রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রে অসংখ্য বিধবা

‘সেদিন ছিল সোমবার। গণ্ডগোল শুরু হওয়ার চতুর্থ দিন।

দুপুর বেলা। পাড়ার চারদিকে ঘিরে ফেলেছে মগ (মিয়ানমার) সেনারা। আমরা সবাই দৌড় দিই পার্শ্বের পাহাড়ে। কিন্তু দৌড়াতে পারেননি আমার বাবা। বয়স তাঁর ৯৫ বছর। তাই পেছনে ফিরে আমার বাবাকে আনতে যান আমার স্বামী। এই বাবাকে আনতে যাওয়াটাই আমার কাল হলো। স্বামী গেল। গেলেন জন্মদাতা বাবাও’—এই বলেই কাঁদছিলেন রোহিঙ্গা নারী নুরজাহান (৫৫)। রাখাইন রাজ্যের মংডুর ফকিরাবাজারের বাসিন্দা তিনি। পাঁচ কন্যা এবং এক ছেলে নিয়ে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছেন কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে। তাঁর স্বামী দিল মোহাম্মদ (৬০) এবং পিতা মোহাম্মদ শফি (৯৫) মিয়ানমারের সেনাদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন।

মিনারা বেগম (৪৫)। মংডুর ফকিরাবাজার মিজ্জালীপাড়ার বাসিন্দা। স্বামী আবদুল হাইকে হারিয়ে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে। মিয়ানমারের সেনা সদস্যরা এক রাতে ব্রাশফায়ারে একসঙ্গেই পাড়ার সাতজনকে হত্যা করে। সেই সেভেন মার্ডারের একজন হচ্ছেন আবদুল হাই।

রাজুয়া বেগমের (১৮) মাত্র এক বছর আগে বিয়ে হয়েছিল। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামী ফকিরাবাজারের মিজ্জালীপাড়ার বাসিন্দা যুবক নুরুল কবির। নুরুলকেও হত্যা করেছে সেনারা। নুর বেগম (২২)। তাঁর বাড়িও মংডুর ফকিরাবাজারের মিজ্জালীপাড়ায়। স্বামী আবদুর রহিমকে হত্যা করেছে সেনারা। এক ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে পালিয়ে এসে নুর বেগম আশ্রয় নিয়েছেন কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে।

সাজিদা বেগম (২৮) রাখাইনের বড় ধাইজ্যার বাসিন্দা। ঘরের পার্শ্বেই সেনা ক্যাম্প। সেদিন হেলিকপ্টার চক্কর দিয়ে পাড়ার ঘরগুলোতে রকেট লাঞ্চার ছুড়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রাণ বাঁচাতে পাড়ার লোকজন যে যেদিকে পারে ছুটতে থাকে। দৌড়াতে গিয়ে সেনাদের

সামনে পড়ে গিয়েছিল সাজিদার স্বামী আম্মাল হোসেন। গুলিতে হত্যা করা হয় তাঁকে। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে সাজিদা পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে। এখন আছেন কুতুপালং শিবিরে।

রাজুয়া বেগমের বয়স ১৮ বছর। রাজুয়ার চোখের সামনেই তাঁর প্রিয়তম স্বামীকে হত্যা করা হয়। আর কয়েক দিন পরেই রাজুয়ার বুকজুড়ে একটি সন্তান আসবে। রাজুয়া জানেন না অনাগত সন্তানকে নিয়ে কিভাবে তিনি পথ চলবেন।

রোহিঙ্গা শিবিরে এ রকম বিধবার ছড়াছড়ি। জাতিসংঘের হিসাবে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর ১৯ শতাংশেরই প্রধান এখন নারী। এই নারীদের বেশির ভাগই স্বামী হারিয়েছেন মিয়ানমার সেনাদের হাতে।

এদিকে সমাজসেবা অধিদপ্তর রোহিঙ্গা শিবিরের এতিমদের তালিকা করলেও বিধবাদের ব্যাপারে কোনো কিছু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না জানেন না কক্সবাজার জেলা সমাজসেবা বিভাগের উপপরিচালক প্রীতম কুমার চৌধুরী। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিধবাদের তালিকা করার ব্যাপারে সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের জানানো হয়নি। তাই এ রকম তালিকা করা হচ্ছে না। ’ তিনি জানান, রোহিঙ্গা শিবিরে এতিমের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। গত বুধবার পর্যন্ত এতিমের তালিকায় নাম উঠেছে ১১ হাজার ৫৭৭ জনের। এ সংখ্যা আরো অনেক বেড়ে যাবে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
সংশ্লিষ্ট সংবাদ

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।