ইয়াবায় তিন বছরে কোটিপতি টেকনাফ শাপলাপুরের টেইলার জাহাঙ্গীর

নিজস্ব প্রতিবেদক

তিন বছর আগেও টেইলারিং কাজ করে কোন রকম সংসার চলতো জাহাঙ্গীরের। এক সময় ঋণের দায়ে এলাকা ছাড়ার পরিস্থিতি হয়েছিল। কিন্তু জাহাঙ্গীরের সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে সবকিছু পাল্টে গেছে। জীবন বদলেছে আলাদীনের প্রদীপের আর্শিবাদের মত। ইয়াবায় পা দিয়ে দ্রুত সময়ে কোটিপতির তকমা অর্জন করা জাহাঙ্গীর এখন শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের একজন।

ইয়াবায় বিদ্যুৎগতিতে জীবন বদলে যাওয়া জাহাঙ্গীরের বাড়ি টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শাপলাপুর এলাকায়। দরিদ্র পরিবারের জন্ম নেওয়া জাহাঙ্গীর ছোটবেলায় টেইলারিং রপ্ত করেন। পরে শাপলপুর এলাকায় টেইলারিং এর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ শুরু করে। আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারণে প্রায় সবার কাছে নিগৃত হতো জাহাঙ্গীর। এক সময় সিদ্ধান্ত নেন আর্থিক দৈন্যদশা পাল্টাবেন।

বাহারছড়া ইউনিয়নের শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সাথে হাত করে জড়িয়ে পড়েন ইয়াবা জগতে। ইয়াবা সংশ্লিষ্ট হয়ে মাত্র তিনবছরে কোটিপতি হয়েছেন। শুরুর দিকে পাচারকারী হিসেবে কাজ করলেও এখন নিজেই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। পৈত্রিক কুঁড়েঘর থেকে বের হয়ে জাহাঙ্গীর এখন নিজেই প্রাসাদ তৈরী করেছেন। বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে বছর খানেক আগে ভবন নির্মাণ করেছেন তিনি। তার ব্যাংক হিসাবও বিপুল অর্থে ভরপুর। এক সময় হাত পেতে জীবন চালানো জাহাঙ্গীরের চলাফেরার জন্য এখন ব্যক্তিগত গাড়িও রয়েছে।

জানা গেছে, শাপলাপুর এবং শাহপরীর দ্বীপের জেলেদের একটি চক্রের মাধ্যমে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে জাহাঙ্গীর। মিয়ানমার থেকে জেলেরা ইয়াবাগুলো শাপলাপুর উপকূলে নিয়ে আসে। আর সেই ইয়াবাগুলো ট্রলার থেকে রিসিভ করে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার উদ্দেশ্যে সিন্ডিকেট সদস্যদের দিয়ে পাচার করেন তিনি। মাঝেমধ্যে নিজেও ইয়াবার চালান নিয়ে যান। বেশিরভাগ ইয়াবার চালান পাঠায় চট্টগ্রামে অবস্থানরত তার আত্মীয়-স্বজনের কাছে।

শাপলাপুর এলাকার এক যুবক জানান, প্রায় বছরখানেক আগে মেরিনড্রাইভ সড়ক দিয়ে ইয়াবা নিয়ে কক্সবাজার যাওয়ার পথে হিমছড়ি এলাকায় পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল জাহাঙ্গীর। পরে মোটা অংকের লেনদেন করে ছাড়া পান তিনি। ওই ঘটনার পর আরও বেশ কয়েকবার পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার তদবিরে বেঁচে যান তিনি ।

টেকনাফ থানায় ওসি হিসেবে প্রদীপ কুমার দাশ যোগদান করার পর থেকে একের পর এক ইয়াবা ব্যবসায়ী ক্রসফায়ারের কারণে পুরো টেকনাফের চিত্র পাল্টে যায়। প্রাণ বাঁচাতে এলাকা ছাড়ে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। সেই হিসেবে জাহাঙ্গীরও কিছুদিন ফেরারী জীবনযাপন করে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের ওই নেতার প্রশ্রয়ে থেকে ফের প্রকাশ্যে চলাফেরা শুরু করে।

অভিযোগ আছে, ওই নেতার মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করেন জাহাঙ্গীর। তা না হলে ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে স্বীকৃত একজন ব্যক্তি এমন কঠিন পরিস্থিতিতে কিভাবে প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরাফেরা করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাহাঙ্গীরের সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য মো. রফিক উল্লাহ ওরফে পুতিন্না (৪৮) এবং শফিক উল্লাহ (২১)। তারা সম্পর্কে বাবা-ছেলে। গুণধর এই বাবা-ছেলের সাথে সিন্ডিকেট করেই ইয়াবা জগতে উত্থান ঘটে জাহাঙ্গীরের।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শতাধিক মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে টেকনাফের হ্নীলা, নয়াপাড়া ও সাবরাংসহ বিভিন্ন জায়গায় মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে টাকা পাঠান তারা। এরপর বিভিন্ন যানবাহনে করে ইয়াবা চলে যায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়।

২০১৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব মুসলিমদের ধর্মীয় সমাবেশ স্থল বিশ্ব ইজতেমা পালন করতে যাওয়ার নামে দফায় দফায় বিভিন্ন জেলা থেকে গাড়ির বহরের সুযোগে মাথায় পাগড়ী পড়ে পাগড়ীর ভেতর করে ইয়াবা চালান করার সময় ডিবির হাতে আটক হয়েছিলেন রফিক উল্লাহ।

স্থানীয়রা জানান, রফিক উল্লাহ ইয়াবা চালান নিয়ে ধরা পড়ে জেলে গেলে বাবার পার্টনারদের সাথে ব্যবসায় চালিয়ে নিয়ে গেছেন পুত্র শফিক উল্লাহ। নতুন করে দলে জাহাঙ্গীরকে টেনে ব্যবসা আরও জমজমাট করে তুলে। মাস অন্তর অন্তর বাবার সাথে জেলে দেখা করার নামে কিভাবে ইয়াবা সরবরাহ করবে সে পরামর্শ নিয়ে আসতেন শফিক উল্লাহ। প্রায় ২ বছর পর মাদক ব্যবসার পার্টনারদের সহায়তায় মামলার খরচ চালিয়ে ঢাকা কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্ত হয় রফিক উল্লাহ ওরফে পুতিন্না।
স্থানীয়দের কাছে বাপ-বেটা এবং জাহাঙ্গীরের মাদক ব্যবসার কথা স্বচ্ছ আয়নার মতো পরিস্কার হলেও খুঁটির জোরের প্রভাবে মুখ খুলতে পারেনা কেউই। কালো টাকার খবরদারীর কাছে মুখবন্ধ স্থানীয়দের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাপলাপুর এলাকার এক ব্যক্তি জানান, ‘রফিক জেলে থাকার সময় তার ছেলে শফিক জাহাঙ্গীরের সাথে সিন্ডিকেট করে ইয়াবা ব্যবসা চালু রাখে। কারাগার থেকে রফিকের পরামর্শে শফিক এবং জাহাঙ্গীর রমরমা ইয়াবা ব্যবসা করেছেন। আর তাদেরকে শেল্টার দিয়েছেন কথিত এক নেতা। ওই নেতার বিষয়ে প্রশাসন সবকিছু অবগত। কিন্তু তারপরও কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। তাদের কারণে শাপলাপুরের যুব সমাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।