রামুর ১০০ফুট লম্বা বোদ্ধ মূর্তি

Sunil-660xgggg330

 

আবদুল কাইয়ুম রামু []মহামানব গৌতম বুদ্ধ ধন্যবতীর রাজা চাঁদ সুরিয়ার সময় সেবক আনন্দকে নিয়ে আরাকানের রাজধানী ধন্যবতী আসেন। সেখানে এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সেবক আনন্দকে উদ্দেশ্য করে বুদ্ধ বলেন, ‘হে আনন্দ ভবিষ্যতে পশ্চিম সমুদ্রের পূর্ব পার্শ্বে পাহাড়ের উপর আমার বক্ষাস্থি স্থাপিত হইবে। তখন উহার নাম হইবে ‘রাংউ’। ধন্যবতী রাজবংশ গ্রন্থে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, ভাষাতাত্ত্বিক প্রকৃয়ায় রাংউ থেকে রামু শব্দটি এসেছে। রাংউ বার্মিজ শব্দ। রাং অর্থ বক্ষ, উ অর্থ অস্থি অর্থাৎ রাংউ শব্দের অর্থ হচ্ছে বক্ষাস্থি। বর্তমানেও রামুতে রয়েছে অনেকগুলো প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও প্রতœতাত্তিক নিদর্শন।
এই রামুতে বৌদ্ধ সভ্যতা বা বৌদ্ধ স্থাপত্যের গোড়াপত্তন কখন থেকে তা সঠিকভাবে বলা মুশকিল। তবে আরাকানের প্রাচীন ইতিহাস ‘রাজোয়াং’ থেকে জানা যায়, ‘খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের দিকে অর্থাৎ ১৪৬ খ্রিস্টাব্দে মগধ রাজ্যের চন্দ্র সূর্য নামক জনৈক সামন্ত যুবক তাঁর বহু অনুগামী সৈন্যসামন্ত নিয়ে চট্টগ্রাম ও আরাকান দখল করেন। একটি অখন্ড রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং আরকানের ধন্যবতীতে রাজধানী স্থাপন করেন। রাজা চন্দ্র সূর্য এবং তাঁর সঙ্গে আগত সৈন্যদের অধিকাংশ ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। তারা চট্টগ্রাম ও আরকানে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে কার্যকর ভূমিকা রাখেন। তাই মগদাগত বৌদ্ধ এবং এতদঅঞ্চলের বৌদ্ধদের মধ্যে নিবিড় ধর্মীয় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চট্টগ্রাম ও আরকানে বৌদ্ধ ধর্মের দ্রুত বিস্তার ঘটে’।
বিভিন্ন সূত্রে আরো জানা গেছে, প্রাচীনকাল থেকে রামু আরাকানী এবং এদেশীয় রাখাইন (রাকখাইন) বৌদ্ধদের পদভারে মুখর ছিল। আরাকানী শাসনামলে কক্সবাজার বা রামুতে রাখাইন সম্প্রদায় ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ইংরেজদের আগমনের আগ পর্যন্ত এই সংখ্যাধিক্য অটুট ছিল। বর্তমানে রামুতে যে সকল বৌদ্ধ পূরাকীর্তি বা প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্য শিল্প রয়েছে, বিশেষ করে দৃষ্টিনন্দন শিল্পঐশ্বর্যে কাঠের তৈরি বিহারগুলো রাখাইনদের স্বর্ণোজ্জ্বল যুগের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে এসব পূরাকীর্তির মধ্যে কোনটি সবচেয়ে প্রাচীন? সঠিক দিনক্ষন এভাবে নিরুপন করা যায়নি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে (খ্রিস্টপূর্ব ৩০৮) রামকোটের পাহাড়ের উপর সম্রাট অশোক রামকোট (রাংকুট) বনাশ্রম বৌদ্ধবিহারটি নির্মাণ করেন। এই বিহারের সংরক্ষিত বুড়া গোঁসাই মূর্তির মাঝেই গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থি স্থাপিত হয়েছে। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এর ভ্রমণকাহিনীতে উল্লেখ আছে, বিহার নির্মাণের পরর্বতী সময়ে সেখানে সাত’শ ভিক্ষু বসবাস করতেন। কালের পরিক্রমায় অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে। কিছু কিছু হারিয়ে যাওয়ার পথে। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সাম্প্রদায়িক হামলায় এরকম বেশ কয়েকটি প্রাচীন পুরাকীর্তি ধ্বংস করা হয়েছে। মুছে ফেলা হয়েছে ইতিহাসের পাতা থেকে।
তবে পুরাকীর্তি ও প্রতœতাত্তিক নিদর্শনের ঐতিহ্য বহন করে এখনো স্বগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, এমন নিদর্শনের সংখ্যা রামুতে এখনো কম নয়।
শ্রীকুল গ্রামে কাঠের তৈরি শ্রীকুল রাখাইন বৌদ্ধ বিহার। এটি নির্মাণ করা হয়েছে ১৮৯৯ সালে। ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের লামার পাড়া গ্রামে অবস্থিত থোয়াইংগ্যা চৌধুরীর ক্যাং। তবে গ্রামের নামানুসারে এটি লামারপাড়া ক্যাং নামেই পরিচিত। ১৮০০ সালে তৎকালীন রাখাইন জমিদার উথোয়েন অংক্য রাখাইন এটি প্রতিষ্ঠা করেন। পাড়ার ভেতরের শান্ত নিথর কিছুটা পথ মাড়িয়ে এ ক্যাং-এ পৌঁছালে এখনো চোখে পড়ে, আশ্চর্য হবার মতো বড় বড় দুটি পিতলের ঘন্টা। পিতলের তৈরি এগুলো দেশের সবচেয়ে বড় ঘন্টা। এখানে আরও সংরক্ষিত আছে অষ্টধাতু নির্মিত দেশের সবচেয়ে বড় বুদ্ধমূর্তি এবং প্রাচীন শিলালিপিসহ ঐতিহাসিক স্মৃতি চিহ্ন।
রেঙ্গুনী কারুকাজে তৈরি প্রায় দুইশ বছরের প্রাচীন এ বিহারের নির্মাণশৈলীও দারুন চমৎকার। কিন্তু উপযুক্ত পরিচর্যা এবং রক্ষণা-বেক্ষণের অভাবে বর্তমানে এ বিহারটির ভগ্নদশা।
১৮৯৯ সালে তৈরি চেরাংঘাটা উসাইসেন বৌদ্ধ বিহার। স্থানীয়ভাবে বড় ক্যাং নামে পরিচিত। এ বিহারের নির্মাণশৈলীও দারুন। রক্ষণাবেক্ষনের অভাবে কাঠের তৈরি বিহারগুলোর মধ্যে প্রায় দেড়’শ বছরের পুরনো হাজারীকুল রাখাইন বৌদ্ধ বিহার ও দক্ষিণ শ্রীকুল গ্রামে অবস্থিত লাহ-পেঁ-বাঙ-রঙ ক্যাং বা সাংগ্রীমা ক্যাং বর্তমানে ধ্বংস স্তুপে পরিণত হয়েছে।
রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কের পাশ ঘেঁষে পাহাড় চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে বিশালাকার জাদী। এটি লাওয়ে জাদি নামে পরিচিত। এক সময় ওই জাদির সীমানা প্রাচীরের উপর দাঁড়ালে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত দেখা যেত। এখন পাহাড় ধ্বসের কারণে সেই সীমানা প্রাচীরও ভেঙ্গে গেছে। উত্তর-দক্ষিণ পাশে পাহাড় ধ্বসে জাদির গোড়া ছুঁয়েছে। এঅবস্থায় পাহাড় ধ্বস ঠেকাতে দ্রুত গাইডওয়াল নির্মাণ করা না হলে এটি রক্ষা করা যাবেনা।
রামুর পোড়া মাটিতে আধুনিক স্থাপত্য শিল্প : ইতিহাস প্রসিদ্ধ রামুতে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেবর কাল রাতে ঘটে গেছে এক অবিশ্বাস্য ধ্বংসযজ্ঞ। যে ধ্বংসযজ্ঞে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে রামুর প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী এরকম বারটি নিদর্শন। পুড়ে গেছে মহামূল্যবান বুদ্ধের ধাতু, তাল পাতার উপর বিভিন্ন ভাষায় লেখা ত্রিপিটক, অনেকগুলো বুদ্ধমূর্তিসহ প্রাচীন প্রতœতাত্তিক নিদর্শন। পাশাপাশি ওই একরাতেই পুড়েছে এখানকার হাজার বছরের গর্বের ধন-সম্প্রীতি।
তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক প্রচেষ্টায় মাত্র এক বছরে বদলে গেছে রামুর দৃশ্যপট। সেই ধ্বংসস্তুপের উপর গড়ে তোলা হয় দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ বিহার। আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি নব নির্মিত সেই বিহারগুলোই এখন নতুন ইতিহাস। একদিন এ ইতিহাসের বয়সও হবে হাজার বছর।
রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহার, উত্তর মিঠাছড়ি বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র, রামু মৈত্রী বিহার, লাল চিং, সাদা চিং, অপর্ণাচরণ চিং, জাদী পাড়া আর্য্যবংশ বৌদ্ধ বিহার, উখিয়াঘোনা জেতবন বৌদ্ধ বিহার, উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামিত্র বন বিহার, চাকমারকুল অজান্তা বৌদ্ধ বিহারসহ নব নির্মিত এসব বৌদ্ধ বিহার যেন এখন নতুন ইতিহাস। এসব বিহারের ঐতিহ্য নিয়ে আবার নতুন করে সমৃদ্ধ এই রামু।
অন্য রকম আলোয় আলোকিত বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র : উঁচু নিচু পাহাড় টিলায় সবুজের সমারোহ। এ সবুজের মাঝে গড়ে ওঠেছে মানুষের বসতি। শান্ত কোমল পরিবেশে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্র্য মানুষকে অবিরাম কাছে টানার মত জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের উত্তর মিঠাছড়ি গ্রাম। সেই অসাধারণ সৌন্দর্য্যে ঘেরা পাহাড় চূড়ায় এক টুকরো সবুজের মাঝে ছিল বাঁশের তৈরি বিমুক্তি বির্দশন ভাবনা কেন্দ্র। এর সামনেই ছিল উত্তর-দক্ষিণ কাত হয়ে শোয়া গৌতম বুদ্ধ মূর্তি। সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বিহারটি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মূর্তিটি প্রায় অক্ষত থেকে যায়। অন্যান্য বিহারগুলোর মত এটিও নতুনভাবে নির্মাণ করে সেনাবাহিনী।
তবে সেনাবাহিনী বারটি বিহার নির্মাণ করলেও সবকিছু মিলিয়ে অসাধারণ রূপ পেয়েছে এ বিহারটি। বর্তমানে যে কেউ বিহারটি দেখে অভিভূত হবেনই। বিহারের চমৎকার নির্মাণশৈলী তো আছেই এ ছাড়াও বিহারের আঙ্গিনাকেও সাজানো দারুনভাবে। সেই অসাধারণ সৌন্দর্য্যের মাঝে নতুনভাবে শোভা পাচ্ছে একশ ফুট দীর্ঘ বিশালাকার আগের সেই মূর্তিটি। বর্তমানে এটি যেন অধারণের চেয়েও বেশি অসাধারণ। বলা যায়, রামুর বৌদ্ধ ঐতিহ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র।
‘অহিংসা, সাম্য ও মৈত্রীর বাণী নিয়ে বৌদ্ধ জাতিকে আলোর পথ দেখান মহামানব গৌতম বুদ্ধ। তিনি শান্তির প্রতীক, বৌদ্ধদের পথ প্রদর্শক। তাই এ মূর্তির নাম দেওয়া হয়েছে বিশ্বশান্তি সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধমূর্তি। বিহারকে নতুন করে সাজানোর পর এখন এ মূর্তিটিও নতুন রূপ পেয়েছে। জানালেন, ভাবনা কেন্দ্রের পরিচালকও এ মূর্তির প্রতিষ্ঠাতা করুনাশ্রী থের।
করুনাশ্রী ভিক্ষু আরো বললেন, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক সদিচ্ছার কারণে এ বিহারটি এরকম বনার্ঢ্য রূপ পেয়েছে। আর বিহারের আঙ্গিনাকে যত সুন্দর করে সাজানো যায়, এজন্য আন্তরিক চেষ্টা ছিল সেনাবাহিনীর। সেনাবাহিনীর পরিশ্রম আজ সফল হয়েছে।
জানা গেছে, পাহাড় চূড়ায় নির্মিত বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রের দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার পাশাপাশি নতুন মাত্রা দিয়েছে এ মূর্তিটি। বর্তমানে এটিই দেশের সবচেয়ে বড় বুদ্ধমূর্তি। মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন থেকে কারিগর এনে এটি তৈরি করা হয়। মিয়ানমারের কারিগর থোয়াইংছি রাখাইন দীর্ঘ সাড়ে তিনবছর কাজ করে মূর্তিটি তৈরি করেন। ‘এ মূর্তির মডেলও সংগ্রহ করা হয়েছে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনের ধাম্মাদূত বৌদ্ধ বিহার থেকে। ওই মন্দিরে সংরক্ষিত গৌতম বুদ্ধের মূর্তির আদলে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এ মূর্তির নির্মাণশৈলী দেশী বিদেশী সকল মানুষকে আকৃষ্ট করবে এবং দেশের পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটাবে।’ এ কথা বলেছিলেন নির্মাণ শিল্পী থোয়াইংছি রাখাইন।
বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার প্রাক্তন সভাপতি ও রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের অধ্যক্ষ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের বললেন, লালচিং, সীমা বিহারসহ অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি বেশকিছু প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার ও কিছু কিছু ঐতিহাসিক স্মৃতি চিহ্নের জন্য রামুকে পূরাকীর্তি ও প্রতœতাত্ত্বিক নির্দশনের পুণ্যভূমি বলা হত। এখন পুরনো অনেক কিছুই নেই, আবার নতুন হয়েছে অনেক। এখন নতুন-পুরনো মিলে নতুন এক রামু। তবে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি নব নির্মিত বিহারগুলোর আবেদনও কম নয়। তবে এরমধ্যে বিশেষ মাত্রা পেয়েছে বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।