মানব পাচারকারী চক্র তৎপর

রফিকুল ইসলাম :
বঙ্গোপসাগর-ভারত মহাসাগর, আন্দামান হয়ে আবারও রোহিঙ্গা পাচারের ঘটনা ঘটছে। দালাল চক্র বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে সমূদ্র পথে মানব পাচারের মত হীন অমানবিক তৎপরতা চালানো শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। শুক্রবার ৭৬জন রোহিঙ্গা বাহি একটি মাছ ধরার কাঠের বোট ইন্দোনেশিয়ার আর্চেহ প্রদেশের সুমাত্রা দ্বীপে পৌছেছে। এর পূর্বে চলতি মাসে আরো কিছু রোহিঙ্গা মাছ ধরার বোটে করে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া উপকূলে পাড়ি দিয়েছে। কার্যত বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে পুরনো মানব পাচার চক্রের সদস্যরা গোপনে তৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থান নেয়া মিয়ানমারের রাখাইনের ১১লক্ষাধিক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মাঝে নানা ধরনের হতাশা ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা কার্যত এসব উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করছে বলে ও জানা গেছে। ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যকার সময়ে সংঘটিত লোমহর্ষক মানব পাচারের ঘটনা ঘটে সমুদ্র পথে। বিশ্ব ব্যাপী উদ্বেগের কারন হয়ে দাঁড়ায় এ মানব পাচারের ঘটনা। বাংলাদেশে সমুদ্র উপকূল থেকে ঐ সময়ের মধ্যে কয়েক লক্ষ মানুষ সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় একাধিক মানবিক ট্রাজেডির ঘটনা ঘটে। বিশ্ব ব্যাপী তুমুল প্রতিবাদ ও নিন্দার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া যৌথ ভাবে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযানে নামে।
এসব দেশের কঠোর তৎপরতায় সে সময় থেকে এ পর্যন্ত ব্যাপক হারে সমুদ্র পথে মানব পাচার অনেকটা বন্ধ হয়ে পড়ে। মানবপাচারের সাথে জড়িত আন্তঃ পাচারকারী চক্রের হোতাদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোন আইনি ব্যবস্থা না হওয়ায় তারাই আবার ঘুরে ফিরে সমুদ্র পথে চরম ঝুঁকি নিয়ে মানব পাচারের মত হীন অমানবিক অথচ প্রচুর লাভ জনক ব্যবসা চাঙ্গা করার কৌশল নিয়ে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির গুলোকে কেন্দ্র করে তৎপরতা শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ ধরনের মানব বোঝাই একটি কাঠের মাছ ধরার বোট শুক্রবার ইন্দোনেশিয়ার আর্চেহ প্রদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চীলয় সুমাত্রা দ্বীপ থেকে ভাসমান অবস্থায় স্থানীয় জেলেরা উদ্ধার করেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির সদস্যদের বহনকারী কাঠের বোটটি কতদিন ধরে সাগরে ভাসছিল তা জানা যায়নি। তবে ইন্দোনেশিয়ার জেলেদের উদ্বৃতি দিয়ে উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন উদ্ধারের সময় বোটটি স্বাভাবিক ভাবে কাজ করছিল না।
শুক্রবার উদ্ধার হওয়া ৭৬জন রোহিঙ্গার মধ্যে ৮টি শিশু ২৫ জন নারী ও ৪৩জন পুরুষ রয়েছে। এসব উদ্ধারকৃত রোহিঙ্গারা পানি শূণ্যতা সহ খাদ্য সংকটে ভুগছিল। এদের মধ্যে ৭জনকে উপকূলে এনে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। গত বছরের আগষ্টের মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্ব পরিকল্পিত ও কাঠামো বদ্ধভাবে সহিংসতা জোরালো করে। খুন, ধর্ষন আর অগ্নিসংযোগ থেকে বাঁচতে রাখাইন ছেড়ে পালাতে শুরু করে লক্ষ লক্ষ অসহায় রোহিঙ্গা। উপায়ান্তর না দেখে এসব রোহিঙ্গারা প্রতিবেশী বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সাত লাখের বেশী আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরে মানবেতর পরিবেশে আশ্রয় গ্রহণকারী এসব রোহিঙ্গারা আসন্ন বর্ষা মৌসুমে সমূহ বিপদ থেকে বিকল্প আশ্রয়ের খোঁজে বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থা গুলো।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি মিয়ানমারের রাখাইন থেকে অজানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিছে শত শত রোহিঙ্গা। গত সপ্তাহে বৃটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানান, মিয়ানমারের রাখাইনের রাচিডং উপকূল থেকে ৭০জন রোহিঙ্গাকে নিয়ে একটি ফিসিং বোট মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। সমুদ্র পথে দুর্ঘটনা ঘটলে তাদের ইন্দোনেশিয়া বা থাইল্যান্ডে উপকূলে আশ্রয় নেয়ার কথা জানিয়েছিল বার্তা সংস্থাটি। তবে শুক্রবার উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের বরাদ্দ দিয়ে রোহিঙ্গা বোঝাই ফিসিং বোটটির গন্তব্য অস্ট্রেলিয়া ছিল বলে জানিয়েছে ইন্দোনেশিয়ার আর্চেহ প্রদেশের দুর্যোগ প্রশমন সংস্থা। উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের প্রয়োজনীয় খাবার, চিকিৎসা ও অন্যান্য ত্রাণ সমগ্রী দিয়ে অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য গত ৬ এপ্রিল একই এলাকা থেকে ৫ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছিল ইন্দোনেশিয়ার জেলেরা। ২০দিন ধরে সাগরে ভাসতে থাকা রোহিঙ্গা বোঝাই উক্ত নৌকাটি আরো ৫ আরোহী সমুদ্রে প্রাণ হারিয়েছিল বলে জানিয়েছে উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গারা। এরও কয়েকদিন আগে মালয়েশিয়া উপকূল থেকে ৫৬ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছিল সে দেশের কর্তৃপক্ষ। উখিয়ার বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরের রোহিঙ্গা নেতারা জানিয়েছেন মানব পাচারকারী চক্রের লোকজন আশ্রয় শিবিরের যুবক-যুবতী ও কিশোর শ্রেণির রোহিঙ্গাদের টার্গেট করে অতি গোপনে সমুদ্র পথে পাচারে তৎপরতা চালাচ্ছে। উখিয়া থানার ওসি মোঃ আবুল খায়ের জানিয়েছেন উখিয়া থানায় বেশ কিছু মানব পাচারের মামলা রয়েছে। এসব মামলার কিছু আসামী আটক করে জেলে প্রেরন করা হয়েছিল। কিন্তু এসব আসামীদের অধিকাংশ জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে বলে তিনি জানান।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।