টেকনাফ উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন ট্রাইব্যুনালে প্রতিবেদন দাখিল

নিজস্ব প্রতিবেদক:

টেকনাফ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানের পুনঃভোট গণনায় বিজয়ী প্রার্থী তালা প্রতীকের ৯৬৩ ভোট লাপাত্তা ও ৮৪৬ ভোট ডাবল সীল দিয়ে নষ্টের ঘটনায় কক্সবাজারের টব অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়েছে। তোলপাড় চলছে এ ঘটনা নিয়ে। অনেকে ঘটনায় জড়িতদের খোঁজে বের করার দাবীও জানিয়েছেন। গত ২৯ সেপ্টেম্বর আদালতের দাখিল করা ২২টি কেন্দ্রের ভোট পুনঃগণনার প্রতিবেদন নিয়ে এ তোলপাড় শুরু হয়। আদালতের নির্দেশে ২২টি কেন্দ্রের ভোট গণনা কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনের একটি কপি এ প্রতিবেদকের হাতে পৌঁছেছে। এতে বিজয়ী প্রার্থী মরহুম মাওঃ ফেরদৌস আহমদ জমিরীর নিজ কেন্দ্রসহ তার নিজস্ব এলাকার ৪টি কেন্দ্রের পোষ্টমর্টেম রিপোর্ট তুলে ধরা হল। ওই ৪ কেন্দ্রের মধ্যে তালা প্রতীকের ভোট লাপাত্তা, তালা প্রতীকের ব্যালটে মাইক প্রতীকের একই ধাসের ও অধিকতর স্পষ্ট সীল দিয়ে ভোট নষ্টের মত বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। এসব অনিয়মের সাথে কারা জড়িতদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি ও আইনের আওতায় আনার দাবী উঠেছে সচেতন মহলের।
৫নং খারাংখালী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে :
৫নং খারাংখালী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের তালা প্রতীকের ৩শ’টি ব্যালেট পেপার পাওয়া যায়নি। উভয় কেন্দ্রে তালা ও মাইক প্রতিকে ১শত ৪৫টি সীল পাওয়া যায়। এ কেন্দ্রের ঘানি ব্যাগের সীলগালা নিখোঁত ছিল বলেও মনে হয়নাই। বড় ঘানি ব্যাগের সাথে ভিতরে নির্বাচনী ব্যবহারিত ছোট ঘানি ব্যাগটিও পাওয়া যায়নি। তালা প্রতিকের ব্যালটগুলোর প্যাকেট সীলগালা করা ছিল না। প্যাকেট অনেকটা ছিঁড়া অবস্থায় ছিল। ঠ (১) ফরমে এবং তালা প্রতিকের প্যাকেটের উপর তালা প্রতীকের ৭শত ৭৪টি ভোট লিপি আছে, এতে ৩শ’টি ব্যালেট পাওয়া যায়নি। একেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ছিল ১৯৭৭ জন। ভোট কাস্টিং হয়েছিল ১হাজার ৩৬টি। সব কিছু হিসাব করে তালা প্রতীকের ৭শ ৭৪টি ভোট থাকার কথা হলেও সেটা ৩’শটি ভোট পাওয়া যায়নি। বাকী গুলির মধ্যে ১’শ ৪৫টি ভোট তালা ও মাইকের উভয়ের সীল মারা পাওয়া যায়। উভয় প্রতীকের সীল দেওয়া ব্যালেট গুলোর মধ্যে মাইক প্রতীকের সীলটি অধিকতর স্পষ্ট।
১৪ নং নয়াপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে :
একই ভাবে ১৪ নং নয়াপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোট ১৯০৭টি । কাস্টিং ভোট ৯শত ৬২টি। এর মধ্যে তালা প্রতীকের ভোট থাকার কথা ৭শত ৩৮টি। কিন্তু এখানেও এই ঘানি ব্যাগে ব্যাবহারিত প্যাকেটে ১শত টি মুন্ডা ও ১’শটি ব্যালেট পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে তালা প্রতীকের খামে মধ্যে ১’শ টি করে দু’টি বান্ডিলে তালা ও মাইক প্রতীকের সীল দেওয়া পাওয়া যায়। উভয় প্রতীকের সীল দেওয়া ব্যালেট গুলোর মধ্যে মাইক প্রতীকের সীলটি অধিকতর স্পষ্ট ও একই রকম হয়।
১৮ নং কেন্দ্র আলী আকবর পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র :
১৮ নং কেন্দ্র আলী আকবর পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ভোটার ছিল ১৮’শ ৫৫। কাস্টিং ভোট ১১’শ ৬০। এর মধ্যে তালা প্রতীকের ভোট থাকার কথা ৯’শ ৯৫টি। ঘানি ব্যাগের ভিতর তালা প্রতীকের প্যাকেট গুলো ছিঁড়া ও এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায়নি। সেখানে তালা প্রতীকের ভোট ৯’শ ৯৫টি পাওয়ার কথা থাকলেও ৪’শ ২০টি ভোট পাওয়া যায়। এর মাঝে ৩’শটি ব্যালট উভয় প্রতীকের সীলা মারা পাওয়া যায়। সেখানে মাইক প্রতীকের সীল অধিকতর স্পষ্ট ও একই ধাসের। তালা প্রতীকের ২’শ ৬৩ প্যাকেট পাওয়া যায়নি। মাইক প্রতীকের খামে ৯টি ভোট নিখোঁতভাবে পাওয়া যায়নি।
২২নং ঝিমংখালী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র :
২২নং ঝিমংখালী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ঘানি ব্যাগটি যথাযথ সীলগালা ধারা বাঁধা ও সুরক্ষিত অবস্থায় ছিল না। এ কেন্দ্রের ঘানি ব্যাগের ভিতর সীলগালা বিহীন ছেঁড়া ২টি প্যাকেটে তালা প্রতিকের প্যাকেট গুলো পাওয়া যায়। তালা প্রতীকের ২’টি ছেঁড়া প্যাকেটের একটির ৫’শ ৪৭টি ব্যালেটের মধ্যে ৩’শ ৪৭টি বান্ডিল বিহীন খোলা অবস্থায় পাওয়া যায়। এ প্যাকেটে ২’শটি প্যাকেট একেবারেই পাওয়া যায়নি। অন্য প্যাকেটের ৩’শটির ব্যালটের মধ্যে ২’শটি পাওয়া যায়। ১’শটি ব্যালটের একটি বান্ডিল একেবারেই পাওয়া যায়নি। তাছাড়া এই রুপে তালা প্রতীকের মর্মে পাওয়া মোট ৫’শ ৪৭টির মধ্যে ২’শ ১’টি ভোট তালা ও মাইক উভয় প্রতীকের সীল দেওয়া পাওয়া । উভয় প্রতীকের দেওয়া সীল গুলোর মধ্যে মাইক প্রতীকের সীলটি অধিকতর পরিস্কার এবং প্রায় একই রকম হয়।
জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৪ মার্চ টেকনাফ উপজেলা পরিষদের নিবার্চন সম্পন্ন হয়। এতে বেসরকারী ফলাফলে মৌলানা ফেরদৌস আহমদ জমিরী তালা প্রতীকে ১৮৩৬৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রফিক উদ্দীন মাইক প্রতীকে ১৭১১৭ ভোট পেয়ে ১২৫১ ভোটের ব্যবধানে অবস্থান করেন। এরপর মৌলানা রফিক উদ্দীন হোয়াইক্যং ইউনিয়নের আলহাজ্ব আলী আছিয়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ব্যাপক অনিয়নের অভিযোগ আনে। অভিযোগ করা হয় ওই কেন্দ্রে মোট ১৯৭৮ জন ভোটারের মধ্যে ১৪৩৮ জন ভোট প্রদান করেন। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে ৭১৯ ভোট বৈধ ও ৭১৯ ভোট অবৈধ ঘোষনা করা হয়। পরবর্তীতে সুকৌশলে ফলাফল পরিবর্তন করে মাত্র ৮০ ভোট অবৈধ দেখিয়ে বাকী ভোট বিজয়ী প্রার্থীর পক্ষে দেখানো হয়। যা গণনা করলে প্রতিয়মান হবে। ওই কেন্দ্রের ভোট পুনঃগণনা করে যা পাওয়া যাই তাহল তালা প্রতীকের ২১২ ও মাইক প্রতীকে ৩২০ ভোট । যা ঠ (১) ফরমের সাথে মিল রয়েছে। তবে মাইক প্রতীকের প্যাকেটে সীল বিহীন ৫৫টি ও তালা প্রতীক ৮টি পাওয়া যায়। এর ফলে এতে করে বাদীর আবেদনকৃত ফরমটি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও বা ইতি মধ্যে এ ফরমটি সঠিক নই মর্মে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেষ্টিগেশ (পিবিআই) ইতি মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এ সংক্রান্ত স্বারক নং, ১৭.০৩.২২৯০.০০০.৬২,০০১.১৯-৪২২ তারিখ-২৬/১১/১৯ ইং মূলে টেকনাফ নির্বাচন অফিস এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন পিবিআইসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রেরণ করেছেন বলে জানিয়েছেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোঃ বেদারুল ইসলাম। উল্লেখ্য আদালতের আদেশে গত ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা হতে আদালতের এজলাস কক্ষে ১০টি কেন্দ্রের ভোট পুনঃগণনা পরবর্তীতে ২৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা হইতে বাকী ১২টির কেন্দ্রের ভোট পুনঃগণনা করা হয়। এসময় রিটার্নিং অফিসারের প্রতিনিধি টেকনাফ সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ আবুল মনসুর, জেলা নির্বাচন অফিসারের প্রতিনিধি, টেকনাফ উপজেলা নির্বাচন অফিসার মোঃ বেদারুল ইসলাম বাদী পক্ষের এ্যাডভোকেট মোস্তাক আহমদসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। আদালতের আদেশে ভোট পুনঃগণনা কমিটির দায়িত্ব প্রাপ্ত ৩জন এ্যাডভোকেট হচ্ছেন, এ্যাডভোকেট মোঃ বাকের, এ্যাডভোকেট আবুল আলা ও এ্যাডভোকেট মোঃ নুরুল হুদা ও সেরেস্তাদার মোঃ আয়ুব যৌথ স্বাক্ষরে গত ২৯ সেপ্টেম্বর এ প্রতিবেদনটি কক্সবাজার বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালতের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল বিচারকের বরাবরে দাখিল করেন। এতে সম্মিলিত ভাবে উল্লেখ করা হয় তালা প্রতীকের মর্মে মোট ৯৬৩টি ব্যালট উধাও, তালা প্রতিকের বান্ডিলে মোট ৮৪৬টি ব্যালট তালাও মাইক উভয় প্রতীকের সীল দেওয়া ৪টি কেন্দ্রের প্রত্যেকটিতে তালা প্রতীকের ভোট মাইক প্রতিকের চাইতে অনেকগুণ বেশী ছিল মর্মে সংশ্লিষ্ট খামে, ঠ(১) ফরমে উল্লেখ আছে। তালা প্রতীকের মোট ভোট মাইক প্রতীকের চাইতে বেশী থাকা শুধু তালা প্রতীকের বান্ডিল ও খাম হতে ব্যালট লাপাত্তা হওয়া সংশ্লিষ্ট ঘানি ব্যাগ গুলির বাহির ভিতরে সার্বিক অবস্থা শুধু তালা প্রতীকের বান্ডিলেই তালা ও মাইক প্রতীকের অর্থাৎ উভয় প্রতীকের সীল দেওয়া ব্যালট গুলোর মধ্যে মাইক প্রতীকের দেওয়া সীল গুলি প্রায় একই ধাসের হওয়া ইত্যাদি বিষয় গুলো প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে একই রকম হয়।
বিষয়টি এখন নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
উল্লেখ্য: দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় চলতি বছরের ১৪ জুন তিনি অসুস্থ হয়ে মুত্যুবরণ করলে পদটি শুণ্য হয়ে যায়।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয় নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করার জন্য নিবার্চন কমিশন বরাবারে পত্র ইস্যূ করেন। এর প্রেক্ষিতে নিবার্চন কমিশন আগামী ২০ অক্টোবর এ পদে উপ-নিবার্চনের তফসিল ঘোষনাও করেন। কিন্তু এমতাবস্থায় মামলার বাদী এক তরফাভাবে মামলা পরিচালনা করেন। নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল নিবার্চন স্থগিত ও ভোট পূন: গণনার আদেশ দেন। এরই প্রেক্ষিতে নিবার্চন কমিশন উপ-নিবার্চন স্থগিত ঘোষনা করেন।
এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার জজ আদালতের জিপি এ্যাডভোকেট মোঃ ইসহাক বলেন, এ মামলার প্রধান বিবাদী মৃত্যু বরণ করায় মামলাটি চলমান না থাকার কথা এবং কমিশন উপ নির্বাচনের তফশিল ঘোষনা করে শুন্য পদ পূরনেও বাঁধা থাকার কথা নই।

Print Friendly, PDF & Email
শর্টলিংকঃ