শাস্তি পাবেন নাসির-তামিমা

ফের আলোচনায় ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তার স্ত্রী তামিমা। এ নিয়ে সরগরম নেট দুনিয়া। চলছে নানা আলোচনা-সামলোচনা। এই দম্পতিকে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করায় প্রশ্ন উঠেছে বিয়ের বৈধতা নিয়ে।

দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়া শেষে পিবিআই বলছে, ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী তাদের বিয়ে বৈধ উপায়ে হয়নি। ফলে অবৈধভাবে বিয়ে করায় আইনগতভাবে ফেঁসে যাচ্ছেন দুজনেই। এ বিষয়ে ব্যাভিচার আইনে শাস্তির বিধানও রয়েছে। নাসির জেনেবুঝে অন্যের স্ত্রীকে বিয়ে করলে তার শাস্তিই বা কী হবে— এ নিয়েও চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। ব্যাভিচার আইনে শাস্তির কি শাস্তি হতে পারে সে বিষয়ে মত দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা।

আইনজ্ঞরা বলছেন, দণ্ডবিধির ৪৯৩ থেকে ৪৯৮ ধারা পর্যন্ত বিয়ে সংক্রান্ত অপরাধসমূহের সংজ্ঞা ও দণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত বলা আছে। আইনের ৪৯৪ ধারা অনুসারে, স্বামী বা স্ত্রী বর্তমান থাকা অবস্থায় আবার বিয়ে করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ওই ধারা মোতাবেক, স্বামী বা স্ত্রী বর্তমান থাকা অবস্থায় বিয়ে করলে প্রতারণাকারী স্বামী বা স্ত্রীর সাত বছর পর্যন্ত  কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। এক্ষেত্রে স্বামীর নতুন বিয়ে বাতিল না হলেও স্ত্রীর ক্ষেত্রে তা বাতিল হবে।

এ ছাড়া আগের স্ত্রীর যথাযথ অনুমতি নিয়ে বিয়ে করলে স্বামীকে সাজাও ভোগ করতে হবে না। তবে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। যদি স্বামী বা স্ত্রী সাত বছর পর্যন্ত নিরুদ্দেশ থাকেন এবং জীবিত আছেন মর্মে কোনো তথ্য না পাওয়া যায় এমন পরিস্থিতিতে পুনরায় বিয়ে করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না।

আর অন্যের বৈধ স্ত্রীকে জেনেবুঝে বিয়ে করলে সেই ব্যক্তির পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। অন্যদিকে আগের বিয়ের কথা গোপন রেখে প্রতারণার মাধ্যমে যদি পুনরায় বিয়ে করে, তবে প্রতারণা করে যাকে বিয়ে করা হলো, তিনি অভিযোগ করলে তা ৪৯৫ ধারা মোতাবেক শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ এ ব্যাপারে বলেন, ‘৪৯৪ ধারা অনুসারে স্বামী বা স্ত্রী বর্তমান থাকা অবস্থায় পুনরায় বিয়ে করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে, প্রতারণাকারী স্বামী বা স্ত্রীকে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।

যথাযথ বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া ছাড়া স্ত্রী আবার বিয়ে করলে নতুন বিয়ে বাতিল হবে। তবে স্বামী যখনই বিয়ে করবে নতুন বিয়ে বাতিল হবে না। কোনো স্বামী বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের অনুমতি নিয়ে বিশেষ কোনো কারণ দেখিয়ে বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে সালিশি পরিষদের কাছে আবেদন করলে, সালিশ পরিষদই তা যাচাইসাপেক্ষে পরবর্তী বিয়ের অনুমতি দিতে পারে। সেক্ষেত্রে পুনরায় বিয়ে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না।’

নাসির তাম্মীর বিয়ে প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইসরাত হাসান বলেন, ‘কোনো স্ত্রী তার স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে নির্ধারিত তিন মাস পর আবার বিয়ে করতে পারবেন। কিন্তু ডিভোর্স দেয়ার তারিখ থেকে তিন মাস পার না হতে নতুন করে বিয়ে করলে কিংবা ডিভোর্স না দিয়ে বিয়ে করলে ওই স্ত্রীর নতুন বিয়ে বাতিল হবে। আর এমনটা করলে স্ত্রীর সাত বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হবে। আবার কেউ জেনেশুনে অন্যের স্ত্রীকে বিয়ে করলে ওই বিয়ে দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা মোতাবেক সম্পূর্ণ বাতিল হবে। এক্ষেত্রে তা দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী ব্যাভিচার এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অপরাধ প্রমাণ হলে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, ‘যথাযথ প্রক্রিয়ায় ডিভোর্স না দিয়ে বিয়ে করলে স্বামী বা স্ত্রীর সাত বছর পর্যন্ত সাজা ও অর্থদণ্ড হতে পারে। এক্ষেত্রে স্ত্রীর বিয়েই বাতিল হয়ে যাবে। স্বামীর ক্ষেত্রে বিয়ে বাতিল না হলেও শাস্তি একই। আর সব কিছু জেনে কারো স্ত্রীকে (যথাযথ ডিভোর্স ব্যতীত) বিয়ে করলে সেই ব্যক্তির শাস্তি দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা মোতাবেক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। সেই সঙ্গে এমন সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হবে না। বরং তা আইন অনুযায়ী ব্যাভিচার।’

পিবিআইর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তামিমা রাকিবকে তালাক দেননি। আইনগতভাবে রাকিব তালাকের কোনো নোটিসও পাননি। তামিমা উল্টো জালিয়াতি করে তালাকের নোটিস তৈরি করে তা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। যথাযথ প্রক্রিয়ায় তালাক না দেয়ার ফলে তামিমা তাম্মী এখনো রাকিবের স্ত্রী হিসেবে বহাল রয়েছেন। দেশের ধর্মীয় বিধিবিধান ও আইন অনুযায়ী এক স্বামীকে তালাক না দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করা অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমন পরিস্থিতিতে ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তামিমা তাম্মীর বিয়ে অবৈধ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, তালাক হতে গেলে যে প্রসেস মানা দরকার তার কোনোটিই নাসির হোসেন ও তামিমা মানেননি।

তিনি আরও বলেন, তালাকপ্রাপ্ত হয়েছেন কিন্তু তালাক হয়নি এ বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে আমরা দেখলাম তালাক হতে গেলে তিনটি শর্ত লাগে।

প্রথমত সংশ্লিষ্ট কাজীকে উপস্থাপন করা, দ্বিতীয়ত যিনি তালাকপ্রাপ্ত হবেন অথবা যাকে তালাক দেয়া হবে তার বাসায় একটি নোটিস পাঠানো এবং তৃতীয়ত যিনি তালাকপ্রাপ্ত হবেন তার স্থায়ী ঠিকানায় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের মাধ্যমে একটি নোটিস পাঠাতে হবে।

বনজ কুমার মজুমদার বলেন, প্রথমটি হলেও দ্বিতীয়টিতে দাবি করা হয়েছে নোটিস রাকিব হাসানের বাসায় পাঠানো হয়েছে। কিন্তু যে তারিখে চিঠিটি রাবিক হাসানের বাসায় প্রসেস করা হয়েছে সেই সময় ওই বাসায় তিনি থাকতেন না। অর্থাৎ চিঠি প্রসেসের ছয় মাস আগে রাকিব অন্য বাসায় ছিলেন। যেই তারিখে চিঠিটি দেখানো হয়েছে সেই সময় ঠিকানাটি ভুল ছিলো। অর্থাৎ সেই ঠিকানায় রাকিব থাকতেন না ওই বাসায়। এই প্রসেসটি মানা হয়নি এবং তারা সঠিক কথা বলছেন না। নাসির ও তামিমা ডাকযোগে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে যে চিঠিটি দেখিয়েছেন তাও সঠিক দেখাননি বলে জানান পিবিআই প্রধান। কারণ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বলেছেন তিনি এমন কোনো চিঠি পাননি।

পিবিআই প্রধান আরও বলেন, তামিমা যে পাসপোর্ট ব্যবহার করেন তাতে তালাক দেখানো হয়েছে ২০১৬ সালে। কিন্তু ২০১৮ সালে পাসপোর্ট রিনিউয়ের সময় স্বামীর নাম রাকিব হাসান দেয়া হয়। আমরা বলতে পারি বিয়ে চলমান অবস্থায় তালাক দেখানো হয়েছে। নাসিরের উচিত ছিলো তামিমা যে তালাকনামাটি দেখিয়েছেন তা সঠিক কি-না যাচাই করা।

তালাকনামাটি জালিয়াতির মাধ্যমে হয়েছে এবং এই জালিয়াতিতে তামিমার মা সুমি আক্তার সহযোগিতা করেছেন বলে উল্লেখ করেন বনজ কুমার মজুমদার। এখন নাসির-তামিমার বিরুদ্ধে পিবিআই কোনো ব্যবস্থা নেবে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ