ফের সবর মানবপাচার সিন্ডিকেট

জেলার বিভিন্ন সমুদ্রপথে আবার মানবপাচার শুরু করেছে একটি চক্র। এখন শীতকাল সাগর শান্ত থাকবে। আর এই অবস্থাতে ছোট ছোট নৌকায় মানবপাচার সুবিধাজনক। টেকনাফ এলাকায় একেই বলা হয় ‘মানব পাচার মৌসুম’। এসময় মানবপাচারকারীরা সক্রিয় থাকে বলে শীতকালকে বলা হচ্ছে মানবপাচারের মৌসুম। চিহ্নিত পাচারকারীদের আইনের আওতায় না আনায়, ফের সক্রিয় তারা। এখন মূলত পাচার হচ্ছে রোহিঙ্গারা। প্রশাসনের নমনীয়তা ও স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতায় এলাকায় ফিরতে শুরু করেছে আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ মানব পাচারকারী সিন্ডিকেট।দালালেরা এলাকায় ফিরে এই তৎপরতা শুরু করেছে।

গত ৩০ নভেম্বর সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাচারকালে টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ থেকে ছয় নারীসহ ১০ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছে র‌্যাব-৭। এ সময় আবদুর রহমান (২৫) নামে এক দালালকেও আটক করা হয়েছে। সে টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ মাঝার পাড়ার ফজরুল হকের ছেলে।
শুক্রবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীরদ্বীপ ঘোলারচর মাঝেরপাড়া থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়।

গত ৬ নভেম্বর টেকনাফ উপকূলে মালয়েশিয়া পাচার চেষ্টাকালে ১৪ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা। উদ্ধার রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা। এর মধ্যে পাচঁ জন নারী রয়েছে। বুধবার (৭ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে চারটার দিকে মালয়েশিয়া মানবপাচারের চেষ্টাকালে ছয়জন দালাল ও রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুসহ ৩৩ জনকে উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড সদস্যরা। এদের মধ্যে ১০ জন নারী, ১৪ পুরুষ ও ৯ জন শিশু। এরা সকলে রোহিঙ্গা নাগরিক। তারা উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা বলে জানা গেছে। টেকনাফের সেন্টমার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর থেকে একটি ট্রলারসহ তাদের উদ্ধার করা হয়। দুইদিনে পাচারের কবল থেকে ৫৪ জন উদ্ধার করা হলো। এ তথ্যে নিশ্চিত করেছেন কোস্টগার্ড টেকনাফ স্টেশনের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট ফয়েজুল ইসলাম মন্ডল।

উদ্ধার রোহিঙ্গারা জানান, নিরাপদে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেয়ার প্রলোভনে ১০ হাজার টাকা ‘টোকেন মানি’ নিয়ে তাদের সেখানে নিয়ে আসা হয়। গভীর সাগরে একটি বড় ট্রলারে তাদের তুলে দেয়ার কথা ছিল। মালয়েশিয়া পৌঁছার পর আরও ২ লাখ টাকা করে দেয়ার চুক্তি হয় তাদের।
এছাড়াও রোহিঙ্গা নারীদের সেখানে বিয়ের ব্যবস্থার কথাও হয় বলে দাবি করেন নারীরা।

সরকারের কড়া অবস্থান ও থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়া সীমান্তে গণকবর আবিষ্কারের কারণে বাংলাদেশ থেকে সাগরপথে মানবপাচার প্রায় বন্ধই ছিল বছর তিনেক। কিন্তু সম্প্রতি কক্সবাজার উপকূল থেকে আবারও এমন তৎপরতা শুরু হওয়ার খবর মিলেছে। টেকনাফ-উখিয়ার দ্বায়িত্বশীল অনেকেই নিশ্চিত করেছেন মানব পাচার শুরু হয়ে গেছে। তবে, এখন শুধু রোহিঙ্গারাই যাচ্ছে। এরই মধ্যে বঙ্গোপসাগর দিয়ে মানব পাচার শুরুর প্রচেষ্টাকে অশনি সংকেত বলে মনে করছে বিশ্লেষকেরা। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শীতকালে সমুদ্র শান্ত থাকায় মানবপাচারকারীরা এসময়কে মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়। কারণ, দেশীয় ছোট ছোট নৌকায় উত্তাল সাগর পাড়ি দেওয়া সম্ভব না। তাই শীতে সাগরের শান্ত অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সমুদ্রপথে মানবপাচারের ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। তারা আগের মতো স্ব-স্ব অবস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দালালদের নিয়ন্ত্রণে এনে আবারও নেটওর্য়াক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

এ প্রসঙ্গে অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন ওয়ারবি ফাউন্ডেশনের প্রধান সৈয়দ সাইফুল হক জানান, “হঠাৎ করেই টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মানব পাচারের চেষ্টার খবর দেশের জন্য অশনি সংকেত। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী একটু গাফিলতি দেখালেই তারা সক্রিয় হয়ে উঠবে।”

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন বলেন, বর্তমানে মানব পাচার শূন্যের কোঠায় রয়েছে। মানব পাচারকারীদের ধরতে ও মানব পাচার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবসময় তৎপর রয়েছে। কোস্টগার্ড, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাবকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় টেকনাফের ৬৪জন পাচার ঘটনাও প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি বাংলাদেশিদেরও টার্গেট করতে পারে মর্মে আশঙ্কা করা হচ্ছে। “মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য ১৪ লাখের অধিক বাংলাদেশি নিবন্ধন করেছিলেন। সেখান থেকে মাত্র কয়েক হাজার মানুষ দেশটিতে যেতে পেরেছেন। বাকিরা সুযোগ পেলে অবৈধ পথেও মালয়েশিয়া যেতে রাজি হবেন। দালালরা সেই সুযোগ নিতে চায়।” সরকারের উচিত মানুষকে সচেতন করা ও বৈধ পথে অধিক হারে কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা করা।

কক্সবাজারে সর্বশেষ মানব পাচার আইনে প্রায় ৪০০ মামলা হয়েছে। কিন্তু, মামলাগুলো সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি এবং কোন মামলাতেই চিহ্নিত শীর্ষ পাচারকারীদের আসামী করতে পারেনি পুলিশ।

নানা কৌশল অবলম্বন করেও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না মানব পাচার। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারী ও শিশুদের পাচার করা হচ্ছে। শিশুদের চেয়ে বেশি পাচার করা হচ্ছে নারীদের। দেশে মানব পাচারসংক্রান্ত কয়েক হাজার মামলা হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মানব পাচার মামলায় আসামি গ্রেফতার বা দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়ায় এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সূত্র: ডেইলি কক্সবাজার।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।