প্রায় পর্যটকশূণ্য কক্সবাজার

গোলাম আজম খান, কক্সবাজার  []রাজনৈতিক অস্থিরতায় পর্যটন শহর কক্সবাজার পরিণত হয়েছে ভুতুড়ে নগরীতে। টানা অবরোধ, হরতাল ও নাশকতার আশঙ্কায় কক্সবাজারের পর্যটক আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সরাসরি তিগ্রস্ত হচ্ছেন কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসায়ীরা।

সরকারি দলের অনড় অবস্থান ও বিরোধী জোটের টানা কর্মসূচিতে রক্তক্ষরণ হচ্ছে পর্যটন শিল্পে। পরিবহন খাতেও নেমেছে ধস। পর্যটনের অন্যতম সহযোগী খাত হচ্ছে পরিবহন খাত। ২০ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে অন্যান্য জায়গায় যাত্রীবাহী বাস ভাঙচুর, পেট্রলবোমা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটলেও কক্সবাজারের সব রুটেই যানবাহন চলাচল প্রায় স্বাভাবিক। পুরোপুরি স্বাভাবিক কক্সবাজার শহরের পরিস্থিতিও। মহাসড়কেও দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করছে। দোকানপাট খোলা, অফিস-আদালতে আসা-যাওয়া চলছে প্রায় আগের মতোই। যানবাহন সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মহাসড়কে যান চলাচল এখন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। বিলাসবহুল এসি বাসগুলোও চলাচল করছে। এরপরও ঢাকা থেকে পর্যটকেরা কক্সবাজারমুখী হচ্ছেন না। আগে যেখানে সিটের জন্য টিকিট পাওয়া কষ্টকর ছিল, সেখানে এখন যাত্রী না থাকায় অনেক গাড়িই ছাড়ছে না। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ যানবাহনে করে দূরে কোথাও পা রাখছেন না। বিকল্প পথেও যাত্রী নেই। অভ্যন্তরীণ রুটে পরিচালনাকারী কয়েকটি বিমানসংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বর্তমানে যাত্রীসংখ্যা অনেক কম। রাজনৈতিক সহিংসতায় তাই আতঙ্কের ছাপ ব্যবসায়ীদের চোখে-মুখে। আবাসিক হোটেল ও খাবার রেস্তোরাঁয় ছাঁটাই করা হয়েছে ৩০ হাজারেরও বেশি কর্মচারী। এসব ছাঁটাইয়ের পরও হোটেল-মোটেলের মালিকেরা কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

এই পর্যটন খাতের সাথে জড়িত অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ এখন আর্থিক সঙ্কটে পড়েছেন। হাঁহাকার করছে সমুদ্র নগরীর সাড়ে ৪ শতাধিক আবাসিক হোটেল। ভ্রমণকারী না থাকায় হোটেল-মোটেলগুলোকেও পড়তে হচ্ছে বিপুল লোকসানে। লোকসানের ভার সইতে না পেরে ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে খাবার হোটেলসহ দুই শতাধিক কটেজ ও আবাসিক হোটেল। যেগুলো খোলা রয়েছে তাও বন্ধ করে দেয়ার চিন্তা করছেন ব্যবসায়ীরা। ক ভাড়া না হলেও প্রতিদিন লিফট, বিদ্যুৎ, পানি ও সার্ভিসিং খরচ দিতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। গত দুই মাস ব্যাংক ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করতে পরছেন না তারা।

চলমান পরিস্থিতে অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কায় উদ্বেগ নিয়ে সময় পার করছেন সৈকত নগরীর ব্যবসায়ীরা। তাদের চোখে এখন শুধুই অন্ধকার।

নভেম্বর থেকে মার্চ এই ছয়টি মাস পর্যটনের মওসুম। কিন্তু বছরের শুরু থেকে হরতাল আর অবরোধ পর্যটন শিল্পের জন্য অভিশাপ বয়ে এনেছে। সমুদ্রস্নানে দেখা যায় না কোনো পর্যটককে। একই অবস্থা প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন ও ইনানী সৈকতসহ অন্যান্য পর্যটন স্পটেও। পর্যটক শূন্যতায় দৈনিক অন্তত ১০ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ কেয়ারী সিন্দবাদের কক্সবাজার অফিস ইনচার্জ হুমায়ুন কবির বলেন, গত দুই মাসে কোনো পর্যটক আসেনি বললেই চলে। এ কারণে জাহাজও চলে না। প্রতিদিন লোকসান দিতে হচ্ছে।’

রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী মো: গিয়াস উদ্দিন জানান, ‘পর্যটক থাকলে দৈনিক অন্তত ২০-২৫ হাজার টাকা বিক্রি হতো। বর্তমানে দুই হাজার টাকাও হচ্ছে না। অর্ধেকের বেশি কর্মচারী বিদায় করেছি। এরপরও লোকসান।

হোটেল দ্য কক্স-টুডের ব্যবস্থাপক মো: আবু তালেব বলেন, ২০১৩ সালে ‘রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আমরা অনেক বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। সেটা ২০১৪ সালে এসে কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ১৫ সালের ব্যাপারটা আমাদের খুব বেশি উদ্বিগ্ন করছে। এখন কী পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি তা বলার ভাষা আর নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের হোটেলে ১৯০টা রুম আছে। এখন দৈনিক ছয়-সাতটার বেশি বুকিং হয় না। তাও ডিসকাউন্টে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার হোটেলে ২০০-এর ওপরে কর্মকর্তা-কর্মচারী। আমরা তাদের ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছি। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের অবস্থা কেমন হবে। আর যারা চাকরি হারাবেন তাদের পরিবারেরও কী অবস্থা দাঁড়াবে তা বুঝার অপেক্ষা রাখে না।

কক্সবাজার জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও শ্যামলী পরিবহনের কক্সবাজার ইনচার্জ খোরশেদ আলম শামীম বলেন, ‘দূরপাল্লার গাড়িগুলো ঢাকা-কক্সবাজার আসা-যাওয়া করছে ঝুঁকি নিয়ে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সহযোগিতায় মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়ে এলেও সিট খালি আসছে।

এস আলম সার্ভিস পরিবহনের কক্সবাজার ইনচার্জ মো: আলম বলেন, যান চলাচল প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। এরপরও খুব কম পর্যটকই কক্সবাজার আসছেন।’

কক্সবাজার হোটেল মোটেল গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম সিকদার বলেন, ‘বাংলাদেশে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প। বর্তমানে কোনো পর্যটক নেই। আমরা ব্যাংকসহ সব জায়গায় দেনায় আবদ্ধ হয়ে পড়ছি। আমাদের ব্যবসায় রক্তক্ষরণ ঘটছে।’ পুরো পর্যটন শহর এখন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কিটকট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাবু বলেন, ‘সৈকতে কোনো পর্যটক নেই। দুই মাস ধরে পুরো সৈকত পর্যটকের অভাবে খাঁ খাঁ করছে। এ অবস্থায় কিটকট ব্যবসায়ীরা পথে বসার উপক্রম হয়েছে। যেসব কিটকট ব্যবসায়ী শুধু এ ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল তাদের অনেকের পরিবারের সদস্যরা খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন।’

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।