ট্রলারে চাকরি নিয়ে ইয়াবা পাচার করছে রোহিঙ্গারা

1-yaba-BG-72520130701192729-300x1891-140x100

ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে রোহিঙ্গারা চাকরি নিচ্ছে দেশীয় মাছ ধরার ট্রলারে। জেলে-মাঝি পরিচয়ের আড়ালে তারা জড়িয়ে পড়ছে ইয়াবা পাচারে। অন্যদিকে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছে ইয়াবা ব্যবসায়। র‌্যাবের হাতে ইয়াবা চালান ধরা পড়ার পর আটক করা হয়েছে একুশে প্রপার্টিজের মালিক আলী আহমদ ও তার দুই সহযোগীকে। এর আগে সাংবাদিক দম্পতিকেও ইয়াবাসহ গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। তবে রোববার যে চালান আটক হয়েছে তা স্মরণকালের সর্ববৃহৎ চালান। এক চালানে ২৮ লাখ ইয়াবা এর আগে উদ্ধার করা হয়নি। শত কোটি টাকা মূল্যের ইয়াবা চালানটি নামার কথা ছিল চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। র‌্যাব বঙ্গোপসাগরে দুটি নামহীন ট্রলার ধাওয়া করে একটি থেকে ২৭ লাখ ৫০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে। এই চালানেরই ৫০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে ঢাকা থেকে। গ্রেফতার করা হয়েছে চোরাচালান চক্রের প্রধান আলী আহম্মদ, তার সহযোগী হামিদ উল্লাহ ও মহিউদ্দিনকে। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, দুটি ট্রলারই মিয়ানমার থেকে আসছিল।
জব্দ করা ট্রলারের মালিক নুরুন্নবী মিয়ানমারের নাগরিক সিরাজের কাছ থেকে ট্রলারটি কিনেছিল ইয়াবা পাচারের জন্য। সিরাজও গত ডিসেম্বরে চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকা থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার ইয়াবা ও র‌্যাব-৪ লেখা একটি গাড়িসহ গ্রেফতার হয়। বায়েজিদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহসিন বলেন, সিরাজ পাঁচ বছর আগে এ দেশে আসে। তার ব্যবসায়িক অংশীদার মিয়ানমারের নাগরিক কাউছার থাকে বহদ্দারহাট এলাকায়। তারা চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার গহীরা উপকূল দিয়ে মাছ ধরার ট্রলারে ইয়াবা পাচার করে আসছে।
এর আগে গত ৬ জানুয়ারি বঙ্গোপসাগরের বহির্নোঙ্গরে একটি ট্রলার থেকে ১০ লাখ ইয়াবাসহ সাতজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। ওই ট্রলারের দুইজন জেলে মিয়ানমারের নাগরিক এবং ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে মাছ ধরার ট্রলারে চাকরি নেয় বলে জানান র‌্যাবের কর্মকর্তারা। গত বছরের ১৪ অক্টোবর বহির্নোঙ্গরে একটি মাছ ধরার ট্রলার থেকে ছয় লাখ ৮০ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুইজনকে আটক করেছিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের কর্মকর্র্তারা জানান, অভিযান চালানোর সময় ওই ট্রলারে ১০ জন ছিল। দুইজন ছাড়া বাকিরা সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাগরে লাফ দেওয়া আটজনের চারজনই ছিল মিয়ানমারের নাগরিক।
পুলিশ, র‌্যাব-৭ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সাগরপথে মাছ ধরার ট্রলার দিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং নগরীর পতেঙ্গা এলাকা দিয়ে ইয়াবা ব্যবসা করে কোটিপতি হয়েছে আনোয়ারার দিদার, সাতকানিয়ার মঞ্জুরুল আলম ওরফে কানা মঞ্জু, সাতকানিয়ার খাগরিয়ার আবদুস শুক্কুর, ছদাহার আলি আহমদ, টেকনাফের সাইফুল, চান মিয়া সওদাগর (বর্তমানে কারাগারে), সাতকানিয়ার শাহ আলম, পটিয়ার ছনহরার আবদুর রহিম, জিরির সরওয়ার, চট্টগ্রামের রিয়াজ উদ্দিন বাজার মহিউদ্দিন মার্কেটের আবুল কালাম, আনোয়ারার মানু, পটিয়ার শাহজাহান, রুবেল, জসিমউদ্দিন, হাসান, মনা, বাবু, শহীদুল ইসলাম, ওসমান গণি, ইসমাইল, চন্দনাইশের জাহাঙ্গীর আলমসহ অন্তত একশজন।
সামুদ্রিক মৎস্য আহরণকারী বোট মালিক সমিতি সূত্র জানায়, বঙ্গোপসাগর ও সাগরমুখী কর্ণফুলী, বাকখালী, সাঙ্গু, মেঘনা নদীতে প্রায় ৫০ হাজার মাছ ধরার ট্রলার ও বোট আছে। এসব নৌযানে ইতিমধ্যে জেলে-মাঝি হিসেবে কাজ নিয়েছে ১০ হাজার রোহিঙ্গা। কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে এসে বসতি গাড়ছে তারা। স্থানীয় প্রশাসনের নাগালের বাইরে থাকতেই মাছ ধরার ট্রলার ও বোটে করে সাগরে পাড়ি জমাচ্ছে রোহিঙ্গারা। মাছ ধরার নাম করে তারা বহন করছে মাদক। শুধু তাই নয়, সাগরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থানের তথ্যও দিচ্ছে ভিনদেশি পাচারকারীদের।
বিষয়টি স্বীকার করে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণকারী বোট মালিক সমিতির মহাসচিব আমিনুল হক বাবুল সরকার সমকালকে বলেন, ‘ইয়াবা পাচার বা পাচারকারীদের ব্যাপারে আমরা পুরোপুরি অজ্ঞ। মাছ ধরার নৌযান মালিকরা তাদের ট্রলার-বোট জেলেদের কাছে ভাড়া দেন। কিন্তু জেলে-মাঝিরা মাছ ধরে, নাকি অন্য কোনো অপরাধ করে তা মালিকদের অগোচরে থাকে।’ মাছ ধরার ট্রলারে রোহিঙ্গাদের চাকরি নেওয়ার ব্যাপারে তিনি জানান, ‘কারও প্রকৃত পরিচয় তদন্ত করার ব্যবস্থা আমাদের নেই। তাছাড়া লক্ষাধিক মাঝি-জেলের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালানো অসম্ভব।’ তবে এ সংকট মোকাবেলায় আগামী দুই-এক মাসের মধ্যেই চট্টগ্রাম, বাঁশখালী, মহেশখালী এবং বৃহত্তর নোয়াখালীর মৎস্য আহরণকারী বোট মালিক সমিতির সঙ্গে বসে একটি মনিটরিং সেল গঠনের পরিকল্পনা আছে বলে জানান তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বোট মালিক বলেন, টেকনাফের প্রায় তিন হাজার সমুদ্রগামী ট্রলারের অধিকাংশ এ পাচারে সম্পৃক্ত। বোট মালিক সমিতির মহাসচিব আমিনুল হক বলেন, ‘টেকনাফ সমিতির কাছ থেকে আমরা এ ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়েছিলাম। তবে তাদের সাড়া মেলেনি।’
র‌্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, চট্টগ্রামের আনোয়ারা-পটিয়া-চন্দনাইশ-সাতকানিয়ায় প্রায় ২০টি ইয়াবা পাচারের সিন্ডিকেট আছে। এসব সিন্ডিকেটে শতাধিক সদস্য আছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।