রোহিঙ্গারা চিন্তিত বর্তমান নিয়ে, স্থানীয়রা ভবিষ্যত নিয়ে

রোহিঙ্গা সংকটের দুই বছর: কক্সবাজারের স্থানীয় বাংলাদেশী ও মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে তিক্ততা

কক্সবাজারের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আয়েশা বেগম গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশে বসবাস করছেন। ১০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ৮ফুট প্রস্থের একটি ঘরে বসবাস করে তার পাঁচ সদস্যের পরিবার।

সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেবার খবরে তিনি উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন। প্রয়োজনে আজীবন বাংলাদেশেই থাকতে চান তিনি।

আয়েশা বেগম বলেন, “আঁরা ন যাইয়ুম। তোয়ারা আরারে মারি হালাইলে মারি হালাও।” (আমরা যাবনা, তোমরা আমাকে মেরে ফেলতে চাইলে মেরে ফেল।)

তিনি বলেন, মিয়ানমারে তাদের কিছুই নেই। তাহলে কেন তারা সেখানে যাবেন?

গত দুই বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেসব পরিবর্তন এসেছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের অনেকেই এখন বাংলাদেশীদের কথা অনায়াসে বুঝতে পারে। একটা সময় ছিল যখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এলে দোভাষীর সাহায্য নিতে হতো।

কিন্তু এখন আর সে প্রয়োজন তেমন একটা নেই।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সবার বক্তব্য একই রকম। সবাই মোটামুটি একই ভাষায় নির্যাতনের বক্তব্য তুলে ধরেন।

মিয়ানমারে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হলেই তারা সেখানে ফিরতে আগ্রহী।

সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে তাদের তেমন একটা মাথাব্যথা নেই।

দু’বছর আগে রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল তখন উখিয়া-টেকনাফের মানুষ তাদের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিল।

অনেকে বাড়ির উঠোনে এবং ঘরে রোহিঙ্গাদের থাকতে দিয়েছিলেন।

এর অন্যতম কারণ ছিল ধর্মীয় অনুভূতি। কিন্তু এখন সেটির ছিটেফোঁটাও নেই।

কুতুপালং লম্বাশিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা আয়েশা সিদ্দিকা আক্ষেপ করে বললেন, রোহিঙ্গা বসতি তাদের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ” এখন সব জায়গায় বাড়িঘর হয়ে গেছে। আমরা আগে যেখানে ক্ষেত খামার করে খেতাম, ওসব জায়গায় রোহিঙ্গাদের ঘর উঠছে। আমরা গরু-ছাগলও পালতে পারতেছি না। ক্ষেত-খামারও করতে পারতেছি না।”

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে আদৌ ফিরে যাবেন কিনা সেটি নিয়ে তার সন্দেহ আছে।

সে রকম পরিস্থিতি হলে কী করবেন? এমন প্রশ্নে আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ” এভাবে পরিস্থিতির শিকার হয়ে থাকতে হবে। কী করবো? মাথা পেতে নিতে হবে আর কি।”

শুধু রোহিঙ্গা বসতি নয়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা নিয়েও বাংলাদেশীরা উদ্বিগ্ন।

ক্যাম্পের ভেতরে খুনোখুনির ঘটনা যেমন বেড়েছে তেমনি রোহিঙ্গাদের দ্বারা বাংলাদেশীদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশীদের মধ্যে তিক্ততা প্রকট আকার ধারণ করেছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আশরাফুল আফসার বলছেন, মানবতাকে রক্ষার জন্য রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সময় যত গড়িয়ে যাচ্ছে স্থানীয় মানুষের মাঝে উদ্বেগ তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

“কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষ চাচ্ছে রোহিঙ্গারা যাতে দ্রুত ফিরে তাদের দেশে ফিরে যাক এবং এখানকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত থাকুক,” বলছিলেন মি: আফসার।

দুই বছর পার হলেও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাবার কোন লক্ষণ নেই। এরই মধ্যে দুইদফা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মনে করছে, এ সংকট সহজে দূর হবার নয়।

কক্সবাজারে কর্মরত ফেডারেশন অব ইন্টারন্যাশনাল রেডক্রস এন্ড রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির উর্ধ্বতন কর্মকর্তা মারিয়া ল্যারিও বলেন, তারা এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছেন।

তিনি বলেন, ” আমরা আগামী দুই থেকে তিন বছরের চিন্তা করছি।”

রোহিঙ্গা সংকট গত দুই বছরে জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে বোঝা গেল, তারা ভবিষ্যত নিয়ে মোটেও চিন্তা করছেন না।

তাদের যত চিন্তা বর্তমান সময়কে ঘিরে।

অন্যদিকে স্থানীয় বাংলাদেশীরা উদ্বিগ্ন তাদের ভবিষ্যত নিয়ে।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ