রোহিঙ্গা গণহত্যায় মূল ভূমিকা রেখেছে ১৩ সেনা ও পুলিশ

১১ বছর বয়সী আ
রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নির্মূল অভিযানে মূল ভূমিকা রাখা মিয়ানমারের ১৩ সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাকে শনাক্ত করেছে লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

সংস্থাটি রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তুলতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চুক্তি কিংবা রোম সংবিধি অনুসারে ১১ কর্মকর্তার মধ্যে ৯ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ হাতে পেয়েছে অ্যামনেস্টি।

গত বছরের আগস্টে শুরু হওয়া রোহিঙ্গাবিরোধী নিধনযজ্ঞে এসব কর্মকর্তা হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।

জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র এ হত্যাকাণ্ডকে জাতিগত নির্মূলের জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। মানবাধিকার গ্রুপগুলো বলছে, সেখানে গণহত্যার প্রমাণ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছেন, বিশ্ব কেবল নীরব দর্শক হিসেবে এই বিভৎসতার সাক্ষী হয়ে থাকতে পারে না। তিনি এই বর্বরতাকে অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নির্মম অপরাধ ও গণহত্যা আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে ৯ মাসের বেশি গবেষণা করে ১৯০ পাতার প্রতিবেদনটি তৈরি করতে ৪০০ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে।

এতে বেআইনি হত্যাকাণ্ড, গণধর্ষণ, মৌলিক সম্পদ থেকে বঞ্চনা, রোহিঙ্গা গ্রাম পুড়িয়ে দেয়ার সাক্ষ্য ও বিবরণ দেয়া হয়েছে। আর এসব বর্বরতা চালানো হয়েছে বাছাই করে-করে ও ইচ্ছাকৃতভাবে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ দেশটিতে মুসলিম রোহিঙ্গারা কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রহীন ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছেন।

গত বছরের ২৫ আগস্ট ভোরে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার জবাবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সাধারণ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বর্বর অভিযান শুরু করে।

এর পর প্রাণ বাঁচাতে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। তার পর থেকে রাখাইনের প্রায় ৮০ শতাংশ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরগুলোতে আগে থেকেই দুই লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সহিংসতায় রোহিঙ্গাদের ঢল নামলে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখে।

অ্যামনেস্টি অভিযোগ করে জানিয়েছে, আগস্টে আরসার হামলার আগে ও পরে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এই নির্মমতা চালিয়েছে।

২০১৬ সালের অক্টোবরেও দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল।

আগস্টের সহিংসতা শুরু হওয়ার সপ্তাহ দুয়েক আগে দেশটির সামরিক বাহিনীর ৩৩ ও ৯৯ হালকা পদাতিক ডিভিশনকে রাখাইনে মোতায়েন করা হয়েছিল।

মিয়ানমারের অন্যত্র নিপীড়নেও এই দুটি কমব্যাট ডিভিশন জড়িত ছিল বলে প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে।

তবে পৃথক আরেক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা রয়টার্স মঙ্গলবার জানিয়েছে, ৩৩ ও ৯৯ হালকা পদাতিক ডিভিশন ওই গণহত্যা চালিয়েছে।

অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে দেয়া ও জবরদস্তিমূলক খাবার বঞ্চিতসহ সহিংসতার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।

মানবাধিকার সংস্থাটি জানিয়েছে, এসব কেবল দুর্বৃত্ত সেনা কিংবা ইউনিটসেরই কার্যক্রম ছিল না, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এটি ছিল উচ্চপর্যায়ের সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত হামলা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাখাইনে মারাত্মক অপরাধে জড়িত সেনা ও সজ্জা মোতায়েনের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে। পরে তাদের অপরাধ চাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

কারণ ওই দিনগুলোতে এ সেনাদের অবস্থান ও তৎপরতা তারা জানত কিংবা তাদের জানার কথা।

অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, সেনাপ্রধান মিন অং হ্লিয়াং সক্রিয়ভাবে নিধন অভিযানের দেখাশোনা করেছেন বলেও জানা গেছে।

সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে নোবেলজয়ী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন মিয়ানমার সরকার বর্বরতার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

রাখাইনের আক্রান্ত অংশে সব ধরনের মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। কেবল কূটনীতিক, মানবাধিকারকর্মী, উন্নয়নসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে সীমিতভাবে প্রবেশ করতে দেয়া হয়েছিল।

ভয়াবহ এ নির্মম অপরাধের দায়ে এ পর্যন্ত সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয়েছে। একটি গ্রামে ১০ রোহিঙ্গাকে হত্যায় তাদের সম্ভাব্য ভূমিকার জন্য কারাবন্দি করা হয়েছে।

এ ছাড়া সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বাধীন সব তদন্ত লোক দেখানো বলে জানিয়েছে অ্যামনেস্টি।

বলা যেতে পারে, রাখাইনের সহিংসতা ও পরবর্তী মানবিক সংকটের জন্য জবাবদিহিতা আদায়ের দিকে এগিয়ে যেতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে অ্যামনেস্টির বুধবারের প্রতিবেদন।

সোমবার মিয়ানমারের সাত সেনা কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডা।

তাদের মধ্যে রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মেজর জেনারেল মং মং সোয়েও রয়েছেন।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।