ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও স্থায়ী হুমকী

423423
ভারত আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে ও সর্বাত্মক সাহায্য সহযোগিতা করেছে, একথা যেমন সত্য, এজন্য আমরা ভারতের প্রতি সব সময় বন্ধুত্বসূলভ আচরন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে কখনও কার্পন্য করিনি একথাও সত্য, বাংগালীরা অকৃতজ্ঞ জাতি নয়। “নকল সোনা বা ১৬ আনার পরিবর্তে ৪ আনা সোনা দিয়ে হলেও ক্রেষ্ট বানিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে যারা সাহায্য সমর্থন দিয়েছিল ৪২ বছর পর শেখ হাসিনার সরকার তাদেরকে সম্মানিত করেছে”। এমনকি স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পর যে দখলদার পাকিস্তানী সৈন্যরা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ৯ মাস যাবৎ নিরীহ ও নিরস্ত্র বাংগালীদের উপর যে অমানবিক, অমানষিক ও পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন চালিয়েছিল সেই পাকিস্তানী ৯০ হাজার সৈন্যকে আত্মসমর্পনের পর বাংলার মাটিতে জীবিত আটক করার পরেও ভারতের কারণে ( যুদ্ধবন্দি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক জেনেভা কনভেনশানের দোহাই দিয়ে ) বাংগালীরা তাদের বিচার করতে পারেনি। ভারত তাদেরকে বন্দি করে ভারতে নিয়ে যায় এবং “ভারত-পাকিস্তানের ভবিষ্যত ও বৃহত্তর সম্পর্কের” খাতিরে ভারতের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত শিমলা বৈঠকের পর বাংলাদেশসহ কথিত তৃপক্ষীয় ( আসলে পাক-ভারত ) চুক্তির মাধ্যমে তাদেরকে পাকিস্তানের কাছে ফেরত দেওয়া হয়। ঐ সময় যদি ৯০ হাজার সৈন্যকে ফেরত দেওয়া না হত তবে অন্তত সরাসরি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত তাদের মধ্যে চিহ্নিত ১৯৫ জনের বিচার করা যেত এবং বাকীদের আটকে রেখে পাকিস্তানের কাছ থেকে আমাদের পাওনা পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য সম্পদ ফেরত পেতে , মুক্তিযুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরন আদায় করতে এবং আটকে-পড়া অবাংগালী(পাকিস্তানী)দের ফেরত নিতে দড় কষাকষি করা যেত। কিন্তু ভারত আমাদেরেকে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছিল বলে ঐ সময় ভারতের ঐ একতরফা সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগকে বাধা না দিয়ে অর্থাৎ এত বড় ত্যাগ স্বীকার করেও আমাদেরকে তা হজম করে নিতে হয়েছিল। এটাও কি ভারতের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা নয় ? ভারত-প্রেমী ( ভারতের স্বার্থের কাছে নি:শর্ত আত্মসমর্পনকারী ) দালাল গোষ্টি বা মহল আজ ৪২ বছর পর ভারতের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে বলে ঐ সময় ৯০ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যকে আটকে রেখে বিচার করলে পাকিস্তান শেখ মুজিবকে জীবিত ফেরত দিতনা বা পাকিস্তানে বসবাসকারী বাংগালীদের মেরে ফেলত। অথচ ঐ সময় এধরনের কোন শর্ত বা দড় কষাকষির পর্বই শুরু হয়নি বা এধরনের প্রশ্ন উঠার আগেইতো ভারত শিমলা বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছিল এবং শিমলা চুক্তির আগেইতো শেখ মুজিব বাংলাদেশে জীবিত ফেরত এসেছিলেন। শুধু তাই নয়, তখন চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য শিমলায় অবস্থানরত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন যখন শেখ মুজিবকে জানালেন পাকিস্তানের সৈন্যরা বাংলাদেশে জঘন্য অপরাধ করেছে তাদেরকে ছাড়া যাবেনা বা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবেনা, জবাবে তখন শেখ মুজিব তাকে বল্লেন, “ছেড়ে দাও, বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দাও বাংগালীরা মহান জাতি, তারা ক্ষমা করতেও জানে।” তার অর্থ হলো এই – বাংলাদেশে বাংগালীদের উপর যারা সরাসরি ও প্রত্যক্ষভাবে অমানবিক অত্যাচার চালিয়েছিল “ভারত-পাকিস্তানের সুসম্পর্কের খাতিরে” তাদেরকে ক্ষমা করার মাধ্যমে “মহান” হয়ে বা “মহত্ব” দেখিয়ে প্রকৃত অর্থে ভারতকে সন্তুষ্ট করা । অপরদিকে সংগত কারণেই প্রশ্ন করা যায়, ঐ সময় যারা ( বাংগালী যুদ্ধাপরাধীরা ) পাকিস্তানী সৈন্যদেরকে বাংগালীদের উপর অমানবিক অত্যাচার চালাতে সহায়তা করেছিল বা করতে বাধ্য হয়েছিল দেশ গড়ে তোলার স্বার্থে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনে শেখ মুজিবের “মহত্বের” অনুপ্রেরনায় তাদেরকেও ক্ষমা করে দিয়ে বাংগালীরা বিশ্ববাসীর কাছে নিজেদেরকে “মহান” হিসেবে আবারও পরিচয় করানোর সুযোগ এখন ( ৪২ বছর পর ) হাতছাড়া করছে কেন ? আসলে আমরা নিজেদের স্বার্থে যখন যা ইচ্ছা তাই করি ও বলি। শুধু তাই নয়, ঐ সময় যে ১৯৫ জন সৈন্যকে চিহ্নিত অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছিল তাদেরকেও ভারতের বা বংলার মাটিতে বিচার না করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, বলা হয়েছিল পাকিস্তান তাদেরকে পাকিস্তানে নিয়ে বিচার করবে ( বাংগালীদের সাথে কি হাস্যকর তামাশা ! ), যে পাকিস্তান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে কঠোর ও নিষ্ঠুরভাবে দমন করতে চেয়েছে, সে প্রচেষ্টায় তাদের যে সেন্যরা অংশগ্রহন করেছিল পাকিস্তানই তাদের বিচার করবে – এটা কি কখনও বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে ? অর্থাৎ যে বাবা তার ছেলেকে অন্যের বাড়িতে চুরি করতে পাঠিয়েছে, চুরি করার সময় ধরা পড়ার পর সে বাড়ির লোকেরা যদি তার বিচার করতে উদ্যত হয় তখন যদি তার বাবা বলে আমার ছেলেকে আমার কাছে ফেরত দাও, আমিই তার বিচার করব, এটা কি কেউ বিশ্বাস করবে, পাকিস্তানের সৈন্যদের বেলায় তাই হয়েছিল। ভারতের কাছে পাকিস্তানের এই অবাস্তব ও অপ্রত্যাশিত আবদারও বাংগালীদের তখন হজম করে নিতে হয়েছিল। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে আমাদেরকে সহায়তা করেছিল বলে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকেই ভারতের ইচ্ছা ও মনোভাবের প্রতি আমাদের অনুগত ও কৃতজ্ঞ থাকার যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং ভারত ( ও তার এদেশীয় দালাল গোষ্টি ) চায় বাংলাদেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বা দেশের যে কোন ক্ষতি হলেও তা ( ভারতের প্রতি আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতা ) যেন আজীবন অব্যাহত থাকে। এই চিন্তা-ভাবনা থেকেই স্বাধীনতার পর পরই বাংলাদেশকে কার্যত আষ্টে-পিষ্ঠে বেঁধে রাখার উদ্দেশ্যেই ভারত বাংলাদেশকে ২৫ বছর মেয়াদী কথিত ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী বা শান্তি চুক্তি করতে উৎসাহিত তথা বাধ্য করেছিল। ২৫ বছর পার হওয়ার পর এ চুক্তি নবায়নের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে চাপ থাকা সত্তেও বাংলাদেশে এর তীব্র সমালোচনা থাকায় বাংলাদেশের শাসকরা আর তা করতে উৎসাহিত হয়নি।
ভারত আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য-সহযোগিতা করেছিল – এটা অনস্বীকার্য, কিন্তু কেন করেছিল বা করতে বাধ্য হয়েছিল এ প্রশ্ন কি কখনও খতিয়ে বা তলিয়ে দেখা হয়েছে ? যদি হত তবে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের আজীবন কৃতজ্ঞ ও অনুগত না থাকার কারণগুলোর যৌক্তিকতা বা যথার্থতা খুজে পাওয়া যেত। ১৯৪৭ সালে দখলদার বৃটিশ শাসকদের কাছ থেকে যখন মহাভারত বা মোঘল সাম্রাজ্য ভারতবর্ষ মুক্ত হয়েছিল তখন হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান নামে দুটো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। ভারত বা ভারতের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও জনগন যদি প্রকৃত অর্থে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও নীতিতে বিশ্বাসী হত তবে ঐ সময় ধর্ম ভিত্তিক দ্বিজাতি তত্তের ( হিন্দু ও মুসলমান ) ভিত্তিতে হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান নামে দুটো দেশের পরিবর্তে ভারত বা ভারতবর্ষ নামে একটা দেশই স্বাধীন হত। তবে মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি হিসেবে পাকিস্তানের জন্ম বা স্বাধীনতাকে ভারতীয় নেতারা তখন মেনে নিলেও পূর্ব বাংলার ( নবাব সিরাজদৌল্লার বাংলার ) মুসলমান বিশেষ করে বাংগালী মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি হিসেবে ভারতের পূর্বাঞ্চলকে ( পশ্চিম বাংলা, আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়সহ ) ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে পাকিস্তানের আর এক অংশ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানকে মেনে নিতে চায়নি, ভারতীয় নেতাদের তীব্র বিরোধীতা ও বৃটিশ শাসকদের সাথে তাদের সফল কূট কৌশলের কারণে তখন বৃটিশরা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত ম্যাপ বা আয়তন থেকে ভারতের উল্লেখিত রাজ্যগুলোকে বাদ দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের যে আয়তন তা পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে মেনে নিতে পশ্চিম পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্ন্াহর নেতৃত্বাধীন তখনকার মুসলিম নেতাদের ( যাদের মধ্যে পূর্ব বাংলার শেরে বাংলা এ,কে, ফজলুল হক , হোসেন শহীদ সোহরোয়ার্দী ও স্যার সলিমুল্লাও ছিলেন ) উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত তা মেনে নিতে বাধ্য করে। তারপরেও ভারতীয়রা বাংলাকে বিভক্ত করে পূর্ব পাকিস্তান করার তীব্র বিরোধিতা করেছিল, বঙ্গ-ভঙ্গ রোধ আন্দোলনের নামে তখন ভারতীয়রা বাংলাকে ভারতের অংশ হিসেবে ধরে রাখতে বৃটিশ ও ভারতীয় নেতাদের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির ৬৬ বছর ( পূর্ব পাকিস্তানের ২৩ বছর ও বাংলাদেশের ৪৩ বছর ) পর এখনও পশ্চিম বাংলার বাংগালীদের একটা অংশ বঙ্গ সেনা নামে স্বাধীন বঙ্গভূমি প্রতিষ্ঠা করে কার্যত বাংলাদেশের কয়েকটা জেলাকে পশ্চিম বাংলার সাথে একীভূত করার অপচেষ্টায় ব্যর্থ প্রয়াস বা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
ভারত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্মকে মেনে নিলেও ভৌগলিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ১২০০ মাইল দূরে ( এক অর্থে বিচ্ছিন্ন ) আয়তনের তিন চতুর্থাংশ দিক দিয়ে ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত পূর্ব পাকিস্তান এক সময় পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভারতের সাথে একীভূত হয়ে যাবে বলেই ভারতীয় নেতারা বিশ্বাস ও প্রত্যাশা করত। যে কারণে ১৯৭১ সালে বাংগালীরা যখন পাকিস্তান থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেছিল তখন ভারতের কোন কোন জাতীয় নেতা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তাদের সে স্বপ্ন পূরনের শুভ সূচনা হিসেবে মনে করে পুলকিত হয়েছিল। ভারতের বর্তমান শাসক দল বিজেপি’র প্রবীন নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ীতো ১৯৭১ সালে দিল্লিতে প্রকাশ্যেই আস্ফালন করে বলেছিল, “ অখন্ড ভারত কায়েম করার এটাই উপযুক্ত সময় ”। কোন কোন স্বার্থান্বেষী ভারতীয় মহল তখনকার ইন্দিরা সরকারকে এও বুঝাতে চেয়েছিল পাকিস্তানকে দুই টুকরো করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলে আসলে পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে দুটো পাকিস্তানের জন্ম হবে, তখন ভারতকে দুটো পাকিস্তানকে মোকাবেলা করতে হবে, তার চেয়ে ভাল হবে এই সুযোগে ( পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংগালীদের সশস্ত্র যুদ্ধের সুবাদে ) পূর্ব পাকিস্তানকে ভারতের সাথে মিশিয়ে ফেলা।
লেখক : জাহিদ হাসান, রিয়াদ, সউদী আরব।

 

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।