যেন লুটিয়ে পড়েছে তার সৌন্দর্যের ডালায়

2015_11_25_15_16_25_wjufauS8W
জহিরুল ইসলাম :
শুক্রবার কখন? বলোনা আব্বু। আগে কী জন্যে বলো। না আগে তুমি বলো কখন শুক্রবার আসবে। পরশুদিন শুক্রবার। আবার প্রশ্ন পরশুদিন কখন? কাল একদিন পর শুক্রবার। এবার বলো শুক্রবার কী জন্যে? কী মজা! আম্মু বলেছে শুক্রবারে পিকনিক এ যাবে। কোথায়? কক্সবাজারের ইনানী সী বীচ এ। কই, তোমার মা তো আমাকে এ ব্যাপারে কিছুই বলেনি। তোমাকে বলবে কেন? আম্মু যাবে তাদের অফিসের লোকজনের সাথে, অরূপ আর আমিও তাদের সাথে যাচ্ছি। অনেক মজা হবে? তুমি যাবে? না আমাকে তো এ খবরটি কেউ দেয়নি। কেন তুমি না সব খবর পত্রিকায় দাও। এ খবরটি কেন রাখোনি? এসব প্রশ্নবানে জর্জরিত করলো আমার ৬ বছরের মেয়ে লাবণ্য। কিছুক্ষণ পর ঠিকই ফোন করলো সে। বললো কাল অফিসের সবাই কক্সবাজারের ইনানী বীচ এ যাবো আমাদের এসএআরপিভি’র পক্ষ থেকে বার্ষিক বনভোজনে। প্রত্যেকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে এ বনভোজনে অংশগ্রহন করবে, তোমাকেও যেতে হবে। ঠিক আছে, দেখি বলেই মুঠো ফোন কেটে দিলাম।
পরদিন বৃহস্পতিবার। রাতে লাবণ্যের পেটে যেন ভাত হজম হচ্ছে না। আবার বললো, কী কাপড় পরে যাবে? কী রকম জুতো পড়তে হবে? কাপড় গুলো গুছিয়ে রাখলো ভাল হয় না? শুক্রবারের বনভোজনের তাগাদা দিয়ে অনেক প্রশ্ন লাবণ্যের। বৃহস্পতিবার রাতেই আমাদের প্রস্তুতি শেষ। শুক্রবার সকাল ঠিক ৮টায় বাসে উঠার কথা। শুক্রবার দিনও লাবণ্য ঘুম থেকে সবার আগে উঠে। তার যেন সারা রাত ঘুম হয়নি। আমরা শুক্রবার (০৮.০১.২০১৬ইং) সকাল সাড়ে ৭টায় চকরিয়া পৌরসভার ভরামুহুরীস্থ আকবর ভবনের বাসা থেকে বের হয়ে হেটে পৌঁছলাম প্রথমে ভরামুহুরীস্থ এসএআরপিভি’র আঞ্চলিক কার্যালয়ে পায়ে। ততক্ষণে এসএআরপিভি’র ক্যাম্পাস ভরপুর। একে একে সবাই আসলো। পরক্ষণে শুনলাম গাড়ীর দায়ীত্ব নেয়া এসএআরপিভি’র শাহাব উদ্দিন বাস নিয়ে আকবর ভবনের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কারণ এসএআরপিভি’র কার্যালয়ের সড়কের দিকে বড় বাস ঢুকানো যাচ্ছেনা। এ কথা শুনেই সবাই সেদিকে গিয়েই বাসে উঠলো। তখন সকাল ঠিক ৯টা। ৮টার গাড়ী ছাড়লো ৯টায়। এক ঘন্টা দেরী হয়ে গেছে। এই এক ঘন্টা কিছুই না! ইনানী বীচে যাবো, অনেক মজা হবে। বাস দুইটির উপরে থাকা মাইকগুলোতে গান চলছে। কক্সবাজারের ইনানীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু। পিছনে এসএআরপিভি’র মাক্রোবাসটিও আমাদের বাস দু’টি অনুসরণ করে পেছনে পেছনে ছুটলো। মাইক্রোবাসটিতেও ঠাই হচ্ছে না, একেবারে ভরপুর। পথে পথে মাইকে যে যার মতো করে গান ধরলো। কী আনন্দ! এখানে সবাই শিল্পী, সবাই শ্রোতা। আমাকে কেউ গান গাইতে অনুরোধ করছে না। কেউ অনুরোধ করে কি না পুরো পথ অপেক্ষা করেছি। কিন্তু না কেউ আমাকে গান করতে অনুরোধ করেননি। একটু দঃখ পেলাম। আহা! কারো পক্ষ থেকে যদি অনুরোধ পেতাম তাহলেই একটি গান গেয়ে ফেলতাম। যাক পথে অনেক মজা করলো সবাই। আমাদের বহন করা ৩টি গাড়ীই দ্রুত ছুটছে ইনানীর উদ্দেশ্যে।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পর আমরা কক্সবাজারের কলাতলীতে পৌঁছলাম। এখান থেকে মেরিন ড্রাইভিং হয়ে যাত্রা। এ পথটিতে প্রকৃতি যেন লুটিয়ে পড়েছে তার সৌন্দর্য্যরে ডালায়। সাগর আর পাহাড়, নৈর্সগিক দৃশ্য শোভা পাচ্ছে সর্বত্র। রাস্তার একপাশে উচু পাথুরে পাহাড় আরেক পাশে সাগর। একদিকে নানা পাখপাখালির কোরাস গান অন্যদিকে সাগরের গর্জন সবাইকে রোমাঞ্চিত করে তুলেছে। এই রাস্তাটি সেনা বাহিনীর তৈরি করা। যাবার পথে পার হতে হয়েছে সেনাবাহীর একটি ক্যাম্প। পাহাড়ে নানা লতাগুল্মের সাথে সৈকত পাড়ে দেখা যায় ঝাউ গাছের সারি। মাঝে মাঝে সুপারি গাছের এক পায়ে দাড়িয়ে থাকা সৌন্দর্য্যরে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করেছে। সৈকতের বালির চরে জেলে নৌকাগুলো এক ফালি চাঁদের মতো যেন অনেকগুলো চাঁদ সারি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পার হয়ে আমরা পৌঁছলাম ইনানী স্পটে। এটি একটি আকর্ষণীয় সমুদ্র সৈকত। এখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ পাথুরে সৈকত। সমুদ্র থেকে ভেসে এসে এখানকার বেলাভূমিতে জমা হয়েছে প্রচুর প্রবাল পাথর। ছিমছাম, একেবারে নিরিবিলি। প্রবালের উপর দাঁড়িয়ে সাগর দেখার মজাটাই আলাদা। সাগরের ঢেউ গুলো প্রবালের গায়ে আঘাত লেগে পায়ের কাছে আঁছড়ে পডছে। ঢেউ গুলো একটির পর অপরটিকে মুছে দিচ্ছে। স্বচ্ছ জলের তলায় দেখা যায় বালুর স্তর। এখানে বিস্তীর্ণ বালুকা বেলায় ছুটে বেড়ায় হাজারো লাল কাঁকড়ার দল। ছোট ছোট হাজারো সামুদ্রিক পোকা যেন গড়ে তুলছে তাদের নিজস্ব নগরী। স্বচ্ছ বালির স্তর থেকে পানি নেমে যাওয়ার পর এসব আঁকিয়ে শিল্পী তাদের নকসা নগরী গড়ে তুলছে নিরন্তর। ইনানী বিচ যেমন সুন্দর আর আকর্ষনীয় ঠিক তেমনই রোমাঞ্চকর কক্সবাজার হতে ইনানী পর্যন্ত যাত্রা পথটি। দুপুরের পর আবার সবাই ফিরে আসেন গাড়ী ষ্টান্ডে। যেখানে আমাদের এ পিকনিকে অংশ নেয়া দেড় শতাধিক নারী পুরুষ ও শিশু’র জন্য খাবার রান্না করা হয়। খাওয়া শেষে মোহাম্মদ এহেছানের সঞ্চালনায় অনুষ্টিত হয় সাংস্কৃতি অনুষ্টান, রেফল ড্র। সাংস্কৃতিক অনুষ্টানের ঘোষণায় আমার নাম আসলো। সুযোগটি হাত ছাড়া করিনি। তারপর গেয়ে ফেললাম একটি আঞ্চলিক গানের কয়েকটি কলি। সর্বশেষ বিজয়ীদের কাছে পুরস্কার বিতরণ করেন এসএআরপিভি’র আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক কাজী মাকছুদুল আলম মুহিত। পশ্চিমা আকাশে লাল আভা ছড়িয়েছে। নেমে আসছে শীতের তীব্রতা। তখনও অন্ধ্যকার নেমে আসেনি। এবার বাড়ী ফেরার সময়। সবাই যখন গাড়ীতে উঠে পড়লো তখনই মসজিদের মাইক থেকে ভেসে আসলে আজানের ধ্বনি। তারপর গাড়ীর চাকা ঘুরছে, ফেরার যাত্রা শুরু। রাত ৮টার দিকে পৌঁছলাম চকরিয়া পৌরশহর ভরামুহুরীতে। যেখানে সবাই যে যার মতো করে বাসায় ফিরলো।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।