এটাই কি শেষ ঈদ! আর ঈদ আসবে না?

এটাই কি শেষ ঈদ! আর ঈদ আসবে না?

মানুষের জীবনে একটা সময় আসে যখন পুরোনো স্মৃতির অ্যালবামের পাতা উল্টাতে বড় ভালো লাগে। ইংরেজিতে এটাকে বোধহয় নস্টালজিয়া বলে। বহু আগে বিশেষ করে ইউরোপে মনস্তত্ত্ব বিদ্যায় নস্টালজিয়া-কে এক ধরনের মনোরোগ ভাবা হতো। কিন্তু আধুনিক কালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে  এটি একটি সাধারণ, প্রকৃতিপ্রদত্ত পজিটিভ ভাবাবেগ, – a vehicle for travelling beyond the suffocating confines of time and space. কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান টি-  “পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়…”, এটি একটি নস্টালজিক গান। গানটির বয়সও নেহাৎ কম নয়। কবিগুরু গানটি লিখেছিলেন ১৮৮৫ সালে। তিনি জীবনের প্রথমভাগেই মাত্র সতেরো বছর বয়সে বিলেত যান ব্যারিস্টারি পড়তে । তখন থেকে তিনি পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন। স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত কবি রবার্ট বার্নস রচিত বিখ্যাত গান Auld Lang Syne রবীন্দ্রনাথের মানসপটে দাগ কাটল, দারুণভাবে।

“Should auld acquaintance be forgot, and never brought to mind? Should auld acquaintance be forgot, and auld lang syne?”

এই গানটি এতটাই জনপ্রিয় যে, কেবল স্কটিশভাষীরা নন, বরং ইউরোপের অন্যান্য ভাষার নাগরিকরা- যেকোনো  বিদায়ী অনুষ্ঠানে, সমাবর্তন, বর্ষবরণ প্রাক্কালে আরও শত বছর আগে থেকেই গানটি গাইতেন। নস্টালজিয়ার স্মৃতি বিজড়িত এই গান বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিতও হয়েছে। গানটি  বাংলায় অনুবাদ করলেন কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ।

পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়। ও সেই চোখে দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়।“

তিনি এমনভাবে গানটি বাংলায় অনুবাদ করলেন, বোঝার উপায় নেই এটির মুল একটি বিদেশি গান। গানটিতে তিনি ঢুকিয়ে দিলেন বাঙালির প্রাণের কথা, ‘মোরা ভোরের বেলায় ফুল তুলেছি’,  ‘দুলেছি দোলায়’ কিংবা ‘বাজিয়ে বাঁশি’ অথবা “বকুলের তলায়” প্রভৃতি। পশ্চিমা গানটিতে যেখানে গিটার প্রধান বাদ্যযন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে, কবি ব্যবহার করলেন, বাঁশি, হারমোনিয়াম, তবলা আর গিটার। এ গান দিয়ে তিনি বাঙালির অতীত স্মৃতিকে বুকের ভিতর জাগিয়ে তোলার সুযোগ করে দিলেন। কেউ কি বলতে পারবেন যখন এই গানটি বাজে একটা বারের জন্যে হলেও অতীত তাকে স্পর্শ করে না!  এ গানে বাঙালির প্রাণের আত্মিক অনুভূতিই অকৃত্রিমভাবে ফিরে আসে,  বারে বারে!। প্রতিটি বাঙালিই তার জীবনে, জীবদ্দশায় কতবার যে গানটি শোনে তার হিসাবও রাখা সম্ভব হয়ে ওঠেনা। আশ্চর্য,  আমরা যারা পুরানো হয়ে গেছি এবং প্রতিটা দিনই পুরানো থেকে পুরানোতর হয়ে যাচ্ছি, তাদের কাছে প্রতি দিনই গানটি নতুন হয়ে বাজে, নিয়ে যায় আমাদের অতীত স্মৃতির ভাণ্ডারে।

রোজার মাস এলেই আমার বুকের ভিতর উথালপাথাল করে, মনে পড়ে যায় আমাদের সেই শৈশবের রোজার সময়ের কথা। রোজার মাসকে বলা হয় সংযমের মাস। আমাদের শৈশবে আমরা অতটা সংযমের অর্থও বুঝতাম না। আমাদের কাছে রোজা ছিল, সারাদিন না খেয়ে থেকে রোজা রাখা আর ইফতারের সময় মজার মজার খাওয়া। রোজার মাসটা ছিল আমাদের আনন্দের মাস।

তখন আমাদের বাবা বেঁচে ছিলেন। আমার মায়ের সোনার সংসার। অনেকগুলো ভাইবোন আমরা। তবুও বাসার ভিতর হৈচৈ নেই, ভাইবোনের ভিতর মারামারি, কান্নাকাটি কিছু নেই। বাবার স্বল্প আয়ের সংসার, তারপরও  বাবা-মায়ের ভিতর ঝগড়াঝাটি নেই, কথা কাটাকাটি নেই। একজন আরেক জনকে খোঁচা দিয়ে কথা বলার রেওয়াজ নেই। কোরআন শরীফের এক সুরার আয়াতে বলা হয়েছে “সালামান সালামা”- সেখানে শুধুই শান্তি আর শান্তি। ঠিক, আমার বাবা-মায়ের সংসার ছিল সেই রকমই-শান্তির নীড়!

রোজার সময় বাবার অভ্যাস ছিল ইফতারে তার সব সন্তানদের নিয়ে একসাথে, পাটি বিছিয়ে ইফতার করবেন। মা থালায় ইফতার সাজিয়ে রাখতেন । বাবা ডাকতেন,  “এই কই তোরা ইফতারের সময় হয়ে এলো। রোজা ভাঙ্গার আগে ইফতার সামনে নিয়ে বসে থাকতে হয়”। আমরা ছুটে এসে একেকটা প্লেটের সামনে বসে পড়তাম। নিজের প্লেটে চোখ বুলিয়েই ট্যারেট্যারে অন্য প্লেটের দিকে তাকাতাম- আমার প্লেটে সব পেয়েছি তো! অন্য কোনো প্লেটে মা ভুল করে বেশি দেয়নি তো! বাবার প্লেটে সব সময়ই মা একটু বেশি দিতেন। তাতে আমরা যারা ছোট ছিলাম বাবার প্লেটে বেশি দেখলে আনন্দই হতো, কারণ বাবা আস্তে আস্তে তাঁর আশেপাশে যারা বসতো এটা ওটা তাদের পাতেই তুলে দিতেন। এখনকার সন্তানেরা, আমাদের সন্তানেরা কি কখনও বুঝবে বাবা বা মা যখন তাদের প্লেট থেকে কিছু তুলে দেন বুকের ভিতরের আনন্দের কাঁপুনিটা কেমন!

সবার সামনে প্লেটে সাজানো ইফতার। বাবার সামনে একটা হাফ প্লেটে থাকতো খোসা ছাড়ানো পানিতে ভেজানো ছোলার ডাল, মিহি করে কাটা আদার কুচি, পাশে এক বা দুই টুকরো কাগজি লেবু। বাবা নিজেই মাঝে মাঝে এই ভেজা ছোলা, আদা কুচির সাথে লেবুর রস চিপে চামচ দিয়ে আলতো নেড়ে মেশাতেন। মিশিয়ে নিজের প্লেটে নিয়ে আমাদের প্লেটেও অল্প দিতেন আর বলতেন, “ইফতারের খাবার মুখে দেওয়ার আগে সরবত খেয়েই আগে এইটা খাবে। চিবিয়ে চিবিয়ে খাবে। তাহলে ইফতারের খাবার ভালোভাবে হজম হবে”। জিনিসটা খেতে আমাদের খুব একটা ভালো লাগতো না। খেতে চাইতাম না! কাচা ডালের গন্ধ। তাছাড়া মন পড়ে থাকতো গরম পেঁয়াজু,  ছোলা আর পেঁয়াজ দিয়ে ভাজা মুড়ির প্রতি । এখন বুঝতে পারি ওই ছোলা, আদা আর লেবু হজমের জন্যে কতটা উপকারী ছিল।

সারাদিন পানি না খাওয়া, খাবার না খাওয়া মুখের ভিতরটা শুষ্ক, শুন্য পাকস্থলি। আমরা জানতাম রোজার সময় থুথুও গেলা যায় না। আবার সঙ্গী-সাথি,  অন্যদের,  আমি যে রোজা আছি তা জানানোর জন্যে কাউকে সামনে পেলেই বেশি বেশি থুথু ফেলতাম। যার ফলে দিনের শেষে মুখের ভিতরটা একেবারেই  শুকিয়ে থাকতো,  ঢোক গিলতেও কষ্ট হতো। মুখের ভিতরে আনাচে কানাচে, জিহ্বায়, মুখের তালুতে টেস্ট বাডের ছোট ছোট গ্রন্থিগুলি যা লালা নিঃসরণ করে ওগুলোও নির্জীব হয়ে  থাকতো। লেবুতে থাকে সাইট্রিক অ্যাসিড, আদায় জারক রস যা হজমে সাহায্য করে, আর ভেজা ছোলায় সহজ পাচ্য উদ্ভিজ্জ প্রোটিন। লেবুর সাইট্রিক অ্যাসিড মুখে যাওয়ার সাথে সাথে মুখের ছোট ছোট লালা গ্রন্থিগুলোকে সক্রিয়, জীবন্ত করে তোলে। আদার পাচক রস হজমের গ্রন্থিগুলোকে, ছোলার প্রোটিন খাদ্যনালী আর পাকস্থলীকে আভাস দেয়, তোমরা প্রস্তুত হও, খাবার আসছে। মুখ থেকে পাকস্থলী পর্যন্ত, শরীরের পরিপাকতন্ত্র এখন খাবার গ্রহনে  প্রস্তুত! কি চমৎকার বিজ্ঞান!

আমরা বেশি ছোটরা, সব রোজা রাখতে পারতাম না। মা বলতেন, বাবা বলতেন, “যখন বড় হবে তখন সব রোজা রেখো সোনামনিরা! তোমরা যে কয়টা রাখছো তাতেই আল্লাহ মহাখুশি হবেন”। আমরা ছোটরা একেকটা রোজা শেষ করতাম আর হাতের কড়ে গুনতাম আমার কয়টা রোজা হলো। আমার সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী ছিল আমার থেকে দেড় বছরের বড় বোন। আবার সঙ্গী-সাথিদের, পাড়ার সমবয়সীদের জিজ্ঞাসা করতাম তারা কয়টা রেখেছে। ওরা আবার আমার থেকে বেশি রোজা রাখলো না-তো!

গরমের সময় রোজা হলে, ইফতার শেষে মাঝে মাঝে তরমুজ খাওয়া হতো। তখন বাজারে ফ্রিজ  ছিল কিনা জানিনা, আমাদের ছিল না। মাঝে মাঝে বাবা আস্ত তরমুজ কিনে আনতেন। সেই তরমুজ সারাদিন রেখে দেওয়া হতো পানির চৌবাচ্চায়। তখন মফস্বল শহরে গোসলখানায় ইট সিমেন্টের তৈরি পানির চৌবাচ্চা থাকতো। আমারা বলতাম- “পানির হাউজ”। পানি তোলার লোক এসে প্রতিদিন টিউবওয়েল থেকে পানি এনে ওই “হাউজ”  ভরে দিত। টিউবওয়েল এর বরফ শীতল পানিতে ভরা “হাউজে” রাখার কারণে তরমুজটি ঠাণ্ডা থাকতো। ইফতার শেষ করে, নামাজ পড়ে এসে মা বারান্দায় বসে বটি দিয়ে  তরমুজটি কাটতেন, বাবা সহ আমরা মাকে ঘিরে গোল হয়ে বসে থাকতাম । তরমুজের প্রথম ফালি বাবাকে দিয়ে মা দিতেন তার সন্তানদের। আহারে! কিযে মজা লাগতো খেতে! ঠাণ্ডা তরমুজ লাল অংশে সামনের সারির দাত দিয়ে কামড় দেয়ার সাথে সাথে মুখ মিষ্টি রসে ভরে যেত। তরমুজের ফালির উপরের লাল অংশ খাওয়া হয়ে গেলে নিচের সাদা অংশে মা লবন ছিটিয়ে দিতেন আর বলতেন “খাও সোনা মানিকরা, কামড়িয়ে কামড়িয়ে খাও, এগুলো তে অনেক ভিটামিন আছে”।

শীতের সময় আখ পাওয়া যেত, গেন্ডারিয়া আখ। বাবা কিনে আনতেন। মাঝে মাঝে আমরাও কিনে আনতাম। আখ খেতে হয় শব্দ করে, পরিবেশ পারিপার্শ্বিকতা ভুলে।  আখ খাওয়ার সময় মুখের হা বড় করতে হয়। আখের আগা মাড়ির দাঁত দিয়ে চেপে কামড়ে ধরে হাতের হ্যাচকা টানে আখ ছিলতে হয়। হ্যাচকা টানে পর পর শব্দে উপরের ছাল (ছোকলা) উঠে আসে। এভাবে কয়েক টানে চারিদিকে সুন্দরভাবে ছেলার পর আখের মিষ্টি নরম, রসালো অংশ বেরিয়ে পড়ে। ব্যস, এখন আখের ছেলা অংশের বেশ খানিকটা মুখে দিয়ে আবারো মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়। মুখের ভিতর আখের নরম একটা মিস্টি রসালো টুকরো। মাড়ির দাত দিয়ে চিবানোর সময় মিষ্টি রসে মুখ ভরে যায়, আবেশে চোখও বুজে  আসতে চায়। । মুখের দুইপাশ দিয়ে মুখের ভিতর থেকে রস বেরিয়ে আসতে চায়, আসেও কিছুটা। ইফতারের পর​, বাসার দেয়ালের উপর বসে পাল্লা দিয়ে আখ খাওয়ার আনন্দ, তৃপ্তি আর কি কখনও আসবে আমাদের জীবনে!

রোজার সময় সেহেরিতে উঠে খাওয়াও ছিল বিশাল আনন্দের ব্যাপার। আমরা জানতাম সেহেরিতে খেতেই হবে। ঘুম ঘুম চোখে বিছানা থেকে উঠে আসতাম। সেহেরিতে মা রান্না করতেন। বেশির ভাগ সিদ্ধ ডিমভর্তা, ডাল ভর্তা, ওল কচু ভর্তা। গরমভাতের গন্ধ, সেই সাথে ডিমভর্তার গন্ধ সেহেরির পরিবেশটা কেমন যেন পবিত্র করে রাখত। সেহেরির প্রধান আইটেমই থাকতো দুধভাত ।  বাবা-মা সহ আমাদের সবার দুধ-ভাত ছিল একটা প্রিয় খাবার । বিশেষ করে আম আর দুধ ভাত, অথবা দুধ-কলা। যখন আম, কলা কিছুই থাকতো না- খেজুরের পাটালি । গরমের সময় যখন বাজারে নুতন আম আসা শুরু হতো, বাবা ব্যাগ ভরে নানা জাতের আম কিনে আনতেন। তখন কিন্তু কলমের আম এত পাওয়া যেত না। বাবা কিনে আনতেন ক্ষীরসাপাতি গোপালভোগ, ল্যাংড়া।  প্রথমে ভর্তা বা ছোট মাছের  চচ্চড়ি দিয়ে অল্প একটু ভাত খাওয়ার পর মা সবার থালায় দুধ আর ভাত দিতেন । মা ব্যাগ থেকে একটি করে আম বের করে অল্প একটু ছিলে জিভের আগা দিয়ে হালকা ছোঁয়ায় দেখে নিতেন আমটি মিষ্টি কিনা।  মা আম ছিলে ছিলে সবার থালায় দিতেন, আর বাবা, আমরা যারা ছোট, তাদের আমটি চিপে দুধ ভাতের সাথে মিশিয়ে দিতেন । খাওয়ার শেষের দিক থালায় কিছু আম মিশানো দুধ রয়ে যেত। বাবা বলতেন, আমের আটি দিয়ে দুধগুলো চেটে খাও।  আমরা আমের আটি দিয়ে দুধ চেটে চেটে খেতাম।

আমার মায়ের একটা কাপড় সেলাই এর সিঙ্গার হাত মেশিন ছিল। মা সারা বছরই মেশিনে কিছু না কিছু সেলাই করতেন! মায়ের মতই মেশিনটিও ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠতো ঈদের আগে। মায়ের হাতের ভিতর বিরামহীন মেশিনটি ঘুরে চলতো, খটাখট, খটাখট, খটখটখট….। শৈশবে রেডিমেড গার্মেন্টস এর নামই শুনিনি! ঈদের আগে বাসায় কেনা হতো কাপড়ের দোকান থেকে থান কাপড়!বোনদের কামিজের জন্য কাপড়, ছোট বোনদের ফ্রকের জন্যে কাপড়। ছেলেদের শার্টের জন্যে কাপড়। হাফপ্যান্টের জন্যে কাপড়। মায়ের জন্যে বাবা কিনতেন শাড়ি। শার্ট, প্যান্ট, কামিজ ফ্রক পেয়েই আমরা ভাই-বোনেরা মহা খুশি। ম্যাচ করে জুতা কেনা, ব্যাগ কেনা, ইমিটেশনের গহনা কেনা, ম্যাচ করা থ্রি পিছ, ফোর পিছ কেনা, চিন্তা তো দুরে- কোনো ধারণাই ছিল না। শার্ট অথবা কামিজ, ফ্রকের সাথে যদি ভাগ্যক্রমে জুতা বা স্যান্ডেল পাওয়া যেত- সেটা হতো সাত রাজার সম্পদ পাওয়া।

রোজা রেখে সারাদিনের পরে, ইফতার, নামাজ আর রাতের খাওয়া শেষে মা বসতেন দোকান থেকে কেনা কাপড়গুলো দিয়ে ঈদের জামা, ঈদের পোশাক বানাতে! একেক দিন একেক সন্তানেরটা তিনি ধরতেন। মা সেলাই করতেন রাত জেগে। ঘুমানোর আগে একবার হলেও জিজ্ঞাসা করতাম, “ও মা আমারটা কবে বানাবে”! মা মৃদু হেসে কপালে একটা চুমু দিয়ে বলতেন, “এইতো সোনা, আজ আপার জামা বানাচ্ছি, কালকে মেজ আপারটা শেষ হবে। তারপর তোমার দাদা আর মেজ ভায়েরটা হলেই তোমার-টা ধরবো”! ঘুমানোর আগে আঙ্গুলের কড়ে গুনে বার বার হিসেব করতাম- আমারটা মা কবে ধরবেন।

যেদিন আমার শার্ট বানানোর দিন আসতো, আমার হিসেব মতে, সকালে উঠেই মাকে জিজ্ঞাসা করতাম, “মা আজকে আমার শার্ট বানাবে”? মা একটু মন খারাপ করে বলতেন, “না বাবু, তোমার দাদা আর মেজ ভায়েরটা এখনও শেষ করতে পারিনি। ইনশাল্লাহ দুই দিন পরেই তোমার শার্ট ধরবো”! মায়ের কথা শুনে চোখ ফেটে পানি চলে আসতো! মা আজকে আমার শার্ট শুরু করবেন না, আমার বুঝি আর এবার ঈদে নতুন জামা পরা হবে না! মায়ের সামনে থেকে ছুটে পালিয়ে যেতাম।

দুদিন চলে যায়। সকাল থেকেই টেনশনে থাকতাম! মা-কি আজ আমার শার্ট বানাবেন! মা-কে জিজ্ঞাসা করতাম না, কিছুটা অভিমান, কিছুটা ভয়- বার বার জিজ্ঞাসা করলে যদি মা রেগে যান! সন্ধ্যায় ইফতারের পর, মায়ের নামাজের আর রাতের খাবারের পর অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকতাম, বার বার কান পেতে শুনতাম মেশিনের ঢাকনা খোলার শব্দ শোনা যায় কি-না। বুকের ভিতর অস্থির লাগতো, বুক ঢিপ ঢিপ করতো। মা-কি আজকেও আমার শার্ট শুরু করবেন না! গলার কাছে কেমন যেন কান্না কান্না ভাব চলে আসতো। হঠাৎ মা ডাক দিতেন, আমার নাম নিয়ে বলতেন, “তোর চেক রঙের শার্টটা নিয়ে আয়তো- বাপ! ওই শার্টের মাপে তোর শার্ট বানাবো”। মুহূর্তে সব অভিমান সব অস্থিরতা, উৎকণ্ঠা রঙিন বাস্প হয়ে বুক থেকে বেরিয়ে যেতো!

দোকান থেকে কেনা কাপড়ের উপর আমার চেক শার্টটা রেখে কেচি দিয়ে মা কচ কচ করে কাপড় কাটতেন, আমার বুকের ভিতর খুশির ড্রাম বাজতো। মা কাপড় কাটতেন, কাপড়ের কিছূ ছোট ছোট টুকরো এদিক ওদিক পড়ে যেত। আমি আঁতকে উঠতাম। কেউ যদি কাপড়ের টুকরো দেখে ফেলে! তাহলে তো নতুন জামা পরার আনন্দই থাকবে না। কাপড়ের টুকরো দেখেই তো পাড়ার অন্যান্য ছেলে মেয়েরা বুঝে যাবে আমার ঈদের শার্ট কেমন কাপড়ের, কি রঙের! আমি কাপড়ের টুকরাগুলো মেঝে থেকে তুলে নিতাম, এমন কি কাপড় থেকে কোনো সুতা বের হলেও আমি সাথে সাথে কাপড়ের টুকরা গুলোর সাথে আমার প্যান্টের পকেটে যত্নে লুকিয়ে রাখতাম।

রোজা যে কয়টাই রাখি, প্রথম রোজা, সাতাশের রোজা আর শেষ রোজা রাখতেই হবে। বাবা-মা বলতেন “তোমরা ছোটরা প্রথম আর শেষ রোজা রাখলেই হবে”। শেষ রোজার দিন সকাল থেকেই বুকের ভিতর খুশির কাঁপুনি। রাত পেরোলেই ঈদ। আবার বুকের ভিতর সংশয়, অনিশ্চয়তা। যদি পরের দিন ঈদ না হয়! সন্ধ্যা বেলা যদি ঈদের চাঁদ না ওঠে! ভিতরে এক রকমের ছটফটানি। এই ছটফটানি নিয়েই জুতো জোড়া নিজ হাতে কালি করতাম। বার পালিশ করতাম। মা কাঠের আলমারীতে নতুন শার্ট বানিয়ে,  কয়লার আগুনের ইস্তিরি  দিয়ে ইস্তিরি করে রেখেছেন, কিছুক্ষণ পর পর উঁকি মেরে দেখে আসতাম। শার্টটি দেখার সময়, এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতাম, জানলা দিয়ে বাইরে দেখতাম, অন্য কেউ দেখে ফেললো কিনা। শেষ রোজার দিন দুপুরের পর থেকেই অস্থিরতা আরও বেড়ে যেত। বার বার পশ্চিম আকাশে চোখ চলে যেত। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার আগেই কলোনির  উন্মুক্ত জায়গায় মানুষ জমতে শুরু করতো, কেউবা রাস্তায় কেউবা  একতালা বাড়ির ছাদে। কিংবা মসজিদ প্রাঙ্গণে। বড়রা ধীর স্থির, একেক জায়গায় জটলা পাকিয়ে গল্প করতো। যত টেনশন যেন আমাদের, ছোটদের। একবার বাসার বাইরে, একবার ভিতরে, বার বার উকি দিয়ে দেখতাম বাবা আসছেন কিনা।  সবাই যদি চাঁদ দেখে ফেলে, আমি যদি দেখতে না পাই! কিংবা আমার সমবয়সীরা যদি চাঁদ দেখতে পায়, অথচ আমি যদি দেখতে না পাই! টেনশনে বুক ধড়ফড় করতো।

সূর্য পশ্চিম আকাশে ডুবে গেছে। গাঢ় কমলা রঙের আভা পশ্চিম আকাশে একেবারে মাটির কাছাকাছি। পশ্চিম আকাশের সন্ধ্যা তারা হালকা আলো ছড়িয়ে মিটিমিটি করে জ্বলছে। এখন সবাই পশ্চিম আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক পশ্চিম আকাশেই যেখানে সূর্যটা ডুবে গেছে তার একটু উপরেই ছোট ছোট কয়েকটা কালো মেঘের ভেলা। এই একটা রহস্য। সব সময় দেখেছি ঈদের নতুন চাঁদ ওঠার সময় সবাই যখন সূক্ষ্ণ একফালি হালকা ফ্যাকাসে রঙের চাঁদ  খুঁজতে ব্যস্ত থাকতো কোত্থেকে যেন কয়েক খণ্ড মেঘের ভেলা ঠিক ওই আকাশেই এসে হাজির হতো। সবাই মাথা উঁচু করে পশ্চিম আকাশে চাঁদ খুঁজছে। এক চিলতে চিকন চাঁদ- যেন এই দেখি, এই নেই! নজরে পড়ত, আবার মুহূর্তেই মিলিয়ে যেত। ফের খুঁজে পেলে আঙুল ঘুরিয়ে চিৎকার করে অন্যদেরকে দেখাতো । কেউ দেখতে পেত, কেউ পেত না। এ যেন কি এক অপূর্ব প্রতিযোগিতা! স্বচোখে চাঁদ না দেখে ঈদ উদযাপনে যেন কোন মজাই নেই। হঠাৎ কেউ একজন চেঁচিয়ে উঠত, ঐ যে, ঐযে চাঁদ । সবাই, বিশেষ করে আমরা ছোটরা দৌড়ে তার কাছে ছুটে যেতাম। কই, কই চাঁদ? ভিতরে প্রচণ্ড উৎকণ্ঠা আমি কি দেখতে পাবো না। আমার সমবয়সী বিহারি ছেলে আনোয়ার সেও এক সময় দেখতে পায়। আমি পাইনে। কি যে কষ্ট বুকের ভিতর। সবাই যেদিকে তাকাচ্ছে, যেভাবে বলছে সে ভাবেই তাকাচ্ছি, যেদিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছে সেদিকেই তাকিয়ে আপ্রাণ ভাবে খুঁজি, চোখ জ্বালা করে তারপরেও চোখের পাতার পলক ফেলি না। আনোয়ার কাছে এসে বলে, কিরে চাঁদ দেখছিস।  কালো মুখ উজ্জ্বল করে, আমি ফ্যাকাসে হেসে, “বলি দেখছি”। আমার আবারও কান্না এসে যায়। আমি তখনও দেখতে পাইনি। বাবা পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন- “কি রে চাঁদ দেখতে পাসনি”? বলেই আমাকে কাঁধে তুলে নেয়, নিজের কাঁধে বসিয়ে বলেন “ঐ যে দুরে যে একটা তারা দেখা যাচ্ছে তার ডান দিকে তাকিয়ে থাক, খুব আবছা আলোর রেশ, খুব চিকন আর বাঁকা”। আমি পশ্চিম আকাশে তাকাতেই মূহূর্তেই দেখতে পাই। বিশ্বাস হয় না, আবারও তাকাই, “বাবা ও বাবা  আমি দেখতে পাচ্ছি, আমি দেখতে পাচ্ছি চাঁদ”, চিৎকার করে বলে উঠি। বাবা বলেন, “পাগল ছেলে। চাঁদ কে সালাম দাও। ঈদের চাঁদকে সালাম দিতে হয়”। বাসায় গিয়েই মাকে বলি, “মা ঈদের চাঁদ দেখেছি”। মা বলেন, “ঈদের চাঁদকে সালাম দাও নাই”? বলতে বলতে মা রান্না ঘরে চলে যান, কত কাজ তার।

নামাজে যাওয়ার আগে সকালে আমরা সবাই সেমাই খেয়ে নামাজে যাবো। নামাজ শেষে বাসায় এসেই মুগের ডালের ভুনা খিচুড়ি আর খাসির কলিজা ভুনা খাবো। তার প্রস্তুতি এই রাতেই হচ্ছে। খাঁটি ঘিয়ে সেমাই ভাজা হচ্ছে। মুগের ডাল ভেজে রাখছেন। পাটায় মসলা বাটা হচ্ছে। মা খুব ভোরে আমরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই রান্নাগুলি চুলোয় চড়িয়ে দেবেন। রান্না ঘরের ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকেই মা দৌড়ে ঘরে এসে,  কারো শার্টের হয়ত বোতাম লাগানো হয়নি- মা শার্টটা আর সুই সুতো বোতাম নিয়ে কোনো এক বোনকে দেবেন, বোতাম লাগানোর জন্যে। হয়ত বাবার নামাজে যাওয়ার পাজামার ফিতা ভরা হয়নি, অন্য বোনকে বলবেন কাজটা করতে। বড় আপা সেলাই মেশিন নিয়ে হয়তো ছোট কোনো এক বোনের ফ্রকের ঝুল ঠিক করতে বসে গেছেন। মেজ বোন পাটায় মেহেদির পাতা বাটছেন। বোনেরা হাতে মেহেদি লাগাবে,  আমরা ছোটরাও লাগাবো। ছেলেরা শুধু দুই কেনি আঙ্গুলে লাগায়। আর আমার মতো বেশি ছোট ছেলে হাতের তালুতে গোল করে লাগাতে পারে। মেহেদি লাগিয়ে হাত উচু করে ঘুমাতে যাই, যেন মেহেদি বিছানায় না লাগে, মেহেদি হাত থেকে খুলে না পড়ে। সকালে আবার বোনদের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে কারটা বেশি লাল হলো। প্রথমেই পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললে লাল রঙও কিছুটা চলে যেতে পারে। তাই মেহেদি আলতো করে তুলে ফেলে সরিষার তেল দিয়ে মুছে নিয়ে কিছুক্ষণ পর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতাম।

ঈদের দিনের সকাল। বের হওয়ার সময় বাবা ছেলেদের সবার গায়ে একটু আতর মেখে দিয়েছেন। চোখে সুরমা দিয়ে দিয়েছেন। নতুন জামার গন্ধ, সেই সাথে আতরের, এটাই বুঝি ঈদের গন্ধ, আনন্দের গন্ধ। নতুন শার্ট আর পাজামা পড়ে বাবা আর ভাইদের সাথে নামাজে  যাই। বার বার আড়চোখে নিজেকে দেখি, অন্যদের দেখি, মনে হয় সবাই আমার নতুন শার্টটার দিকে তাকিয়ে আছে। সুরমা চোখে দিলে বেশ কিছু সময় চোখে কচ কচ করে ফোটে। তবুও চোখে হাত দিয়ে ডলি না। মুখে মৃদু হাসি হাসি ভাব, বুক ভরা এক অনাবিল আনন্দ।

নামাজ থেকে এসেই আমাদের প্রথম কাজ ছিল বাবা আর মাকে সালাম করা। এর মধ্যেই মা গোসল সেরে নতুন শাড়ি পরে আসতেন, চুল আঁচড়াতেন, কিন্ত ভেজা চুল দিয়ে তখনো টপ টপ করে পানি পড়ত । বাবাকে সালাম করে মাকে সালাম করতাম, মা নিচু হয়ে বুকে চেপে ধরতেন। আলতো কোরে কপালে ছোট একটা চুমু দিয়ে বলতেন, “আমার সোনামনিকে আল্লাহ অনেক হায়াত দাও।”  মার বুকের ভিতর থেকে সরতে ইচ্ছে হতো না। সদ্য গোসল করা, ঠাণ্ডা শরীর, মুখে পন্ডস ক্রিম, গায়ে  ট্যালকম পাউডার, নতুন শাড়ির গন্ধ সব মিলিয়ে অদ্ভুত সুন্দর একটা গন্ধ- যে গন্ধের জন্ম এই পৃথিবীতে না।

আমরা নামাজে থাকাকালীন, মা কলিজা ভুনা আর চিকন চাল সেই সাথে সোনা মুগের ডালের খিচুড়ি রেঁধে ফেলতেন। পুরো বাসা চমৎকার এক ধরনের গন্ধে ভরে উঠতো। এটি কোনো তীব্র গন্ধ না, খাওয়ার লোভে জিভের পানি আসা গন্ধ না। এটি একটি ইচ্ছে জাগানিয়া গন্ধ, আনন্দের গন্ধ। বাসার কোথাও কোনো পারফিউমের গন্ধ নেই, কেউ কোনো পারফিউম মাখেনি, তবুও কী চমৎকার একটা গন্ধে সারা বাসা ভরে থাকতো ।

দুপুর বারোটার ভিতর দুই চোট খাওয়া হতো। তারপরও সবার অপেক্ষা আসল খাওয়া। পোলাও, কোরমা আর ঝাল মাংস। আমাদের দুই ঈদ মানে আমাদের অন্য ধর্মের বন্ধুদেরও ঈদ। ওরা শুধু আমাদের সাথে ঈদের নামাজে যেত না। ঈদগাহ থেকে বাসায় ফেরার যে পথ,  সেই পথে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করতো। নামাজ শেষে হাত ধরে আমরা বাসায় আসতাম। আমরা বাবাকে, মাকে সালাম করতাম ওরাও করতো। বাবা-মা আমাদের সাথে ওদেরও ঈদের সালামি দিতেন। ওরা দাঁত বের করে সালামি নিত। সারাদিন আমাদের সাথে থাকতো, আমাদের সাথে খেত, আমাদের সাথে বেড়াতো । রাতে আমরা তারাবাজি , হাউইবাজি পটকা পোড়াতাম, ওরাও পোড়াতো । হাউইবাজি পটকার বেড়িয়ে আসা সুতাতে ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে আগুন দেওয়ার সাথে রকেটের মতো, হাওয়ার বেগে আকাশে অনেক উচুঁতে উঠে যেত। উপরে উঠে এক সময় ফুটে উঠতো। আগুনের ফুলকি ছড়াত। আমরা, ওরা সবাই আকাশের পানে চেয়ে থাকতাম। কি অপূর্ব দৃশ্য, কি আনন্দ!  যেন প্রকৃতি গেয়ে উঠতো,  “আনন্দধারা বহিছে ভুবনে, দিন রজনী কত অমৃতরস উথলি যায় অনন্ত গগনে ”॥

কম তো হলোনা! প্রায় তিনযুগ এই প্রবাসেই আছি। রোজা এলেই যে যেখানেই থাকি আমি আমার দুই মেয়েকে নিয়ে ইফতারে বসব। মেয়েদের মা ঠিক বাংলাদেশি স্টাইলে প্রতিদিনই ইফতার বানাবেন, নিত্য নতুন ইফতার। আমার বড় মেয়ের সবচেয়ে প্রিয় আইটেম মুড়ি মাখানো। মেয়েদের মা ইফতার বানিয়ে প্লেটে সাজায়। আমি আমার দুই মেয়েকে নিয়ে  ইফতারে বসার সাথে সাথে উনি ছোট একটা গামলায় মচমচে মুড়ি নিয়ে আসবেন। আরেকটা বাটিতে কুচিকুচি করে কাটা গাঢ় সবুজ রঙের কাচা মরিচ, সাথে চিকন চিকন করে কাটা পেয়াজ, আদা, ধনের পাতা। আরেকটা বাটিতে ছোট ছোট করে কাটা পাকা টমেটো, আর কাটা লেবু কয়েক ফালি। প্যান্ট্রি থেকে সরষের তেলের বোতলও সামনে রাখবেন। বাসার উনি পেঁয়াজু, বেগুনী, বুট বেশি বেশি করে বানাবেন। ইফতারের প্লেটে সবার আইটেমগুলো সাজিয়ে বাকিটা রাখবেন মুড়িতে দেয়ার জন্যে। উনি জানেন এগুলো আমি মুড়িতে দেব। একটি গামলাতে পেঁয়াজু, বেগুনী ভেঙ্গে ভেঙ্গে মুড়িতে দেব। ছোলা মেশাবো। পেঁয়াজু, বেগুনী নিয়ে ছোট ছোট করে ভাঙ্গবো, তার সাথে ছোলা মিশিয়ে কাচা মরিচ, আদা, পেয়াজ, ধনে পাতা কুচি আর একটু সরিষার তেল দিয়ে অনেক্ষণ মাখাতে থাকি, আলতো করে। তার উপর লেবুর রস আর অল্প লবণ ছিটিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করি,  ইফতারের আর কতক্ষণ! ইফতারের ঠিক মিনিট দুয়েক আগে মুড়ি ঢেলে তার সাথে ছোট ছোট করে কাটা টমেটো নিয়ে আবার আলতো করে মেশাই। যতক্ষণ এই মাখানোর কাজটি করি, আমার দুই মেয়ে আমার এই মাখানোর কাজটি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখে। ওদের কাছে আমি যেনো মুড়ি মাখানোর বিশ্ব কারিগর। বিশেষ করে যখন পেঁয়াজু, বেগুনী, ছোলা সাথে কাঁচা মরিচ, পেয়াজ, ধনে পাতা, তেল আর লেবুর রস দিয়ে মাখানো শেষ হয়, দেখতে অপূর্ব লাগে, অপূর্ব গন্ধে রোজা রাখা শুকনো মুখে পানি এসে যায়। মনে হয় কথা বলার জন্যে হা করলেই মুখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়বে। আমি আমার বড় মেয়ে কে জিজ্ঞাসা করি, “একটু খাবি রে মা, রেখে দেবো তোর প্লেটে”? সে বলে, “না থাক- যদি কম পড়ে যায়”! আমি তার প্লেটের একপাশে একটু রেখে দিই । ইফতারের সময় হলে মেয়ে পানি মুখে দিয়েই ঐ মাখানো ছোলা-বেগুনী-পিয়াজু মুখে দিয়েই একটা শব্দ করে- উম! আমার বড় ভালো লাগে। অনেক সময় অফিস থেকে বাসায় আসতে একটু দেরি হয়ে গেলে সেদিন আর মুড়ি মাখাতে ইচ্ছে হয় না। আমি টেবিলে বসা মাত্র বড় মেয়ে বলবে, “বাবা ক্যান ইউ মাখা মুড়ি  প্লিজ”! আমার সমস্ত ক্লান্তি, ভালো না লাগা ভাব মুহূর্তে দুর হয়ে যায়। আমি মুড়ির গামলা নিজের কাছে টেনে নেই।

ঈদ আসে যায়! প্রবাসে ঈদের আমেজ খুঁজে পাওয়া যায় ঈদের নামাজের আসরে গিয়ে। সকালে ঈদের নামাজ, তারপর নতুন বাহারী পোশাক আর ঘরোয়া পরিবেশে রকমারী সুস্বাদু খাবার খেয়েই ঈদের আনন্দ শুরু হয়। আর সাথে পরিচিত জনদের বাসায় বেড়াতে যাওয়া। সন্ধ্যার ভিতর বেড়ানো শেষ হয়ে যায়। সবাই ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে আসে। পরের দিন কাজে যেতে হবে। এই দেশে এদের তো আর ঈদ হয় না, কাজেই আমাদের কাজে যেতেই হবে, যেতে হয়। আমি আমার প্রবাস জীবনের শুরু থেকেই চেয়েছি আমার পরিবারে যেন ঈদ উদযাপন হয়। আমার কন্যাদুটি যেন তাদের ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়। ওরা তো আমাদের দেশের ঈদ তেমন একটা দেখেনি। আমাদের শৈশবের ঈদ ওদের কল্পনাতেও কখনও আসবে না। প্রবাস জীবনের এত যান্ত্রিকতার মাঝেও ঈদ ওদের জীবনে একটু আনন্দের আমেজ নিয়ে আসুক- এই সামান্য আনন্দ হয়ত আমার সন্তানদের কাছে অনেক বড় হয়ে উঠবে, যখন আমি থাকবো না।। সারা বছর ধরে ওরা ঈদের দিনের জন্যে নতুন জামা কাপড় তুলে রাখে। অন লাইনে অর্ডার দিয়ে নিয়ে আসে। এখানে মাঝে মাঝে মেলা হয়, বৈশাখী মেলা, শীতের পিঠে উৎসব, ঈদ উপলক্ষে মেলা, আমার মেয়েরা মনের আনন্দে মেলাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখে পছন্দ হলে ড্রেস কেনে, মালা কেনে, কানের দুল কেনে, বাসায় এনে তুলে রাখে ঈদে পড়বে বলে। দেখে আমায় বড় ভালো লাগে। বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি ওদের আনন্দে শরীক হওয়ার চেষ্টা করি। কেনা জামা পড়ে আমার ছোট মেয়ে সবার আগে আমার কাছে এসে বলবে,  “দেখতো বাবা আমার কেমন লাগছে? জানো বাবা ঈদে পড়ার জন্যে আমার অলরেডি তিন সেট ড্রেস হয়ে গেছে। ঈদ আসতে আসতে আরও দুই সেট হয়ে যাবে হয়ত”।

ঈদের আগের দিন এখানে ঈদের চাঁদ ওঠেনা, পটকা ফোটেনা, রেডিও টিভিতে হঠাৎ বেজে ওঠে না “রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ….”। আমরা ঈদের সাত দিন, দশ দিন আগেই জেনে যাই ঈদ কবে। আমরা খুশি হই তখনই যখন জানি এবার ঈদ উইকএন্ডে হবে। ঈদের নামাজ পড়েই অফিসে দৌড়াতে হবে না এটাই বুঝি ঈদের খুশির অন্যতম কারণ এই প্রবাসে। আমার ছোট মেয়ে ঈদের আগের সন্ধ্যায় আমার সাথে স্থানীয় দেশি গ্রোসারী শপে যেয়ে মেহেদি কিনবে। হাতে মেহেদি লাগানোর আগে, ঈদে জন্যে যতগুলো ড্রেস সংগ্রহ করেছে সব আমার সামনে আনবে, একেকটা দেখিয়ে বলবে,  “বাবা দেখো তো সকালে কোনটা পড়ে তোমার সাথে নামাজে যাবো, বিকালে কোনটা পড়বো- রাতে এইটা আমার ভালো লাগবে না”। আমি তাকিয়ে দেখি। আমি বুঝতে চেষ্টা করি তার উত্তেজনা, তার ঈদের আনন্দ। আর এ কারণে আমার বুকের ভিতরটা চিন চিন করে, চোখের কোণা দুটি ভিজে উঠতে চায়, এই বয়সেও। এই প্রবাসে আমাদের ঈদ উদযাপন হয়, উৎসব হয় না। নামাজ পড়ে বাসায় আসার সাথে সাথে আমার মেয়েরা আমাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে, আমি ওদের কে সালামি দিই। ওরা খুব আনন্দের সাথে, দাঁত বের করে সালামি নেয়। সালামিটা নিয়ে মায়ের কাছে রেখে দেয়। ওদের বোধহয় পরে আর সালামির অর্থের কথা মনে থাকে না। কারণ পরে আর কখনও মায়ের কাছে চেয়ে নিতে দেখিনি। বাসার উনি সকালে উঠেই মুগের ডালের খিচুড়ি রেধেছেন, সাথে খাসির কলিজা ভুনা। টেবিলে সাজানো। আমার একেবারের কাছে এসে বলেন, শোন এখন অল্প করে খিচুড়ি আর কলিজা খাও। দুপুরে পোলাও, কোরমা আর ঝাল মাংস খাবে। উনি গোসল করেছেন, নতুন পোষাক পড়েছেন, গায়ে ফ্লোরাল পারফিউম মেখেছেন।। আমার বুকের কাছে দাঁড়িয়ে বলেন, “আসো তোমায় সালাম করি”।

মেয়েরা সকালে উঠেছে, আমার সাথে নামাজে গেছে, বোধহয় ঘুম ঘুম ভাব চোখে লেগেই আছে। দুজনেই সোফায় আধশোয়া হয়ে টিভিতে অস্ট্রেলিয়ান কোনো একটা চ্যানেল দেখছে। বাসায় কোনো হৈচৈ নেই আশেপাশেও কোনো সাড়া শব্দ নেই। পরিচিতজনেরা অনেকেই নামাজ থেকেই কাজে চলে গেছেন। আমি নিঃশব্দে খাচ্ছি। কিচেনে উনি দুপুরের রান্নায় ব্যস্ত। পরিচিত যারা কাজে গেছেন হয়ত আজ ঈদের দিন একটু সকাল সকাল বাসায় ফিরবেন। আমার মেয়েদের, মেয়েদের মায়ের বিভিন্ন বাসায় যাওয়া শুরু হবে দুপুরের পর থেকে।  টেবিলে বসে ভুনা কলিজা দিয়ে খিচুড়ি খেতে খেতেই আমার ঈদের আনন্দ শেষ হয়ে যায়। খেয়ে এসে আমিও মেয়েদের সাথে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকি। ঈদের দিনের বাকিটা সময়টা আমি আমার দায়িত্ব,  আমার কর্তব্য পালন করবো। স্বামী হিসেবে, বাবা হিসাবে । আমি ওদেরকে গাড়িতে নিয়ে ওদের সাথে সাথেই ঘুরব, ঘুরতে হবে। ঈদের দিনে এতটুকু আনন্দ যদি ওরা পায়, তাই বা কম কিসে।

আমার কল্পনা করতে ভালো লাগে। শিশুকাল থেকেই, আমার মাথার ভিতর হরেক রকম ইচ্ছের পোকা সব সময় কিলকিল করতো, এখনও করে। অনেক ছোট বেলায় যখন গ্রামে ছিলাম, শীতের সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়া দুপুরে, খেজুর গাছ কাটা গাছি যখন কোমরে বাঁধা ছোট ঝুড়িতে ধারালো দা, বাঁশরে নল,  মাটির হাঁড়ি আর মোটা দড়ি নিয়ে খেজুর গাছের আগায় উঠে কোমরে মোটা  দাড়িটি দিয়ে নিজেকে বেঁধে ধারালো দা দিয়ে কুচকুচ করে খেজুর গাছ চাঁছতো । আমি মুগ্ধ নয়নে উপরে চেয়ে গাছিটির খেজুর গাছ চাঁছা দেখতাম। পরের দিন  সুর্য ওঠার আগেই গাছি এসে খেজুরের রসের হাঁড়ি নামিয়ে আনতো। গাছি গাছ তলায় আসার আগেই আমি ঘুম থেকে উঠে মাঘ মাসের শীতের সকালে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে গাছ তলায় এসে বসে থাকতাম। প্রতিটি গাছ থেকে গাছি রসের হাঁড়ি নামিয়ে আনতো । আমি তার পিছু পিছু ঘুরতাম । মুগ্ধ নয়নে তার প্রতিটি কর্মকান্ড দেখতাম। গাছি হয়ে ওঠে আমার কাছে শ্রেষ্ঠ মানুষ। মনের ভিতর কল্পনার স্বপ্ন করতাম, আমি বড় হয়ে খেজুর গাছ কাটা গাছি হবো।

মাঝে মাঝে চিন্তা করি আচ্ছা কোনোভাবেই কি অতীতকে, শৈশবের দিনগুলিকে স্মৃতি থেকে ঝেড়ে ফেলা যায় না! আমিতো একেবারেই নগন্য একজন মানুষ মাত্র। পৃথিবীর মহাজ্ঞানী-মহাজনেরা, বড় বড় পণ্ডিতেরা পারেননি, আমি তো কোন ছার। অনুসারীরা মহামতি অ্যারিস্টোটলকে মেমোরি নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। অ্যারিস্টোটল বললেন, Memory is the scribe of the soul মেক্সিকোতে জন্ম নেয়া একজন স্প্যানিশ চিত্র পরিচালক। বলা হয় তিনি পৃথিবীব্যাপী স্প্যানিশ চলচ্চিত্রের একজন সফল আর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক ছিলেন। তিনি সুরিয়েলিজমের একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। স্মৃতি নিয়ে তার কথা হচ্ছে –“Life without memory is no life at all, just as an intelligence without the possibility of expression is not really an intelligence. Our memory is our coherence, our reason, our feeling, even our action. Without it, we are nothing”.

অতীত সুরিয়েলিস্টিক, না রিয়েলিস্টিক,  নাকি আনরিয়েলিস্টিক, জানিনা। বুঝিও না অতোটা। তবে অতীত নিয়ে, শৈশব নিয়ে ভাবতে আমার ভালো লাগে। এটুকু বুঝি আমার শৈশব, আমার অতীত, আমার আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখছে। শুধু তাই নয় আমার শৈশবকে সম্বল করেই আমি কল্পনার হাওয়ায় ভাসতে থাকি। আমি আনন্দের সাগরে হাবুডুবু খাই। আমার কল্পনার রাজ্যে শুধু ঈদের দিনটি নয়, প্রতিটা দিন হয়ে ওঠে আনন্দময়।আনন্দে আমার চোখ দুটি ভিজে ওঠে।

যদি কোনো পূণ্য করে থাকি, তার বদৌলতে পরমকরুণাময় যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন আমি কী চাই- আমি মাথা নত করে, মিনমিনিয়ে আবেগে আপ্লূত হয়ে, কান্না ভেজা স্বরে তার কাছে একটা জিনিসই চাইবো, “দয়াময় আমি চাইনে ধন সম্পত্তি, চাইনে রূপবতী, …. !  আমাকে আমার শৈশবের দিনগুলি ফিরিয়ে দিন– যেখানে আমি আমার বাবার সাথে ঈদের নামাজে যাবো, বাসায় এসে প্রথমেই মায়ের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করবো। মা  তার দুই হাত দিয়ে আমাকে তুলে ধরবেন। সদ্য গোসল করে এসেছেন মা, নতুন শাড়ি পরেছেন। মুখে একটু পন্ডস ক্রীম মেখেছেন। মায়ের গায়ে নতুন শাড়ি, গায়ে মাখার সাবান আর ক্রিমের এক মিশ্রিত অপূর্ব গন্ধ। মা আমার মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরবেন। আমি ভেজা গলায় ফিসফিসিয়ে বলবো, মাগো আমায় একটু আদর করোনা, মা”!

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ