১০ পরিবারে চলছে স্বজনহারানোর আর্তনাদ

সেলিম উদ্দিন, ঈদগাঁও,
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিশেষ অভিযানের ধারাবাহিকতা স্থিমিত হওয়ার সুযোগে চকরিয়া উপজেলার খুটাখালীতে প্রায় ৯ তালিকাভুক্ত মানবপাচারকারী সম্প্রতি বাড়ি ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর বিশেষ অভিযানে ভাটা পড়ায় তাদের অনেকের সুদিনে দিন কাটাচ্ছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এতে করে এলাকার স্বজনহারা ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে বিরাজ করছে উদ্বেগ উৎকন্ঠা। তাদের দাবি এসব মানুষ নামের অKhutahlali Picমানুষ প্রতিশোধের নেশায় প্রতিবাদী স্বজনহারাদের যে কোন সময় বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। একটি জরিপে উঠে এসেছে উপজেলার ১৭ নং খুটাখালী ইউনিয়ন থেকে প্রায় ৮০/৯০ জন যুবক সাগর পথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে। এ সময় থানায় ডজন খানিক মানবপাচারকারীদের আসামী করে মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা রুজু হয়েছে।
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এ সময় চিহ্নিত মানবপাচারকারীদের আটক করে জেল হাজতে প্রেরণ করলেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অধিকাংশ মানবপাচারকারী জামিনে বেরিয়ে এসেছে। টেকনাফও উখিয়া থানা পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় বাঘা-বাঘা তালিকাভূক্ত মানবপাচারকারী মারা যাওয়ার পর তালিকাভূক্ত খুটাখালীর শীর্ষ মানব পাচারকারী হাছুসহ সহযোগীরা আত্মগোপন করে। বিগত সময় পুলিশ মানবপাচারকারীদের আটক করে। বেশ কয়েকমাস ধরে পুলিশী অভিযানে নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে মানবাপাচরকারী র্দুবৃত্তরা বাড়ি ঘরে ফিরে এসে আরাম আয়েশে দিনযাপন করছে। তারা বীরদর্পে চলাফেরা করার সুযোগ পাওয়ার কারনে ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে স্বজনহারাদের মাঝে।
এদিকে জেলার শীর্ষ মানব পাচারকারী খুটাখালী সেগুন বাগিচার সিরাজুল ইসলাম প্রকাশ হাছুসহ ৯ দালাল ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকায় জনমনে নানা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। দালাল হাছু পুলিশকে ম্যানেজ করে প্রকাশ্যে দ্বিবালোকে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চিহ্নিত এ দালালকে আইনের আওতায় আনার জন্য ভূক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করেছেন।
লিখিত অভিযোগে জানা গেছে উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়ন থেকে উল্লেখিত দালালদের খপ্পরে পড়ে ১০ পরিবারে চলছে স্বজন হারানোর আর্তনাদ। মালয়েশিয়ার নামে সাগর পাড়ি দেয়া এসব মানুষের মধ্যে রয়েছেন ইউনিয়ন সেগুন বাগিচার হাসেম ড্রাইভারের পুত্র হামিদুল হক (২০), বাগাইন্যা পাড়ার বদরার পুত্র বিরুল হাসান (২২), ফরিদুল আলমের পুত্র ফুরকান (২৬), ইসলামের পুত্র রবিউল আওয়াল হাসান (২৭) মনজুর আলম ড্রাইভারের পুত্র বুরহান (২১), চড়িবিল এলাকার মৃত ইউছুপের পুত্র আনোয়ার (৩৫), বাগাইন্যা পাড়ার মৃত গোলাম রব্বানের পুত্র মিজানুর রহমান (২৬), ভিলেজার পাড়া আবদুর রহিমের পুত্র ফুরকান প্রকাশ বাবুইয়া (২৬), সেগুন বাগিচার মনজুর আলমের পুত্র হেলাল উদ্দিন (২২), নয়াপাড়ার মোক্তার আহমদের পুত্র মনজুর আলম (১৮) হরইখোলার অহিদুল আলমের পুত্র মোহাম্মদ ইউছুপ (৩৫) ফরেষ্ট অফিস পাড়ার মৃত সিরাজুল মোস্তফার পুত্র আবদুল মুনাফ (৩৫) ভিলেজার পাড়ার অলি আহমদের পুত্র ছৈয়দ করিম (৩৫) আলম বকসুর পুত্র বাবলু (২৫) সুলেমানের পুত্র আলতাজ (৪৫) সেগুন বাগিচার মৃত নূর মোহাম্মদের পুত্র মোহাম্মদ হাসেম (২২), মোহাম্মদ ইউছুপের পুত্র ইসালাম (৩৫) কবির আহমদের পুত্র নূর কাদের (২৫) বাদশাহ মিয়ার পুত্র মোহাম্মদ ফারুক (২৩) ফরেষ্ট অফিস পাড়ার ইসলাম ফকিরের পুত্র মনুর আলম (৩৩) সেগুন বাগিচার আবদুল মালেকের পুত্র আবুল হাসেম (৩৪), উত্তর ফুলছড়ি বাশকাটার নুরুল ইসলামের পুত্র জাহাঙ্গীর আলম (২৭)।
ভূক্তভোগীদের দেয়া তথ্য মতে জানা গেছে, এসব দালালদের বিচরণ রয়েছে জেলার বিভিন্ন উপকূলীয় ইউনিয়নে। এছাড়াও পাড়া-গ্রামে তাদের সোর্র্স রয়েছে। এসব সোর্র্সের মাধ্যমে অসহায় গরিব লোকদের মালয়েশিয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ২০/৩০ হাজার টাকা নিয়ে সুবিধামত স্থান দিয়ে ভাঙ্গা-চোরা বোটে তুলে দেয়। বোটে তুলে দিতে পারলে এসব দালালদের দায়িত্ব শেষ। পরে এসব বোট ভাসতে ভাসতে থ্যাইলেন্ডে গিয়ে পৌঁছে। খুটাখালী আমান উল্লাহ’র দাবী বার্মাইয়া হাছু একজন চিহ্নিত আদম পাচারকারী। টেকনাফ থেকে খুটাখালী পর্র্যন্ত এসব জায়গায় তার দালাল ও সোর্স রয়েছেন। এসব লোকের মধ্যে যাত্রী ঠিক করে ঐ লোকদের কাছ থেকে কমিশন নিয়ে তাদের বোটে তুলে দেয় বার্র্মাইয়া হাছু। পরে অবস্থা খারাপ হলে ২/৪ দিন সে ঢাকা-চট্টগ্রামে গিয়ে গা ঢাকা দেয়। সে বার্র্মইয়া হওয়ার সুবাধে টেকনাফ, উখিয়া, ও খুটাখালীতে তার বিশাল সিন্ডিকেট রয়েছে।
এ ব্যাপারে ভূূক্তভোগী আমিন শরীফ, শামশুলহুদা, আলী হোসেন জানান, বার্মাইয়া হাছু খুটাখালীর কয়েকজন প্রভাবশালী লোকদের ম্যানেজ করে এ কাজ চালিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক মেম্বার জানান, হাছু দীর্র্ঘ দিন ধরে মালয়েশিয়া লোক পাঠাচ্ছে। তার বিশাল সিন্ডিকেট রয়েছে খুটাখালী, উখিয়া ও কক্সবাজারে। এ সিন্ডিকেট নিয়মিত মালয়েশিয়া লোক পাঠিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এর পেছন রয়েছে ৯ সদস্যের মানব পাচারকারী চক্র। তারা খুটাখালীর বিভিন্ন এলাকা থেকে যুবকদের মালয়েশিয়া পাচারের জন্য গড়েছে সিন্ডিকেট। এদের হাতে সমূদ্রে এ পর্যন্ত কত মানুষের সলিল সমাধি হয়েছে তার কোন পরিসংখ্যান নেই। এলাকার বেকার যুবকদের কাজ থেকে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে সমূদ্র পথে ঝুঁকি নিয়ে কাঠের বোটে তুলে দেয়া হয়েছে প্রায় কয়েক শতাধিক যুবককে। সম্প্রতি সৌদিআরব-দুবাই ভিসা বন্ধ হওয়ার পর মালয়েশিয়াকে আর্ন্তজাতিক পাচারের ট্রানজিট হিসাবে ব্যবহার করছে এ সংঘবদ্ধ আদম পাচারকারী চক্র। কয়েক দফায় খুটাখালী থেকে ইঞ্জিন নৌকা যোগে আদম পাচারের চেষ্টার বহু ঘটনা স্থানীয়দের কাছে ধরা পড়েছে। কিন্তু পাচারকারী দালালরা প্রশাসনের ধর পাকড়ের পরও খুটাখালীতে মালয়েশিয়া আদম পাচারে সক্রিয় রয়েছে।
নির্ভরযোগ্য সুত্র জানায়, গত ২৩ মাস ধরে বিভিন্ন পয়েন্টে মালয়েশিয়াগামী যুবকদের ট্রলার ডুবির ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে আতংক ও কান্নার রোল পড়েছে। অনেকের ভাই,স্বামী,বাবা হারিয়ে এখন নির্ভাক দৃষ্টিতে থাকিয়ে আছে কবে শুনবে মালয়েশিয়াগামী তাদের আত্মীয়ের মৃত্যুর খবর।
অন্যদিকে খুটাখালীর শীর্ষ দালালসহ সহযোগীর চাঞ্চল্যকর তথ্য ছবিসহ স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হলে খুটাখালীতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। প্রশাসন নড়েচড়ে উঠে। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে আদম পাচারকারী দলের সক্রিয় সদস্যরা ব্যাপক তোড়জোড় চালায়। স্থানীয় ক‘টি পত্রিকায় এসব আদম পাচারকারী দলের সদস্যদের লৌহমর্ষক কাহিনী ছাপা হলে এলাকা থেকে তারা পুলিশী আটকের ভয়ে গা ঢাকা দেয়। বিষয়টি দফরফা করতে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়েও লবিং শুরু করেন । মোটা অংকের টাকা খরচ করে এ মিশন থেকে রেহাই পেতে ক্ষমতাসীন দলের চুনোপুটি নেতাও ব্যবহার করছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব আদম পাচারকারীর সাথে খুটাখালীর বেশ ক‘জন দালাল সক্রিয় রয়েছে। তাদেরকে সাধারণ মানুষ জিম্মি করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন দালালরা। বাহুবল, গোষ্টি ও খুটাখালী বাজারে এসব পাতি দালাল নিজেদের জাহির করে মালয়েশিয়া, দুবাই, নেপাল, ওমান ও সৌদি আরবে লোক পাঠানোর গ্যারান্টি দেয়। বিশ্বাস জন্মানোর জন্য ব্যবহার করেন বাজারের ব্যবসায়ীদের ।
সম্প্রতি আন্দামান দ্বীপ থেকে ফিরে আসা হোছন মিয়া জানান, খুটাখালীতে চিহ্নিত ৯ জন মালয়েশিয়া আদম পাচারের দালাল রয়েছে। তাদের খপ্পরে পড়ে ২০ হাজার টাকা দিয়ে টেকনাফ থেকে বোটে উঠি। ৫ দিন ৫ রাত সাগরে ভাসতে ভাসতে আন্দামান দ্বীপে গিয়ে পৌছি। ১ সপ্তাহ উপোস থাকার পর গাছের পাতা লতা খেয়ে কোন রকম বেঁচে থাকি। তখন অনেক সঙ্গী না খেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। থাইল্যান্ড নৌবাহিনী সেখান থেকে উদ্ধার করে কারাগারে পাঠাই। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর বাংলাদেশ সরকার ও রেড ক্রিসেন্টের সহায়তায় অবশেষে দেশে ফিরে আসি। সরলতার সুযোগ নিয়ে অনেক পরিবার প্রধানদের মালয়েশিয়া পাঠানোর নামে সাগরে ভেসে দিয়েছে। এখন তাদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। খুটাখালীর সেগুন বাগিচা, চিতাখোলা, চড়ি বিল, গর্জনতলী, পূর্বপাড়া, হরইখোলা, শিয়াপাড়া, ও কচ্ছপিয়ায় এসব দালালদের আনাগোনা নিয়মিত দেখা গেলেও পত্রিকা সংবাদ ও ক্রসফায়ারের পর অনেক দালাল এলাকা ছেড়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানিয়রা।
এলাকাবাসির অভিযোগ, কতিপয় গুটিকয়েক পাতি নেতা এসব দালালদের রক্ষায় ইতিমধ্যে মোটা অংকের টাকা খরচ করছেন। বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হয়ে গেলে ভুক্তভোগি মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানো এসব পরিবারদেরকে মুখ না খুলতে মামলা-হামলার হুমকি দিচ্ছেন দালাল হাছু ।
সূত্র জানায়, বার্মাইয়া হাছু এলাকায় ছন্ধবেশে আদম পাচার করে যাচ্ছ। শুধু তাই নই তার বিরুদ্ধে এলাকায় জঙ্গী সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। আরকান মুজাহিদের কিছু সদস্য ঐ বার্মাইয়ার ঘরে প্রায় সময় যাতায়াত করে। তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন, মাদক পাচারসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা চিহ্নিত এ মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।