রোহিঙ্গা সেবার নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট করছে এনজিওগুলো

ফারুক আহমদ, উখিয়া:

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শরনার্থীদের মানবিক সেবা ও পূর্ণবাসন কর্মসূচি বাস্তবায়নের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে দায়িত্বরত বেশ কিছু এনজিও সংস্থা। বিনা টেন্ডারে ও গোপনে তাদের মদদপুষ্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিত্তিক ঠিকাদারের সাথে আতাঁত করে সেবার নামে দাতা সংস্থার বরাদ্দকৃত টাকা লুটপাট চালাচ্ছে। অর্থ লুটপাটের শীর্ষ রয়েছে এনজিও সংস্থা ব্র্যাক। চিহ্নিত ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বেশ কয়েক জন ব্র্যাক কর্মকর্তা রাতারাতি আঙ্গুরফুলে কলাগাছ বনে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করলে ব্র্যাকের ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি সহ অর্থ লুটপাটের ঘটনা বেরিয়ে আসবে এমনটা মনে করেন সচেতন মহল।

জানা যায়, মিয়ানমারের সেনা বাহিনীর নিষ্ঠুর নিযার্তন, হত্যা, ধর্ষন, অগ্নিসংযোগসহ নানা অত্যাচারের শিকার হয়ে প্রাণের ভয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রেবেশ করে। বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ১২টি অস্থায়ী অনিবন্ধন ক্যাম্পে প্রায় ১০ লাখের অধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। বিপন্ন রোহিঙ্গাদের মানবিক সেবা ও পূর্ণবাসনে আর্šÍজাতিক এবং দেশীয় এনজিও সংস্থা বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে মতে, এনজিও সংস্থা ব্র্যাক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্যানেটারি ল্যাট্রিন, গোসল খানা, টিউবওয়েল স্থাপন, শেড নিমার্ণ ও ত্রান সামগ্রী বিতরণ সহ নানা কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ও শিশু বিকাশ কেন্দ্র, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা কার্যক্রম ও রয়েছে তাদের। এসব কার্যক্রম ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিদেশি দাতা সংস্থা থেকে লক্ষ লক্ষ মার্কিন ডলার অর্থ সংগ্রহ করে এনজিও সংস্থা ব্র্যাক।

গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, উক্ত এনজিও সংস্থা স্যানেটারি ল্যাট্রিন, টিউবওয়েল স্থাপনের নামে ব্যাপক অর্থ লুটপাট করেছে। দুইটি রিং দিয়ে ল্যাট্রিন তৈরি ও পাশাপাশি টিউবওয়েল স্থাপন মারাত্বক স্বাস্থ্য ঝুঁকি দেখা দেওয়ায় খোদ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের নিবার্হী প্রকৌশলী মো: সোহরাব হোসেন এ বিষয়ে চরম আপত্তি তুলেন। ওই সময়ে ব্র্যাকের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ পত্রে রিপোর্ট প্রকাশিত হলে প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। দায়িত্বরত সেনাবাহিনী ব্র্যাকের স্বাস্থ্যঝুুঁকি সম্মত স্যানেটারি ল্যাট্রিন ও টিউবওয়ের স্থাপন বন্ধ করে দেয়।

খোঁজ খরব নিয়ে জানা যায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে লক্ষ লক্ষ বাঁশ সরবরাহ, ল্যাট্রিন স্থাপন গোসল খানা তৈরি ও শিশু বিকাশ কেন্দ্র নির্মাণ এবং টিউবওয়েল বসানোর কাজ করছে ঠিকাদার মেম্বার সালাউদ্দিন,জাহাঙ্গীর আলম, মের্সাস সালাউদ্দিন এন্ড ব্রার্দাস, ও এস আর কনেকট্রাশন। উক্ত তিনজন ঠিকাদার সিন্ডিকেট ব্র্যাকের রোহিঙ্গাদের মানবিক সেবার নামে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যামে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির কাজে ব্র্যাক প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উখিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, এনজিও সংস্থার কাজ নিয়ে ইতিমধ্যে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের সেবার নামে কিছু কিছু এনজিও ক্যাম্প ভিত্তিক কাজ করে ফায়দা লুটছে। বিশেষ করে এনজিও সংস্থা ব্র্যাক রোহিঙ্গা আসার পর থেকে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের জন্য স্যানিটেশন, ওয়াশ প্রোগ্রাম ও টিউবওয়েল এবং শেড নিমার্ণের জন্য বাঁশ সরবরাহ করে আসছে। এসব কাজে হাত দিয়ে ব্র্যাক তাদের পছন্দের ঠিকাদারকে গোপনে কাজ দিয়ে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করছে। উখিয়ার সচেতন মানুষ ব্র্যাকের বিরুদ্ধে অনিয়ম দুর্নীতির কারণে ফেঁসে উঠছে। ব্র্যাকের এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির কাজ তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তিনি আরো বলেন অন্যথায় ব্র্যাক এনজিও লুটপাট ও অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য জনগনকে সাথে নিয়ে সড়ক অবরোধ সহ কঠোর আন্দোলনের ডাক দিবেন বলে জানান।

ঠিকাদার নিয়োগ ও নিমার্ণ কাজ দেখভাল দায়িত্ব নিয়োজিত ব্র্যাকের বিমল চন্দ্র শীল জানান, ইতিপূর্বে ৬ লাখ বাঁশ সরবরাহ করা হয়েছে। বর্তমানে ২ লাখ বাঁশ ক্যাম্পে সরবরাহ করা হচ্ছে। এবং আগামী জানুয়ারী মাসে আরো ২৫ লাখ বাঁশ ক্রয় করার টার্গেট রয়েছে। এ ছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২ হাজারের মতো টিউবওয়ের স্থাপন করা হয়েছে আরো ১ হাজার স্থাপন করা হবে। ১৪ হাজারের মতো স্যানিটারি ল্যাট্রিন বসানো হচ্ছে। এসব নিমার্ণ কাজে ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে মেম্বার সালাউদ্দিনের মালিকানাধীন মেসার্স সালাউদ্দিন এন্ড ব্রাদার্স, জাহাঙ্গীর আলম এবং এস এস কনেকট্রাশন।

সরজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসানো স্যানেটারি ল্যাট্টিন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। স্থাপিত অধিকাংশ টিউবওয়েল পানি আসে না। শেড নির্মাণে নি¤œমানের বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করায় দাতা সংস্থার অর্থায়নে ব্র্যাকের এসব কর্মসূচী রোহিঙ্গাদের কাজে আসছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েক জন ঠিকাদার অভিযোগ করে বলেন গোপনে ক্যাম্প ভিত্তিক এসব ঠিকাদারকে উচ্চ মূল্যে কোটি কোটি টাকার কাজ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট করা হচ্ছে। গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, অনেক ঠিকাদার ২শত ৫৫ টাকায় প্রতি পিচ বোরাক বাঁশ সরবরাহ দিতে রাজি হলেও ব্র্যাকের কর্মকর্তা ২শত ৫৮ টাকায় বর্তমানে ক্রয় করছে। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির নাটের গুরু হচ্ছে ব্র্যাকের কর্ডিনেটর বিমল চন্দ্র শীল ও জেলা কর্মকর্তা অজিত কুমার নন্দি ও উখিয়া অফিসের মনির। ঠিকাদারকে উচ্চ মূল্যে কোটি কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দিয়ে তারাও হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। স্থানীয় মহিলা মেম্বারের স্বামী আজিজুল হক আজিজকে কাজ দিয়ে মোটা অংকের কমিশন নেন ব্র্যাকের মনির।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উখিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী বলেন, ব্র্যাকের এসব চলমান কাজের অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধ করে স্বচ্ছপ্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন সহ বিভিন প্রকল্পগুলো তদন্ত হওয়া উচিত।

অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা অস্বীকার করে ব্র্যাকের বিমল চন্দ্র শীল জানান ই-টেন্ডারের মাধ্যমে যোগ্যতা সম্পন্ন ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়। বিস্তারিত তথ্যের জন্য ব্র্যাকের মিডিয়া উইংয়ের ইফতে আরা নেওয়াজের সাথে যোগাযোগ করতে বললে তিনিও একই কায়দায় আবদুস ছালাম নামক কর্তাব্যাক্তি সাথে কথা বলতে পরামর্শ দেন।

এ রিপোর্ট লেখাকালীন সময়ে ব্র্যাক ঢাকার হেড অফিসের এরিয়া ম্যানেজার মাহাবুবল আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কক্সবাজারের দায়িত্বরত অনেক কর্মকর্তাকে চিনে না বলে জানিয়ে একটি মিটিংয়ে থাকার কথা বলে তথ্য দিতে গড়িমসি করেন। এভাবে গণমাধ্যম কর্মীদেরকে বিভ্রান্তি করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে তারা।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।