নতুন নাগরিকত্ব আইনে। মিয়ানমারের ইতিহাসে চোখ ফেরালে দেখা যায়, ১৯৮২ সালে তৎকালীন সামরিক জান্তা সরকার নৃগোষ্ঠীভিত্তিক নতুন নাগরিকত্ব আইন কার্যকর করে। বিতর্কিত ওই বর্ণবাদী নাগরিকত্ব আইনে মিয়ানমারের প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়। আইনের ৪ নম্বর ধারায় শর্ত দেওয়া হয়, কোনও জাতিগোষ্ঠী রাষ্ট্রের নাগরিক কিনা, তা আইন-আদালত নয়; নির্ধারণ করবে সরকারের নীতিনির্ধারণী সংস্থা ‘কাউন্সিল অব স্টেট’। বস্তুত এই আইনটিই জান্তাশাসিত মিয়ানমারে সর্বোচ্চ সেনাবিদ্বেষের শিকার রোহিঙ্গাদের ভাসমান জনগোষ্ঠীতে রূপান্তর করে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিয়ানমারের ভূমিকার সমালোচনা করেন। প্রত্যাবাসন বিলম্বিত করতে মিয়ানমার টালবাহানার নতুন কৌশল নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি ।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।